অভিযোগের বিচার
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রবক্তাদের মূল অভিযোগগুলি আমরা তুলে ধরেছি এর আগে। এবার সেগুলির যৌক্তিকতা বিচার করার চেষ্টা করব। কিন্তু বিচার করার সময় আমরা মনে রাখব রবীন্দ্রনাথ দেবতা নন, রক্তমাংসের মানুষ, তাঁর মানবিক দ্বিধা-দুর্বলতা থাকাই স্বাভাবিক। তবে দেখতে হবে শেষ পর্ষন্ত তিনি এই দ্বিধা-দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন কি না!
রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রথম ও প্রধান অভিযোগ তিনি ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী। এ প্রসঙ্গ আলোচনার পুর্বে আমি সকৌতুকে একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাই। রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু ব্রাহ্মণ’, না, ‘মুসলমান ব্রাহ্মণ?’ কথাটা উঠছে ‘পিরালি’ শব্দটা আসায়। ঠাকুর পরিবার ‘পিরালি ব্রাহ্মণ’। পিরালির সন্ধি বিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায় পির + আলি। কে এই ‘পির’?
পঞ্চদশ শতকের প্রথম দিকে সুন্দরবন অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিলেন খাঁ জাহান আলি। তাঁর প্রধান কর্মচারী মহম্মদ তাহের, ধর্মনিষ্ঠার জন্য যিনি মানুষের কাছে ছিলেন ‘পির’। এই পিরের বন্ধু ছিলেন যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগণার জমিদার দক্ষিণানন্দ রায়চৌধুরী, যিনি থাকতেন দক্ষিণডিহি গ্রামে। একবার মহম্মদ তাহেরের বাড়ির এক অনুষ্ঠানে দক্ষিণানন্দের দুই ছেলে — কামদেব ও জয়দেব আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে গো-মাংসের ঘ্রাণে অথবা সে মাংস ভক্ষণে তাঁরা ধর্মচ্যুত হন। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তাঁরা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। কামদেবের নাম হয় কামালুদ্দিন, জয়দেবের নাম হয় জামালুদ্দিন। ‘আচারসর্বস্ব’ হিন্দুসমাজে এই দুইভাই-এর দুর্দশা দেখে পির আলি বা মহম্মদ তাহের দুঃখিত হন এবং জমি দিয়ে মগুলায় তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। কামদেব ও জয়দেব দক্ষিণডিহি ত্যাগ করে চলে গেলেন কিন্তু তাঁর আর দুই ভাই রতিদেব ও শুকদেবকে রেহাই দিল না হিন্দু সমাজ। জাতিচ্যুত করল।
যশোরের পিঠাভোগের জমিদার বংশের সন্তান জগন্নাথ কুশারির সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন শুকদেব। নিজেদের জাতিচ্যুতির কথা গোপন রেখে। এই কারণে জগন্নাথের পিতা জগন্নাথকে ত্যজ্য করলেন। যশোর-নরেন্দ্রপুর সংলগ্ন বারোপাড়ায় শ্বশুর মশাই-এর দেওয়া জমিতে ঘর বাঁধলেন জগন্নাথ কুশারি।
জগন্নাথের চতুর্থ বংশধরেরা বারোপাড়া ছেড়ে চলে আসেন সুতানটি-গোবিন্দপুরে। সেখানকার মানুষদের তাঁরা নানাভাবে সাহায্য করতেন। তাই সেখানকার মানুষের কাছে তাঁরা হয়ে উঠলেন ‘ঠাকুর’। জগন্নাথের উত্তরসূরীরা ভাবলেন তাঁদের নামের সঙ্গে অবমাননাসূচক যে ‘পিরালি’ কথাটা জড়িয়ে আছে, তার থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ‘ঠাকুর’ পদবি ব্যবহার করলে। জগন্নাথ কুশারির দুই ছেলে — মহেশ্বর আর শুকদেব। মহেশ্বরের ছেলে পঞ্চানন। পঞ্চান্ন ঠাকুরের বড় ছেলে জয়রাম। তিনি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির জরিপ-আমিন পদে চাকরি লাভ করেন। লোকে তাঁকে ‘জয়রাম আমিন’ বলেও ডাকত। জয়রাম প্রভূত ধন-সম্পদের মালিক হন। জয়রামের বড়ছেলে আনন্দীরাম, মেজোছেলে নীলমণি, সেজোছেলে দর্পনারায়ণ, ছোটছেলে গোবিন্দরাম। জয়রামের মেজো ছেলে নীলমণি পাথুরিয়াঘাটায় জমি কেনেন ও সেখানে বাসগৃহ তৈরি করে ভাইদের নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৮৭২ সালে গোবিন্দরামের নিঃসন্তান বিধবা স্ত্রী রামপ্রিয়া নিজের ভাগের সম্পত্তি দাবি করে মামলা করেন নীলমণি ও দর্পনারায়ণের বিরুদ্ধে। বিরক্ত হয়ে নীলমণি পাথুরিয়াঘাটার বাড়ি ত্যাগ করে বৈষ্ণবচরণ শেঠের সাহায্যে মেছুয়াবাজার বা এখনকার জোড়াসাঁকোয় তৈরি করেন নতুন বাড়ি। নীলমণির দুই ছেলে —রামলোচন আর রামমণি। এঁদের সঙ্গে দক্ষিণডিহির ‘আদি পিরালি’ বংশের রামকান্ত রায়চৌধুরীর দুই মেয়ে অলকা আর মেনকার বিয়ে হয়। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ রামমণি আর অলকার ছেলে। দ্বারকানাথ যখন মাত্র এক বছরের শিশু, তখন মারা যান মেনকা। তাই রামলোচনের স্ত্রী অলকা দত্তক নেন দ্বারকানাথকে।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মুসলমানদের এক পরোক্ষ সম্পর্কের কথা বিবৃত করলাম রবীন্দ্রবিদ্বেষী মুসলমানদের জন্য। শুধু কি তাই! মহাকবি কালিদাস যাকে ‘জননান্তরাণি সৌহৃদানি’ বলেছেন, তাও আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথের জীবনে। তিনি তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন তাঁর আদিবাসভূমি পূর্ববঙ্গে। নিশ্চয়ই তার প্রধান কারণ জীবিকার টান। জমিদারি তত্ত্বাবধানই সেই জীবিকার টান। কিন্তু তার বাইরে এখানকার প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন তিনি। সেই ভালোবাসার ফসল ‘সোনার তরী,’ ‘ছিন্নপত্র,’ আর ‘গল্পগুচ্ছ’ আর বেশ কয়েকটি গান। শুধু তো কয়েকটা রচনা নয়, নদীবিধৌত পূর্ববঙ্গ রবীন্দ্রনাথের জীবনদৃষ্টিকে বিকশিত করতে সাহায্য করেছে বিশেষভাবে।
রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দুত্ববাদের প্রতিনিধি’ বলে যাঁরা দেগে দিতে চান, অন্য কথা বলার আগে তাঁদের বলি শুধু ঠাকুর পরিবারের বৈবাহিক ইতিহাসটা দেখতে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ রবীন্দ্রনাথদের ‘নিজের লোক’ বলে মনে করতেন না। তাই সে পরিবারের ছেলেদের পাত্রী জুটতো না, পাত্র জুটতো না মেয়েদের। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও সে বিভাজনের শিকার। তাঁরও বিয়ের জন্য পাত্রী জুটছিল না। শেষে জোড়াসাঁকো কাছারির কর্মচারী, যশোরের ফুলতলা গ্রামের বাসিন্দা বেণীমাধব রায়চৌধুরীর অশিক্ষিতা মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে বিয়ে দিতে হয় রবীন্দ্রনাথের।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসংখ্য লেখায় হিন্দু সমাজের কুসংস্কার, আচারসর্বস্বতা, প্রগতিবিমুখতার তীব্র, তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন।
আর ইসলামবিদ্বেষ?
