১৯৬১ সাল। রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ। আবার স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের চতুর্থ বছর। একনায়কতন্ত্রীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র। না, ঘরোয়াভাবে নয়, তাঁরা এই জন্মশতবর্ষ পালন করতে চান জাতীয়ভাবে। কিন্তু সেটা তো অনেক বড় ব্যাপার। কি ভাবে তা পারবেন ছাত্ররা? কতটুকু তাঁদের সঙ্গতি? চাই জাতীয় পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী, লেখক প্রভৃতিদের। ইতিহাসের ছাত্র কাজি মুস্তাক হোসেন আর বাংলা সাহিত্যের ছাত্র আবদুল্লাহ আবু সায়িদ ছুটে গেলেন ইংরেজির অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদের কাছে। এই দুই ছাত্রের সঙ্গে জুটেছিলেন মনজুর মওলা আর আতাউল হক। অধ্যাপক মুরশিদ জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সম্পাদক হতে রাজি হলেন। আর সভাপতি হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মুরশেদ।
রবীন্দ্রানুরাগী সুফিয়া কামালও কবির জন্মশতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়ে। ঢাকার প্রেসক্লাবকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল আর একটি কমিটি। শেষে অবশ্য তিনটি কমিটি একযোগে কর্মসূচি স্থির করে।
জন্মশতবর্ষ পালনের তোড়জোড় দেখে সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন তৎপর হয়ে ওঠেন। তাঁদেরই একজন বিচারপতি মুরশিদের সঙ্গে দেখা করে বলেন, ‘জানেন কি এই উৎসবের পেছনে আছে ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশন? তারাই টাকা-পয়সা দিচ্ছে গোপনে। এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে আপনার মতো একজন বিচারপতির জড়িত থাকা সংগত হবে কি?’ গোয়েন্দাদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন বিচারপতি মুরশেদ। তিনি তখন কমিটির সদস্যদের চাঁদা তুলতে নিষেধ করে দিলেন এবং বলে দিলেন যে প্রয়োজনীয় অর্থ তিনি নিজেই সংগ্রহ করে দেবেন। তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টার জেনারেল এ কে এম হাফিজুদ্দিন।
পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি সুফিয়া কামালের কাছে জানতে চেয়েছিলেন ‘এ সব কি হচ্ছে?’ সুফিয়া কামাল তার জবাবে বলেছিলেন, ‘সারা পৃথিবীতে যা হচ্ছে, তাই।’
ঢাকায় রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৪ দিন ধরে — ২৪ বৈশাখ থেকে ২৭ বৈশাখ (৭ মে থেকে ১০ মে, ১৯৬১)। ৭ মে ছিল রবিবার। এদিন সকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে উৎসব উদ্বোধন করেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইমাম হোসেন চৌধুরী। আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ‘হে নূতন দেখা দিক বার বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’ গানে গলা মেলান বিভিন্ন বয়সের শিল্পীরা। রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন খুরশিদি খানম, হুসনে আরা, নূরজাহান মুরশিদ, সেলিনা চৌধুরী, সাবিয়া বেগম, গোলাম মোস্তফা, ইকবাল চৌধুরী, আবদুল্লাহ আবু সায়িদ। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন লায়লা আরজুমান্দ বানু, বিলকিস নাসিরুদ্দিন, বেলা রায়, রাবেয়া খাতুন, গোপা বন্দ্যোপাধ্যায়, ফজলে নিজামি, আতিকুল ইসলাম, ফাহমিদা খাতুন, ভক্তিময় দাশগুপ্ত, ওয়াহিদুল হক। নিজের লেখা কবিতা পাঠ করেন শামসুর রহমান, উর্দুভাষী ড. আন্দালিব শাদানি।
পরের দিন ছিল ২৫ বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন। ফজলুল হক হলে বিকেল সাড়ে তিনটায় আয়োজন করা হয় এক আলোচনা সভার। রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন আবদুল হাই ও আরও অনেকে।
২৫ বৈশাখ সন্ধ্যায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে কবিতা পাঠের আসর বসে। কবিতা পাঠ করেন হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বেনজির আহমদ, আশরাফ সিদ্দিকি, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, লতিফা হক, লতিফা হিলালি প্রভৃতি। বুলবুল ললিত কলা একাডেমির প্রযোজনায় ও ভক্তিময় দাশগুপ্তের পরিচালনায় ‘চণ্ডালিকা’ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের অংশ বিশেষের অভিনয় হয়।
২৬ বৈশাখ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মুনীর চৌধুরী, হাসান জামান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। সেদিন সন্ধ্যায় প্রবল ঝড়-বৃষ্টি হয়। তাই সন্ধ্যার অনুষ্ঠান হয় ২৭ বৈশাখ। সেদিন ড্রামা সার্কেল ‘রাজা ও রানি’ মঞ্চস্থ করে। শেষ দিনের অনুষ্ঠানে টিকেট বিক্রি করে যে অর্থ সংগৃহীত হয় তা ২৬ তারিখে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দান করা হয়।
এই রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী সম্বন্ধে খান সারওয়ার মুরশিদের এক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন আবেদিন কাদের। ‘শ্রাবণ’ সাহিত্য পত্রিকার তরফে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এই উৎসবে মানুষের সাড়া কেমন ছিল, সে প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক মুরশিদ বলেন : —
“সব স্তরের মানুষই সাড়া দিয়েছিল। অনুষ্ঠানগুলোতে কি পরিমাণ জনসমাগম হয়েছিল তা অবর্ণনীয়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট ভরে যেত। বাইরে মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিতে হত। মানুষ ঝড়-বৃষ্টি মানে নি। মধ্যবিত্ত বাঙালি বন্যার মতো ওখানে গিয়ে আছাড় খেত। এ এক অসাধারণ ঘটনা। একদিকে যেমন ছিল প্রতিবাদ,অন্যদিকে একটা আকর্ষণ। এ অনুষ্ঠানগুলো প্রমাণ করছে যে সাংস্কৃতিক দিক থেকে মানুষ কতখানি তৃষ্ণার্ত ছিল। অসংখ্য মানুষ ফিরে গেছে, আমরা জায়গা দিতে পারি নি। যতক্ষণ জায়গা ছিল আমরা সবাইকে বসতে দিয়েছি, এমন কি যারা টিকেট করে আসে নি, তাদেরকেও। এ এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা।”
এই উৎসবে সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক মুরশিদ বলেন : —
“আজাদ ছাড়া সব পত্রিকার ভূমিকা ইতিবাচক ছিল। শ্রোতারা আমাদের সমর্থন দিয়েছে। ইত্তেফাক ও আজাদের মধ্যে তো মল্লযুদ্ধ চলেছিল অনেক দিন ধরে। আমাদের সেমিনারের কোন কোন বক্তব্য হেডলা্ইন করে প্রকাশ করা হত। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের উক্তি —‘ রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে বাংলা সাহিত্যের থাকে কি?’ হেডলাইন হয়েছিল। আমরা জনসমর্থন প্রচুর পেয়েছি। এর পেছনে রবীন্দ্র-প্রীতিই কাজ করেছে তা নয়। একটা প্রবল আবেগ ছিল বাংলা সংস্কৃতির, স্বকীয়তার পক্ষে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। “
জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলা একাডেমির ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক মুরশিদ বলেন : —
“zero.শূন্য। সৈয়দ আলি আহসান দায়িত্বে ছিলেন। আনিসুজ্জামান তাঁর কাছে গিয়েছিল কিছু করা যায় কি না জানার জন্য। খুব ডিসকারেজিং কথাবার্তা হয়েছিল। তিনি তো সেই ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন,’ পাকিস্তানের সংহতির জন্য প্রয়োজন হলে আমি রবীন্দ্রনাথকে বিসর্জন দিতে রাজি আছি’। এ কথাটি আমাদের সামাজিক ইতিহাসের নানা গ্রন্থে দেখতে পাই। তাঁর ভূমিকা খুব পরিষ্কার ছিল।”
পূর্ব বাংলার জাতীয় জীবনে ও সংস্কৃতিতে এই উৎসবের কোন অভিঘাত দেখা দিয়েছিল কি না সে প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক মুরশিদ বলেন : —
“এর একটা বিরাট অভিঘাত ছিল। প্রথমে নেতিবাচক কথাটাই বলি, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবাদ ছিল। কিন্তু এর ইতিবাচক দিকটা হল, এই যে আমরা খুব সৃজনশীল উপায়ে এই প্রতিবাদ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এই উৎসবের অনেক মানুষকে একত্রিত করে আমাদের জাতীয়তার এবং আমাদের জীবনের উৎসব কি হওয়া উচিত তার একটি বিশেষ উদাহরণ সবার সামনে তুলে ধরলাম। আমরা একটি জনগোষ্ঠীকে একটি মহৎ অভিজ্ঞতা দিলাম। বললাম, দেখ, পাকিস্তানি সংস্কৃতিতে আমরা যা দিতে চাই সেটা এই জিনিস। এটা কি তোমরা চাও না? এই কথাটা বলতে পারাই একটা অভিঘাত।” (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক