পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতাত্ত্বিকরা মুসলমানি সাহিত্যসৃষ্টির উন্মাদনায় বাঙালি হিন্দু লেখকদের রচনা বর্জন করার ডাক দিলেন। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি হিন্দু লেখকদের শিরোমণি। তাই তাঁর উপর কোপটা পড়ল বেশি। তখন তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, দেশ-বিদেশে তাঁর খ্যাতি। বিশেষ করে ইরাক, ইরানের মানুষ তাঁকে জানিয়েছে বিপুল সংবর্ধনা। তাই তাঁকে বর্জন করলে বাঙালি হিন্দুর সাহিত্যকে মোক্ষম আঘাত করা যাবে। বর্জন করতে হলে আনতে হবে অভিযোগ।
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রথম ও প্রধান অভিযোগ তিনি ইসলামবিরোধী ও হিন্দুত্বের পূজারী। হাতের কাছে উদাহরণ আছে। ১৮৯৩ সালের গোরক্ষিণী সভা, ১৯০৪ সালের শিবাজি উৎসব। ইতিহাসের বিচারে এ অভিযোগ উড়িয়ে দেবার নয়।
এই দুটি আন্দোলন বাল গঙ্গাধর তিলকের মস্তিষ্কপ্রসূত। এ ভাবে তিলক ভারতবর্ষে নব্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করলেন। এরই ফলে ১৮৯৩ সালের আগস্ট মাসে বোম্বাইতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। বিবেকানন্দের মতো মানুষও এই আন্দোলনকে উপহাস করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এ সময়ে ‘ইংরেজের আতঙ্ক’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন বটে, কিন্তু সে প্রবন্ধে সাম্প্রদায়িক আন্দোলনের ব্যাপারে ধিক্কারবাণী ছিল না। নেপাল মজুমদার বলেছেন, ‘গোরক্ষার মতো একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়া হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও মনোমালিন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্ররোচিত এবং উত্তেজিত হইতেছে এবং যে সময়ে হিন্দু-মুসলিম জাতীয় ঐক্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হইতেছে, তখনও তিনি (রবীন্দ্রনাথ) ইহার প্রতিবাদ করিলেন না’। (জাতীয়তা আন্তর্জাতিকতা ও রবীন্দ্রনাথ)। গোরক্ষার আন্দোলনের ফলে ১৮৯৫ সালে পুনায় কংগ্রেসের সম্মেলনে স্বাভাবিকভাবে মুসলমানরা যোগ দেন নি। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাই বলেছেন, ‘ইহার জন্য দায়ী তিলক’।
সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ বইতে বলেছেন যে তিলক তীব্র দেশপ্রেমের সঙ্গে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার সমীকরণ করেছেন। সেই সাম্প্রদায়িকতার আর এক দৃষ্টান্ত শিবাজি উৎসব। ১৮৯৫ সালে রায়গড়ে শুরু হল শিবাজি উৎসব। বাংলায় সে উৎসব শুরু হয় ১৯০৪ সালে সখারাম গণেশ দেউস্করের (Sakharam Ganesh Deuskar) উদ্যোগে। সখারাম লেখেন ‘শিবাজির দীক্ষা’ নামে এক পুস্তিকা। তার ভূমিকা স্বরূপ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন একটি কবিতা —‘শিবাজি উৎসব’। এই কবিতাটি নিয়ে মুসলমান সমাজের বিক্ষোভ। কারণ এতে দেশেকে এক ধর্মে বেঁধে দেবার কথা আছে।
শুধু ‘শিবাজি উৎসব’ নয়, রবীন্দ্রনাথকে মুসলিমবিদ্বেষী ও হিন্দুত্ববাদী বলে দেগে দেবার জন্য পাকিস্তানবাদী সাহিত্যিকরা তাঁর ‘বিচার’, ‘মাসি’, ‘হোলিখেলা’, প্রভৃতি কবিতা; ‘সমস্যাপুরণ’, ‘দুরাশা’, ‘রীতিমতো নভেল’, ‘কাবুলিওয়ালা’, প্রভৃতি গল্প; ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটক; ‘কণ্ঠরোধ’ প্রবন্ধ উল্লেখ করেন। তিনি মুসলমানদের ‘জারজ’, খুনি’ বলে তাঁদের চরিত্র হনন করেছেন; কখনও বলেছেন ‘মূঢ়’, কখনও বলেছেন ‘ইতর শ্রেণির অবিবেচক’।