প্রথমে কিছু উদাহরণ উল্লেখ করি। ১৯৩৩ সালের ২৬ নভেম্বর মির্জা আলি আকবর খাঁর সভাপতিত্বে মুম্বাই-এ যে ‘পয়গম্বর দিবস’ উদযাপিত হয়, সেখানে একটি বাণী পাঠান রবীন্দ্রনাথ : —
“জগতে যে সামান্য কয়েকটি মহান ধর্ম আছে, ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম। মহান এই ধর্মমতের অনুরাগীদের দায়িত্বও তাই বিশাল। ইসলামপন্থীদের মনে রাখা দরকার, ধর্ম বিশ্বাসের মহত্ব আর গভীরতা যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপর ছাপ রেখে যায়। আসলে এই দুর্ভাগা দেশের অধিবাসী দুটি সম্প্রদায়ের বোঝাপড়া শুধু তো জাতীয় সাহিত্যের সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না, সাহিত্যদ্রষ্টাদের বাণী নিঃসৃত শাশ্বত প্রেরণার ওপরও তার নির্ভরতা। সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালোবাসার পাত্র এবং মানুষকেও তাঁরা চিরকাল ভালোবেসে এসেছেন।” সভায় রবীন্দ্রনাথের এই বাণী পাঠ করেছিলেন সরোজিনী নাইডু।
১৯৩৪ সালের ২৫ জুন রবীন্দ্রনাথ হজরত মোহাম্মদের (স.) জন্মদিন উপলক্ষে স্যার আবদুল্লা সোহরাওয়ার্দিকে যে বাণী পাঠান : —
“ইসলাম পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। এই কারণে ইহার অনুবর্তীগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ব সম্বন্ধে তাহাদিগকে সাক্ষ্য দিতে হইবে। ভারতে যে সকল বিভিন্ন ধর্মসমাজ আছে, তাদের পরস্পরের প্রতি সভ্য জাতিযোগ্য মনোভাব যদি উদ্ভাবিত করিতে হয়, তবে কেবলমাত্র রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি দ্বারা তাহা সম্ভবপর হইবে না, আমাদের নির্ভর করিতে হইবে সেই অনুপ্রেরণার প্রতি, যাহা ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ও মানবের বন্ধু সত্য দূতদিগের অমর জীবন হইতে চির উৎসারিত। অদ্যকার এই পুণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মুসলিম ভ্রাতৃদের সহিত একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশ্যে আমার ভক্তি উপহার অর্পণ করিয়া উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাহার আশীর্বাদ ও সান্ত্বনা কামনা করি।” রবীন্দ্রনাথের এই বাণীটি বেতারে সম্প্রচারিত হয়।
নয়াদিল্লির জামা মসজিদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘দ্য পেশওয়া’ পত্রিকার পয়গন্বর সংখ্যার জন্য রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নিম্ন শুভেচ্ছাবার্তা পাঠান : —
“যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদের (স.) উদ্দেশ্যে আমি আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মানুষের ইতিহাসে এক নতুন, সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন পয়গম্বর হজরত, এনেছিলেন নিখাদ শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ। সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করি, পবিত্র পয়গম্বর প্রদর্শিত পথ যাঁরা অনুসরণ করছেন, আধুনিক ভারতবর্ষের সুসভ্য ইতিহাস রচনা করে তাঁরা যেন এমনভাবে ইতিহাস গড়ে তোলেন যাতে আমাদের জাতীয় জীবনে শান্তি ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা অটুট থেকে যায়।”
এই বাণীগুলি ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথ মহান ধর্ম ও ধর্মগুরুদের আদর্শকে প্রাত্যহিক জীবনে অনুসরণ করার কথা বেশ জোর দিয়েই বলছেন। যাঁরা ‘ধার্মিকতার আড়ম্বর’ করেন, তাঁরা কি নিজের জীবনে ধর্মের আদর্শ ও ধর্মগুরুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন আজীবন? তাই একসময় ক্ষুব্ধ হয়েই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : —
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর;
শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো
শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
নয়াদিল্লির জামা মসজিদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘দ্য পেশওয়া’ পত্রিকার পয়গন্বর সংখ্যার জন্য ১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রবীম্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তাটি রবীন্দ্রবিদ্বেষী এক শ্রেণির বিকৃত বক্তব্যের মোক্ষম জবাব। তাদের দাবি, রবীন্দ্রনাথ কখনও হজরত মহম্মদের নাম নেয়নি তাট লেখায়। এই শুভেচ্ছাবার্তায় তিন বার মহম্মদের নাম আছে।
নয়াদিল্লির জামা মসজিদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘দ্য পেশওয়া’ পত্রিকার পয়গন্বর সংখ্যার জন্য ১৯৩৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রবীম্দ্রনাথ ঠাকুরের পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তাটি রবীন্দ্রবিদ্বেষী এক শ্রেণির মুসলমানের বিকৃত বক্তব্যের মোক্ষম জবাব। তাদের দাবি, রবীন্দ্রনাথ কখনও হজরত মহম্মদের নাম নেয়নি তাঁর লেখায়। এই শুভেচ্ছাবার্তায় তিন বার মহম্মদের নাম আছে।