রেনেসাঁ সোসাইটি ও সাহিত্য সংসদের পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রবক্তরা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যকে ইসলামি তমদ্দুনের বাহন করার কথা ঘোষণা করেন। তাঁদের মতে পশ্চিম বাংলার সাহিত্য আসলে হিন্দু সাহিত্য। আবুল কালাম শামসুদ্দিন (Abul Kalam Shamsuddin) তাঁর ‘পাকিস্তানে শিল্প ও সাহিত্যের ধারা’ প্রবন্ধে বলেন যে পাকিস্তান একটি ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়ে আসে নি; বিশ্বের ঘটনা প্রবাহে জল-বুদবুদের জীবন তার নয়। পাকিস্তান একটি বিপ্লব, তাই পাকিস্তানি সাহিত্যও হবে বিপ্লবাত্মক। তিনি বললেন, ‘বিজাতীয় ভাবধারা, বিজাতীয় উপমা-রূপক-শব্দ কোন কিছুই আর নতুন পোশাক পরে পাকিস্তান সাহিত্যে চালু হতে পারবে না। এই উপলব্ধির ভিত্তিতে যে সত্যিকার পাকিস্তানি সাহিত্য জন্ম নেবে তারও আয়োজনে আমাদের সাহিত্যিকগণ নিয়োজিত আছেন’।

আবুল কালাম শামসুদ্দিন
মোহাম্মদ আবদুল হক (Mohammad Abdul Haque), ‘মাসিক মোহাম্মদী’র এক প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বললেন যে বাংলা সাহিত্য জাতীয় সাহিত্য নয়, তা ‘হিন্দু সাহিত্য’। মুসলমানের সাহিত্য মুসলমানকেই রচনা করতে হবে, হিন্দুয়ানি সুরের বদলে আনতে হবে ইসলামি সুর। ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের ঘনিষ্ঠ পরিচয় না থাকা তাঁর মতে পরিতাপের বিষয়। তিনি বললেন, — ‘আমাদের মধ্যে একটা প্রবল ইসলামি ভাব নাই। এই ইসলামি ভাব আমাদের মনে যতদিন না আসিবে ততদিন আমাদের সৃষ্ট সাহিত্যও একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত হইবে না, একটা বিশেষ সুর বাজিয়া উঠিবে না, ততদিন আমাদের সাহিত্যে হিন্দুয়ানি ভাবেরই বারবার আবির্ভাব হইবে, হিন্দুয়ানির অনুকরণ আসিয়া পড়িবে এবং আমাদের সৃষ্টি ব্যর্থ হইতে থাকিবে’।
পাকিস্তানি রাজনীতি ও পাকিস্তানি সাহিত্যকে এক ধারায় প্রবাহিত করার কথা বলেছেন এ. এ. রেজাউল করিম (A. A. Rezaul Karim), ‘আমাদের বিধান পরিষদের অবজেকটিভ রেজলিউশন ও আমাদের সাহিত্য পরিষদের অবজেকটিভ রেজলিউশনের মূল কথা অভিন্ন হওয়া চাই। কারণ আমরা তওহিদের আমানতদার এবং তওহিদই আমাদের সংস্কৃতির শেষ কথা’।
‘মাহে নও’ পত্রিকায় সৈয়দ আলি আহসান (Syed Ali Ahsan) ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যের ধারা’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধে তিনি ‘শিখা গোষ্ঠী’র মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে তিরস্কার করেন। কারণ — ‘ইসলামি নীতিবোধকে লাঞ্ছিত করে যে মুক্তবুদ্ধির প্রতিষ্ঠা তা বিকৃত মানসের সৃষ্টি, তাতে নতুনত্বের উন্মত্ততা আছে, কিন্তু স্থির বিবেচনার প্রশান্তি নেই’।
সৈয়দ আলি আহসান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘প্রাক্তন সম্পূর্ণ বাংলার সাহিত্যের ভাণ্ডার কখনও নিঃশেষিত হবে না। সেগুলোর উপর উভয় বাংলারই পূর্ণ অধিকার আছে, কিন্তু এই অধিকার থাকার অর্থ এই নয় যে সেই সাহিত্যের ট্রাডিশনও আমরা গ্রহণ করব। নতুন রাষ্ট্রের স্থিতির প্রয়োজনে আমরা আমাদের সাহিত্যে নতুন জীবন ও ভাবধারার প্রকাশ খুঁজব। সে-সঙ্গে এটাও সত্য যে আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার জন্য এবং হয়তো বা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। সাহিত্যের চাইতে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন আমাদের বেশি’।

