রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগ : তিনি প্রজাপীড়ক জমিদার। পূর্ববঙ্গের জমিদারি থেকে প্রচুর অর্থ তিনি সংগ্রহ করেছেন, অথচ সেখানকার প্রজা, বিশেষ করে মুসলমান প্রজাদের জন্য কিছুই করেন নি। কেউ কেউ তো আবার তাঁকে তাঁরই লেখা ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই শোষণলিপ্সু জমিদারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারকে ‘প্যারাসাইট’ বা পরজীবী বলেছেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথও পরজীবী। কারণ মূলত এই জমির আয়েই তাঁদের পরিবারের জীবনযাত্রা নির্বাহ হয়। ১৮৯৪ সালের খাজনা আদায়ের যে হিসেব পাওয়া যায় তা এই রকম :
ক] পরগণা বিরামহিমপুর ৫২, ৮৫৭ টাকা
খ] ডিহি শাজাদপুর ৭৮, ৩৩৮ টাকা
গ] পর্ণা কালীগ্রাম ৫০, ৪২০ টাকা
ঘ] তালুক পাণ্ডুয়া ১৫, ৮৪৫ টাকা
ঙ] তালুক বালিয়া ৫,৫৫০ টাকা
চ ] কিসমত সদকি ৪৩১ টাকা
ছ ] মৌজা বিরাটগ্রাম ২৩৫ টাকা
মোট ২, ৩২, ৯৪৮ টাকা
গতবছরের বাকি ১৩২৫ টাকা
কিন্তু মার্কস-কথিত শ্রেণিবিভক্ত সমাজে যে সামন্ততান্ত্রিক জমিদারের ছবি আমরা পাই, রবীন্দ্রনাথ তেমনি অসংবেদনশীল, মানব-রক্তপিপাসু জমিদার কি না তা বিচার করা দরকার। এ সম্পর্কে আগে তথ্যের অভাব ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলা দেশের লেখক, সাংবাদিকরা বহু পরিশ্রমে রবীন্দ্রনাথের জমিদারির নানা তথ্য উদ্ধার করেছেন। আমরা মূলত তাঁদের উপরেই নির্ভর করব।
‘রবি ঠাকুরের জমিদারি’ প্রবন্ধে (আজকের পত্রিকা) অরুণাভ পোদ্দার বলেছেন যে জমিদারি পাবার পরে রবীন্দ্রনাথ যে বৈপ্লবিক কাজটি করেন, তা হল পুণ্যাহ উৎসবে (নতুন বছরের খাজনা আদায়ের সূচনা উৎসব) আসন ব্যবস্থায় যে শ্রেণিবৈষম্য ছিল তার বিলোপ সাধন। দীর্ঘদিনের প্রধা অনুযায়ী পরগণায় জমিদার বসতেন মখমলের সিংহাসনে, হিন্দু প্রজারা বসতেন শতরঞ্জির উপর পাতা চাদরে, ব্রাহ্মণ-আমলা-নায়েবরা বসতেন উচ্চাসনে, মুসলমান প্রজাদের স্থান হত শুধু শতরঞ্জিতে। দ্বারকানাথের আমল থেকে চলে আসা এই প্রথা ভাঙলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, “সাহাদের (হিন্দু মহাজন) হাত থেকে শেখদের (দরিদ্র মুসলমান প্রজা) বাঁচাতে হবে, এটাই আমার প্রধান কাজ।” তাঁর সংবেদনশীল মনের পরিচয় ফুটে উঠেছে ‘পল্লিপ্রকৃতি’র লেখায়, “শিলাইদহ, পতিসর এই সব পল্লিতে যখন বাস করতুম তখন আমি পল্লিজীবন প্রত্যক্ষ করি। … প্রজারা আমার কাছে তাদের সুখ, দুঃখ, নালিশ আবদার নিয়ে আসত। তার ভিতর দিয়ে পল্লির ছবি আমি দেখেছি। একদিকে বাইরের ছবি—নদী, প্রান্তর, ধানক্ষেত, ছায়াতরুতলে তাদের কুটির — আর একদিকে তাদের অন্তরের কথা। তাদের বেদনাও আমার কাজের সঙ্গে জড়িত হয়ে পৌঁছাত।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের জমিদারি ও পতিসর’ নিবন্ধে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের এক মজার চিঠির কথা। এ চিঠি লেখা হয়েছিল ইন্দিরাদেবীকে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “এখানকার প্রজাদের উপর বাস্তবিক মনের স্নেহ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। এদের কোনরকম কষ্ট দিতে আদতে ইচ্ছা করে না। (প্রজারা) যখন ‘তুমি’ বলতে বলতে ‘তুই’ বলে ওঠে, যখন আমাকে ধমকায়, তখন ভারি মিষ্টি লাগে।” ইন্দিরা দেবীকে আর একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “আহা, এমন প্রজা আমি দেখি নি, এদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। বাস্তবিক, এরা যেন আমার দেশজোড়া বৃ্হৎ পরিবারের লোক।”
প্রজাদের দুর্দশা লাঘবের জন্য রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাঙ্ক’। গ্রামের গরিব চাষিরা এখান থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পেত ; মহাজনদের দ্বারস্থ হতে হত না। এখানে ট্রাক্টর দিয়ে চাষের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে এখানে রথীন্দ্রনাথের নামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সম্ভবত নোবেল পুরস্কারের কিছু অর্থ ব্যয়িত হয়েছিল।
পতিসরে রবীন্দ্রনাথ শেষ বারের মতো এসেছিলেন ১৯৩৭ সালে, পুণ্যাহ উৎসবে। সেদিন প্রজাদের তিনি বলেছিলেন, “আমি অসুস্থ, আর হয়তো তোমাদের কাছে আসতে পারব না। তোমরা আমাকে অনেক দিয়েছ। আমি তোমাদের কিছু দিতে পারি নাই। আমি প্রার্থনা করি তোমরা সুখী হও, শান্তিতে থাকো।”
সাংবাদিক সাজ্জাদ আলি কানাডার ‘বাংলা কাগজে’ লিখেছেন ‘রবিবাবুর জমিদারি’ প্রবন্ধ। তিনি মূলত লিখেছেন শিলাইদহের কথা। এখানে মহাজনের উচ্চ সুদের টাকা গুনতে গুনতে প্রজারা নাজেহাল। রবীন্দ্রনাথ কৃষি ব্যাঙ্ক স্থাপন করলেন। কম সুদে ঋণ পেতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল চাষিদের মধ্যে। তাই টান পড়ল মূলধনে। সাজ্জাদ আলি লিখছেন, “রবীন্দ্রনাথ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমন সময়ে নোবেল প্রাইজের ১,০৮,০০০ টাকা তাঁর হাতে এল। একান্ত ইচ্ছা টাকাটা শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে দেবেন। আবার প্রজাদের কাজে লাগলেও খুব খুশি হন। অবশেষে দুকুল রক্ষার একটা উপায় মিলল। টাকাটা শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের নামে কৃষিব্যাঙ্কে জমা রাখা হল। বিনিময়ে ব্যাঙ্ক বিদ্যালয়কে বাৎসরিক ৮,০০০ টাকা দেবে।”
মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত প্রজাদের রেহাই দিতে রবীন্দ্রনাথ গ্রামগুলোর পঞ্চায়েতদের নিয়ে চালু করলেন ‘মণ্ডলীপ্রথা’। ছোটখাটো বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসা এখানে হবে। বিচার পছন্দ না হলে আপিল করা যাবে। তারপরেও নিষ্পত্তি না হলে জমিদার বিচার করবেন।
অনাবাদি জমিতে ফসল ফলানোর ব্যবস্থা করলেন রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সংলগ্ন বিশাল খাস জমিতে প্রদর্শনী খামার গড়ে তোলা হল। সেখানে আলু, টমেটো, আখ, ভুট্টা চাষ হতে লাগল। এক জমিতে দু-বার ফসল ফলানোর কথা জানল চাষিরা।
