১৯৫৮ সালে। শুরু হল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের মাধ্যমে অর্জন, ১৯৫৬ সালে বাঙালির সরকার গঠনের কোন চিহ্ন থাকল না। [উল্লেখযোগ্য যে ১৯৫৬ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিদের জন্য এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন সনজিদা খাতুন। সেখানে শেখ মুজিবর রহমানের অনুরোধে তিনি ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন।]
আইয়ুব খানের দাপটে বুদ্ধিজীবীরা তাঁর পতাকাতলে জড়ো হতে লাগলেন। পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল, ন্যাশনাল ব্যুরো অব রিকন্সট্রাকশন, রাইটার্স গিল্ড তৈরি করে আয়ুব খান বুদ্ধিজীবীদের বশে রাখার চেষ্টা করতে লাগলেন।
এসে গেল ১৯৬১ সাল। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী। তৎপর আইয়ুব খান। পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে রবীন্দ্র প্রভাব। হুজুরে হাজির ‘আজাদ’ পত্রিকা। সেই পত্রিকা তাদের সংবাদে, সম্পাদকীয়তে, প্রবন্ধে ছড়িয়ে যাবে রবীন্দ্র-বিদূষণ।
১৯৬১ সালের ৭ মে, রবিবার, সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার জেলা কাউন্সিল হলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এক আলোচনাসভা। সভাপতি ফজলুল হক সেলবর্ষী। সভাপতি তাঁর ভাষণে বললেন : —
“রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের সার্থক উত্তরাধিকারী। অতি স্বাভাবিকভাবেই তাঁহার রচনায় মুসলিম বিদ্বেষ ফুটিয়া উঠিয়াছে। তাই তিনি যত বড় কবিই হউন না কেন, মুসলমানদের জাতীয় কবি হইতে পারেন না।”
অনুষ্ঠানের আর এক বক্তা কবি খান মুহাম্মদ মইনুদ্দিন বললেন : —
“রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে উচ্চ শ্রেণির কবি। একজন বিদেশি কবিকে যতটুকু সম্মান প্রদর্শন করা দরকার, আমরা তার বেশি তাঁকে দিতে পারি না। তিনি ভারতীয় আমরা পাকিস্তানি, তাঁহার আদর্শ আমাদের আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং তাঁহার জন্মবার্ষিকী পালন লইয়া আমাদর মাতামাতি করা শোভা পায় না। ইহাতে আত্মবিস্মৃতিরই পরিচয় পাওয়া যায়।”
অনুষ্ঠানের অপর বক্তা অধ্যাপক গোলাম আযম বলেন : —
“যাঁহারা পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্যে ঐক্যসূত্র দেখিতে পান, তাঁহাদের জানা উচিৎ যে পাকিস্তান ভারতের রামরাজ্য নহে।”
এই সভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বেতার কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন একাডেমিকে বিজাতীয় সংগীত-সাহিত্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার এবং পাকিস্তানের মৌলিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়।
এর বিপরীতে ১৯৬১ সালের ৮ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের মিলনায়তনের এক সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলা বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ আবদুল হাই। সভায় প্রবন্ধ পাঠ করেন আবু রুশদ, বেগম শামসুন নাহার, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন। সাজ্জাদ হোসায়েন বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা বাতুলতা মাত্র এবং রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের কথা ভাবাই যায় না। ১৯৬৭ সালে অবশ্য সাজ্জাদ হোসায়েন সাহেব ডিগবাজি খান।
‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা যেন রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে জেহাদ। ১লা বৈশাখ (১৩৬৮) থেকে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত চলতে থাকে সে জেহাদ। কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি : —
ক] ১লা বৈশাখ / সম্পাদকীয় — ‘রবীন্দ্রনাথ ও মওলানা আজাদ’।
খ] ১২ বৈশাখ / সম্পাদকীয় — ‘রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ব পাকিস্তান’।
গ] ১৩ বৈশাখ / প্রবন্ধ — ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী প্রসঙ্গ’ / আহমদ পারভেজ।
ঘ] ১৪ বৈশাখ / সম্পাদকীয় — ‘রবীন্দ্রনাথ ও আমরা’।
উপসম্পাদকীয় — ‘সাহিত্য সম্মেলন : কাগমারি ও রবীন্দ্রনাথ’ (মওলানা ভাসানির উদ্যোগে ১৯৫৭ সালের ৮-১০ ফেব্রুয়ারি এই সম্মেলন হয়।) / নুরুদ্দিন মাহমুদ।
ঙ] ১৯ বৈশাখ / প্রবন্ধ — ‘রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে মুসলমান’ / সৈয়দ আবদুর রশিদ।
চ] ১ জ্যৈষ্ঠ / প্রবন্ধ — ‘রবীন্দ্রনাথ ও পাকিস্তানি’ / এম এ ওয়াহেদ।
‘দৈনিক আজাদে’র বিরুদ্ধে কলম ধরে ‘সংবাদ’ নামক পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে প্রবন্ধ ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় সেই পত্রিকায় -১৩, ১৪, ১৭, ২০, ২২, ২৭, ২৮ বৈশাখ এবং ১ ও ২ জ্যৈষ্ঠ। কয়েকটি প্রবন্ধ : —
ক] উপসম্পাদকীয় ‘রবীন্দ্রনাথ ও আজাদ’।
খ] সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় ‘নানা কথা’।
গ] প্রবন্ধ /‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ’ / আবুল খায়ের।
ঘ] প্রবন্ধ / ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ’ / গোলাম মোস্তফা।
২৫ বৈশাখ ‘সংবাদ’ প্রকাশ করে একটি আট পাতার বিশেষ ক্রোড়পত্র। ২৬ বৈশাখ পত্রিকার প্রথম পাতার চারদিকে দাগ দেওয়া একটি অংশে লেখা হয় : —
“মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন : পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র হিটলার, গোয়েবলস, হিমলার ও আইখম্যানশাসিত নাৎসি জার্মানিতে রবীন্দ্রসাহিত্যের সর্বজনীনতা ও মানবপ্রীতির জন্য ১৯৩৫ সালে ই্হার প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ হইয়াছিল।”
আবেদিন কাদের বলেছেন, “এ সময়ের ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ সহজলভ্য নয়, কিন্তু সচেতন পাঠকরা জানেন ‘ইত্তেফাকে’র ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ ‘আজাদ’ পত্রিকার ভূমিকাবিরোধী। ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলিম সমাজ’ নামে যে সব লেখা আহমেদুর রহমান রচনাবলিতে স্থান পেয়েছে সেগুলো সম্ভবত ‘ইত্তেফাকে’ সে সময়ে প্রকাশিত। আহমেদুর রহমান তখন ‘ইত্তফাকে’র সহকারী সম্পাদক ছিলেন। জানা যায় তোফাজ্জল হোসেনও রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সে সময়ে প্রবন্ধ লেখেন ‘ইত্তেফাকে’।” (রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি এবং ড. খান সারওয়ার মুরশিদের ভূমিকা) (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক