বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে সিলেটের মাছিমপুরে এসে মণিপুরী মেয়েদের রাসনৃত্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
কবি সিলেটে এলে তাঁকে মণিপুর পল্লী মাছিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। কবি আসছেন শুনে মনিপুরবাসী পল্লীর প্রবেশপথে সারি সারি কলাগাছ পুঁতে সুন্দর একটি তোরণ তৈরি করেছিল। মণিপুরিদের সহজাত সৌন্দর্যবোধের পরিচয় পেয়ে কবি খুশি হয়েছিলেন। মণিপুরি মেয়েদের তাঁতে-বোনা কাপড় দেখে পছন্দ হওয়ায় কিছু কাপড় কিনেও নেন। মাছিমপুরে মণিপুরি ছেলেরা কবিকে রাখাল-নৃত্য দেখাল।
কবি খুশি হয়ে তখন তাদের পাঁচ টাকা উপহার দিয়েছিলেন। মেয়েদের নাচ রাত্রে দেখবেন এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেলা ৩টার সময় বাংলোয় ফিরে এলেন।
সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ লিখেছেন, রাত্রে মণিপুরি বালক-বালিকারা বাংলোতে এসে উপস্থিত হলো কবিকে নাচ দেখাবার উদ্দেশ্যে। নৃত্য আরম্ভ হওয়ার আগে একজন মণিপুরি হারমোনিয়মে সুর ধরবার উদ্যোগ করতেই কবি তাঁকে বারণ করলেন। নয়নাভিরাম জাঁকালো পরিচ্ছদ-পরিহিত অপূর্ব লাবণ্য শ্রীমণ্ডিত মণিপুরি বালিকারা তাদের বাহুগুলো নৃত্যছন্দে লীলায়িত করে, বলয়াকারে ঘুরে ঘুরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবিকে তাদের জাতীয় নৃত্য দেখিয়ে তাঁর প্রশংসা অর্জন করল। কবি তাদের নৃত্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ টাকা পুরস্কার দিলেন।
এই একদিনের একটি ঘটনা কবির জীবনে কীরকম প্রভাব ফেলেছিল তার প্রমাণ সিলেট থেকে ফিরেই তিনি শান্তিনিকেতনের পাঠ্যতালিকায় মণিপুরি নৃত্য প্রচলন করেছিলেন। সিলেট ভ্রমণ শেষে ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোরের আমন্ত্রণে কবি আগরতলায় আসেন, ৯ নভেম্বর। ত্রিপুরা থেকে একজন অভিজ্ঞ মণিপুরি নৃত্যগুরুকে শান্তিনিকেতনে পাঠাবার জন্য কবি মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোরকে অনুরোধ করেন। মহারাজাও কালবিলম্ব না করে নৃত্য ও মৃদঙ্গ বাদনপটু, বিচক্ষণ কারুশিল্পী ও যন্ত্রবিদ রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়ে দেন। এ বিষয়ে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন, ‘মহারাজাকে অনুরোধ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের শিক্ষার জন্য একজন মণিপুরি নর্তককে দেয়ার জন্য। মহারাজা প্রস্তাবে উৎসাহিত হয়ে তাঁর দরবার থেকে নর্তক বুদ্ধিমন্ত সিংহকে পাঠালেন, মাঘ মাসের প্রথম দিকে।’

মণিপুরি নৃত্য থেকে উৎসাহিত হয়েই রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্যনাট্যটির পূর্ণাঙ্গ নৃত্যনাট্যরূপ দেন কেবল এই নৃত্যকে ভিত্তি করেই। এ ছাড়া ‘শাপমোচন’, ‘ঋতুরঙ্গ’, ‘চণ্ডলিকা’, ‘মায়ার খেলা’ ইত্যাদি নাটকগুলোতেও মণিপুরি নৃত্যের সংযোজন করেন। এ নিয়ে কবি নিজেই বলেছেন নলিনীকুমার ভদ্রকে। ১৭ জুন, ১৯৩৬ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে নলিনীকুমার ভদ্র কবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সিলেটে মণিপুরি নাচ দেখার অনুভূতির কথা তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছেন, — ‘তুমি তো সিলেট থেকে আসছ। চৌদ্দ-পনেরো বছর আগে যখন সিলেটে যাই তখন দেখেছিলাম মণিপুরি নাচ। সে নাচ আমার মনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সুদূর কল্পলোকে, মনে জেগেছিল নৃত্যনাট্যের পরিকল্পনা, সে যেন আমার মনকে পেয়ে