খরা, বন্যা কবলিত শিলাইদহ। চাষিরা নির্বিঘ্নে ফসল তুলতে পারে না ঘরে। শুরু হয়ে যায় দুর্ভিক্ষ। এর থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য স্টেটের আয়ের কিছু অংশ ব্যয় করে রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুললেন ধর্মগোলা। অভাবের সময়ে মানুষ যেন বিনামূল্যে খাবার পায়।
‘প্রজাহিতৈষী জমিদার রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে হাবিবুর রহমান স্বপন লিখেছেন যে প্রজাদের জন্য জনহিতৈষী কাজের সূত্রপাত রবীন্দ্রনাথ করেন বিরাহিমপুর পরগণায়। কিন্তু সেখানে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তাই তিনি সে কাজ শুরু করেন পতিসরে। এই কাজে তাঁর সহযোগী ছিলেন সমাজকর্মী কালীমোহন ঘোষ, কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক পুত্র, খুলনার সেনহাটির স্বদেশকর্মী অতুল সেন। কূপ ও পুকুর খনন, যাতায়াতের রাস্তা তৈরি, অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে রূপান্তর এ সব কাজ চলতে থাকে। সালিশের কাজে তিনি দায়িত্ব দেন অতুল সেনকে।
‘দৈনিক জাগরণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে এখানে এসে রবীন্দ্রনাথ গো-সম্পদ লালন-পালনের সম্ভাবনা অনুভব করে মুলতান ও হরিয়ানা থেকে উন্নত জাতের বেশ কিছু ষাঁড় ও গাভী নিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে এইসব উন্নত জাতের ষাঁড় ও গাভীর সঙ্গে স্থানীয় গাভীর সংকরায়ন শুরু হয়। এলাকার কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য এবং গো-সম্পদ পালনে উৎসাহিত করার জন্য কৃষকদের নিয়ে সমবায় সমিতি গঠন করেন।
বাংলার পল্লিগ্রামের দুর্দশা তাঁকে ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করেছিল। ১৯০৭ সালে পাবনা শহরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন : —
“গ্রামের মধ্যে চেষ্টার কোন লক্ষণ নাই। জলাশয় পূর্বে ছিল, আজ তাহা বুজিয়া আসিতেছে; কেননা দেশের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ। যে গোচারণের মাঠ ছিল তাহা রক্ষণের কোন উপায় নাই, যে দেবালয় ছিল তাহার সংস্কারের কোন শক্তি নাই। যে সকল পণ্ডিত সমাজের বন্ধন ছিলেন, তাঁহাদের গণ্ডমূর্খ ছেলেরা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যবসা ধরিয়াছে। জঙ্গল বাড়িয়া উঠিতেছে, ম্যালেরিয়া নিদারুণ হইতেছে, দুর্ভিক্ষ ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে, আকাল পড়িলে পরবর্তী ফসল পর্যন্ত ক্ষুধা মিটাইয়া বাঁচিবে এমন সময় নাই। অন্ন নাই, স্বাস্থ্য নাই, আনন্দ নাই, ভরসা নাই, পরস্পরের সহযোগিতা নাই, আঘাত উপস্থিত হইলে মাথা পাতিয়া লই, মৃত্যু উপস্থিত হইলে নিশ্চেষ্ট হইয়া মরি, অবিচার উপস্থিত হইলে দেবের উপর তাহার ভার সমর্পণ করিয়া বসিয়া থাকি।” (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
অত্যন্ত সমৃদ্ধ লেখা।
ভাবনার অনেক উপাদান আছে
অনেক ধন্যবাদ ।