বাংলাভাষীদের কাছে রবীন্দ্রনাথের অব্যাহত প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্যদের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে। যাঁরা তাঁকে বাঙালি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ নির্মাতা বলে জানেন, তাঁদের কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত হবে। বাংলা ভাষাকে যে ঐশ্বর্য তিনি দান করেছেন, তাতে এই ভাষা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, সকল ভাব-অনুভূতির প্রকাশ এবং নির্মল হাস্যকৌতুকের বাহন হতে সমর্থ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের আগেও বাংলায় কবিতা ছিল, তবে পদ্য ও কবিতার পার্থক্য আমরা বুঝতে শিখেছি তাঁর লেখা পড়েই। বাংলা ছোটগল্পের ¯্রষ্টা তিনি, বাংলা উপন্যাসের গতিপথ-নির্মাতা। নাটক ও গীতিনাট্য, সাহিত্য-সমালোচনা ও ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস ও বিজ্ঞান, চিঠিপত্র ও ভ্রমণকথা- সবক্ষেত্রেই তাঁর দান অনন্য। তাঁর সংগীতে সমীকৃত হয়েছে কথার বৈচিত্র্যের সঙ্গে ভারতীয় ধ্রুপদী, বাংলা কীর্তন, বাউল ও লোকসংগীত এবং পাশ্চাত্য সংগীতের সুর। নৃত্যনাট্য নামের শিল্পটি তাঁরই উদ্ভাবন। পরিণত বয়সে চিত্রকলার যে-চর্চা তিনি করেন, তার অভিনবত্ব ও গভীরতা সকল সমালোচককে বিস্মিত করেছে। বারবার তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর ভাবনা বারবার নতুন বাঁক নিয়েছে। ঈশ্বরে সমর্পিত তাঁর গান নাস্তিকেরও উপভোগ্য, আবার তিনিই বলেছেন, ‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো’। মানবসভ্যতার যা কিছু বরণীয়, তাকেই গ্রহণ করেছেন তিনি, অকুণ্ঠচিত্তে আহরণ করেছেন কাছে-দূরের নানান সংস্কৃতি থেকে।
এর বাইরেও রবীন্দ্রনাথ আছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যিনি নেননি, তিনিই হয়ে ওঠেন স্মরণীয় শিক্ষাতাত্ত্বিক, গড়ে তোলেন বিদ্যালয়, তাকে রূপ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করে নেন। পল্লী-পুনর্গঠনে তাঁর প্রয়াস অতি শ্রদ্ধেয়। কৃষি ও কুটির শিল্পের বিকাশে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তাঁর প্রচেষ্টা অবিস্মরণীয়। যন্ত্র দিয়ে চাষের পরীক্ষা করেছেন, তাঁতিদের জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন বয়ন-বিদ্যালয়, চাষিরা যাতে সহজে ঋণ পায় তার জন্যে স্থাপন করেছেন কৃষিব্যাংক। শ্রীনিকেতনের সবটাই তাঁর এই পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ার নমুনা। একসময় রাজনীতিতে তিনি যোগ দিয়েছেন সোৎসাহে, আদর্শগত কারণে পরে সরেও এসেছেন। তবে দেশবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি কখনো ত্যাগ করেননি। জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মমতার প্রতিবাদ করতে যখন এগিয়ে আসেননি কোনো রাজনীতিবিদ, তখন তিনি ‘নাইট’ উপাধি ফিরিয়ে দিয়ে নির্যাতিত মানুষের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজনৈতিক কর্মপন্থা নিয়ে প্রকাশ্যে তিনি তর্ক করেছেন- যাঁকে তিনিই অভিহিত করেছিলেন মহাত্মা বলে, তাঁর সঙ্গে এবং রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়কে ধর্মের সঙ্গে জড়িত করার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি রাজনীতিবিদদের আহ্বান করেছিলেন জনমুখী হতে, জনসভায় বাংলাভাষায় বক্তৃতা দিতে, হিন্দু-মুসলমানের মিলনসাধনে চেষ্টিত হতে। উত্তুঙ্গ জাতীয়তাবাদের দিনেও তিনি বলেছিলেন, এ-দেশের ইতিহাসে ইংরেজের একটা স্থায়ী আসন আছে। তিনি উন্নয়নের কথা ভেবেছেন, সম্পদের সুষম বন্টনের কথা বলেছেন এবং নারীর জন্য দাবি করেছেন ন্যায্য স্থান।
তারপরও আছে। সারা পৃথিবীকে মানবতার বাণী শোনাবার স্পর্ধা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সময়েই তাঁর মনে হয়েছিল পৃথিবীতে এক প্রবল ঝড় আসন্ন। এর জন্যে তিনি দায়ী করেছিলেন অন্যের সম্পদ গ্রাসে ইউরোপের অপরিসীম লালসাকে। বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ একই সঙ্গে বিধ্বংসী ও আত্মঘাতী। শুধু ইউরোপে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়, চীন ও জাপানেও রবীন্দ্রনাথ আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের নিন্দাজ্ঞাপন করেন এবং প্রায় সর্বত্রই প্রত্যাখ্যাত হন।
আশি বছরের জীবনে রবীন্দ্রনাথ ভুলও করেছেন যথেষ্ট। তাঁর কথার মধ্যে, কাজের মধ্যে পরস্পরবিরোধী উপাদান খুঁজে বের করা শক্ত নয়। দীর্ঘকালের সৃষ্টিশীল জীবনে তা অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, ভ্রান্তিজাল কাটিয়ে খানিক পরেই তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন সত্য ও ন্যায়, শুভ্র ও কল্যাণের পক্ষে। তাঁর ভ্রান্তি থেকেও আমাদের শেখার আছে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তাই আমাদের চলে না।
রবীন্দ্রনাথ আমাকে দিয়েছেন আত্মপ্রকাশের ভাষা, জীবনকে উপভোগ করার উপকরণ। তিনি আমাকে দিয়েছেন দেশকালের ঊর্ধ্বে যে-বিশ্ব, তার পথিক হওয়ার প্রেরণা। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন সকল মানুষকে ভালোবাসতে। তিনি আমাকে দিয়েছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মন্ত্র। তাঁর হাত ধরে পথ চলতে চেষ্টা করি আমি।