বসেছিল। শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মণিপুরি নাচ শেখাবার উদ্দেশ্যে ১৩২৬ থেকে ১৩৩৬ সন এই দশ বছরের মধ্যে তিন তিনবারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ছয়জন মণিপুরি নৃত্য শিক্ষককে আনিয়েছি শান্তিনিকেতনে। ‘নটরাজ’ অভিনয়ে প্রথম সংযোজন করে একটু অদলবদল করে মণিপুরি নাচ। মণিপুরি নৃত্যকেই ভিত্তি করে নাট্যগুলোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নৃত্যনাট্যে যে বিশেষ রস সৃষ্টি করতে চাই তার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী হচ্ছে মণিপুরি নাচ।
মণিপুরি নৃত্য রবীন্দ্রনাথের ওপর কী রকম প্রভাব ফেলেছিল তা আমরা দেখলাম। এখন বুঝতে চাই রবীন্দ্রনাথ যখন মণিপুরি নৃত্যচর্চায় হাত দিলেন তখন মণিপুরি নৃত্যে তার কী রকম প্রভাব পড়েছিল? এজন্য কোনো তথ্য-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। তা সহজেই বোঝা যায়। মণিপুরি নৃত্য আজ এই উপমহাদেশের পাঁচটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্তর্গত। কত্থক, কথাকলি, ভরতনাট্যমের সঙ্গে এর স্থান। মণিপুরি নৃত্য যে আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তার একক অবদান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সে জন্যই বলা হয় মণিপুরি নৃত্যকলাকে ধর্মীয় আচারের গণ্ডি থেকে বের করে এনে বিশ্বমণ্ডলে স্থান করে দিয়েছিলেন তিনি। মণিপুরি নৃত্য আজ শুধু সংস্কৃতির বাহন নয়, এটা আয়-রোজগারেরও একটা মাধ্যম। অনেকেই এ শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এ শিল্প চর্চা করে। তারা নিজেরাও দেশে-বিদেশে মণিপুরি নৃত্যচর্চাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছেন। শুধুমাত্র মণিপুরি নৃত্যকে কেন্দ্র করেই সমস্ত মণিপুরি শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ হচ্ছে।
শান্তিনিকেতনে প্রথম নৃত্যগুরু রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যেসব নৃত্যগুরু মণিপুরি নৃত্যশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন তাদের ১৬ জনের নামের তালিকা একটা দিয়েছেন এল. বীরমঙ্গল সিংহ। এতেই বোঝা যায় রবীন্দ্রভুবনে মণিপুরি সমাজ কতটা প্রাসঙ্গিক। আর মণিপুরি সমাজে রবীন্দ্রনাথ আজও কতটা আদরণীয় তার প্রমাণ এই আয়োজন। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ সিলেটে এসে লিখেছিলেন,
মাতাবিহীন কালস্রোতে
বাঙলার রাষ্ট্র সীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি,
সুন্দরী শ্রীভূমি।
ভারতী আপন পুণ্য হাতে
বাঙালির হৃদয়ের সাথে
বাণী মাল্য দিয়া
বাঁধে তব হিয়া
সে বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে
বাঙালির আশীর্বাদ গাঁথা হয়ে আছে।
উল্লেখ্য, কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের রচনাসমগ্রে স্থান পায়নি। কোনো শুভানুধ্যায়ী-ভক্তের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে এ কবিতাটি রচনা করে থাকতে পারেন বলে গবেষকদের ধারণা। সিলেটে আসার ২২ বছর পর কবিগুরুর মৃত্যুর পরপরই সিলেটবাসী শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৪১ সালে ‘কবি-প্রণাম’ নামে একটি স্মারক প্রকাশ করেছিলেন। সে স্মারকে প্রথমবারের মতো কবির স্বহস্তে লেখা কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছিল।
মণিপুরী নৃত্য রাসলীলার অন্যতম আজ। কবিগুরু মাধ্যমেই বিশ্ব দরবারে মণিপুরের মেয়েদের রাসনৃত্য স্থান লাভ করেছে।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।