সৈয়দ এমদাদ আলি
সৈয়দ এমদাদ আলি (Syed Emdad Ali) মুসলমান লেখকদের ধর্মীয় পরিচয় স্মরণ রেখে সাহিত্য রচনার উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর উক্তি, ‘সর্ব প্রথমে ভাবের বিপ্লব ঘটাইবার জন্য আপনারা সাহিত্য সৃষ্টি করিবেন, কিন্তু নিজেদের তালিম ও তমদ্দুনের দিকে দৃষ্টি রাখিয়াই আপনাদের কাজ করিতে হইবে। কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সর্বদা আপনারা সম্মুখে রাখিবেন। মনে রাখিবেন আপনারা মুসলমান’।
সাজ্জাদ হোসায়েন (Sajjad Hossain) মুসলমানদের নিজস্ব সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বলেন, ‘এ কথাকে অস্বীকার আমরা কিছুতেই করতে পারছিনে যে বাঙালি মুসলমানের মতো বিশিষ্ট সমাজের একটা স্বতন্ত্র সাহিত্য দাবি করার অধিকার আছে। সাহিত্যে আপনার চিত্র প্রতিবিম্বিত করে দেখবার আগ্রহ এবং আকুতি থাকা তার পক্ষে স্বাভাবিক’।
সাজ্জাদ হোসায়েন পুঁথি সাহিত্যের ভাষাকে মুসলমানের ভাষা হিসেবে গণ্য করে বলেন, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে সংস্কারের কথা আমি বললাম, তার জন্য মাল-মশলা বহু কিছু আমাদের গ্রহণ করতে হবে পুঁথি সাহিত্য থেকে’।
কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তভাবে এ. কিউ. এম. আদমউদ্দিন (A. Q. M. Adamuddin) বললেন, ‘পুঁথি সাহিত্যের পুরানো ধারা হুবহুভাবে ফিরাইয়া আনা সম্ভবপর নয় — হয়তো তাহা বাঙ্গালার মুসলিম সাহিত্যকে প্রগতির দিক দিয়া কল্যাণকরও করিবে না। তবে পুঁথি সাহিত্যকে ভিত্তি করিয়া এবং বর্তমান পাঙতেয় বাংলা সাহিত্যের অভিজ্ঞতাকে বরণ করিয়া লইয়াই তাকে পূর্ব পাকিস্তানের সত্যকার সাহিত্য রচনায় ব্রতী হইতে হইবে। বাংলার মুসলিম সাহিত্য প্রতিভা এই পথ অনুসরণেই আপন নিজস্বতা খুঁজিয়া পাইবে বলিয়া মনে হয়’।
‘নওবাহার’ পত্রিকা ছিল আর বেশি উগ্র। তাঁদের মতে বাংলা দেশ বিভক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। পত্রিকাটির লক্ষ্য পাকিস্তানের তাহজিব ও তমদ্দুনের রূপায়ণ। এঁরা মুর্শিদিগান, বেহুলার ভাসান, বেদে-বেদেনির গানকে বর্জন করতে চান ইসলামবিরোধী বলে। ত্যাগ করতে চান পুঁথি সাহিত্য, কারণ তার মধ্যে সাচ্চা ইসলামি আদর্শ নেই। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
আজও বাঙালি ও মুসলমান এই অন্যায় ভাগে বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দুকে বিভক্ত করেন। তাতে অনেক বাঙালি লমুসলমান অসন্তুষ্ট হন। এবং তার জন্য একা হিন্দুকেই দায়িত্ব করেন। অসম্পূর্ণ কারণ জানার ফলে এই বিপত্তি।
কিন্তু এই বিভক্তির নেপথ্যে রাজনীতি ও ধর্মনীতি ছাড়াও প্রবলভাবে কাজ করেছে সাহিত্য-সংস্কৃতি। সেই ইতিহাস অনেকদিন প্রায় অনালোচিত ছিল। এই ধারাবাহিক লেখায় সেটাই আলোয় আসছে, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ওয়াদা পূরণ করতে। চলতে থাকুক গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিক।
প্রথম তিনটি পর্বে রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত, তবুও শিরোনামে রবীন্দ্রনাথই প্রধান। তার মানে হয়তো পরবর্তী পর্বে রবীন্দ্রনাথ থাকবেন।
ঠিক , এরপরে রবীন্দ্রনাথ । আক্রমণের মূল লক্ষ্য । কারণটাও বলেছি । আমি একেবারে তটস্থভাবে গোটা বিষয়টাকে দেখার চেষ্টা করছি । রবীন্দ্রনাথের ত্রুটির দিকগুলোও বলব ল