আবুল মনসুর আহমদ (Abul Mansur Ahmad) বলেছেন, ‘হাজার বছর মুসলমানরা হিন্দুর সাথে একদেশে বাস করিয়াছে। হিন্দুদের রাজা হিসাবেও, প্রজা হিসাবেও। কিন্তু কোন অবস্থাতেই হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক ঐক্য হয় নাই। হয় নাই এইজন্য যে, হিন্দুরা চাহিত আর্য-অনার্য, শক, হুন যেভাবে মহাভারতের সাগরতীরে লীন হইয়াছিল, মুসলমানরা তেমনি মহান হিন্দু সমাজে লীন হইয়া যাউক। তাদের শুধু ভারতীয় মুসলমান থাকিলে চলিবে না, হিন্দু-মুসলমান হইতে হইবে। এটা শুধু কংগ্রেসী বা হিন্দু মহাসভার মত ছিল না, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও মত ছিল’। (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)।
বিদূষণের একটা মজা এই যে, তা পল্লবিত হতেই থাকে। বলতে বলতে বলার কিছু বাকি থাকে না। আধুনিককালের পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের সমর্থক লেখক তাই রবীন্দ্রনাথকে হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তুলনা করে বসেন। বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্ববাদী ছিলেন। হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির কাছে রবীন্দ্রনাথ অতি পূজনীয় গুরুদেব। মিলটি এখানে অভিন্ন হিন্দুত্ববাদী চেতনার। অখণ্ড ভারত জুড়ে শিবাজির ন্যায় রবীন্দ্রনাথ ও মোদির মনে হিন্দুধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড আগ্রহ জাগবে—তাতেই বা বিস্ময়ের কি? …..এমন এক উগ্র হিন্দুর সাহিত্যকে আপন রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এখানেই মুসলিমদের মূল সমস্যা। হিন্দু-ধর্ম-রাজ্যের এমন এক উগ্র ধ্বজাধারীকে কোনও মুসলিম কি তার নিজ চেতনার প্রতিনিধিরূপে গ্রহণ করতে পারে? হতে পারে কি তাঁর চেতনার সাথে একাত্ম? তাঁর লেখা গান ও কবিতাই বা একজন মুসলিম গায় কি কর? এটা তো বিষপান’। (রবীন্দ্র সাহিত্য, হিন্দুত্বের বিজয় এবং বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতার সংকট : ফিরোজ মাহবুব কামাল (Firoz Mahboob Kamal))।
মোহাম্মাদ আবু সাইদ তাঁর ‘ইসলাম বিদ্বেষী সাহিত্যের অগ্রদূত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘উগ্র সাম্প্রদায়িকতায় রবীন্দ্রনাথ ছিল শীর্ষে, সে শুধু নিজেই মুসলিম বিদ্বেষী ছিল না, উপরন্তু কথিত সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে সে হিন্দুদের চরমশ্রেণির মুসলিম বিদ্বেষী হতে সাহায্য করত। তাই বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পেছনে এই রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব কম নয়’। এই লেখকের দাবি তসলিমা নাসরিন ও দাউদ হায়দারের মতো রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা দরকার। তাই তিনি যে সমস্ত কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলেছেন সেগুলি হল :
১] বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথের সমস্ত বই নিষিদ্ধ করতে হবে।
২] রবীন্দ্রনাথ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যক্রম (রবীন্দ্র দিবস, গান, একাডেমি) বন্ধ ঘোষণা করতে হবে।
৩] বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবর্তন করতে হবে।
৪] পাঠ্যপুস্তক থেকে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রচনা বর্জন করতে হবে।
(চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক