১৯৬৭ সালে। ২২ শে জুন। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে শুরু হল বিতর্ক। বাজেট অধিবেশনে রাজশাহি থেকে নির্বাচিত বিরোধী দলের সদস্য মুজিবর রহমান চৌধুরীর এক অতিরিক্ত প্রশ্নের উত্তরে তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বলেন যে পাকিস্তানি আদর্শের সঙ্গে না মিললে রেডিয়ো, টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হবে। খান এসবুর পহেলা বৈশাখ উদযাপন ও রবীন্দ্র সংগীতকে হিন্দু সংস্কৃতির অঙ্গ বলে রায় দেন।
জাতীয় পরিষদের এই বিতর্কের সংবাদ প্রকাশিত হয় ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘অবজারভারে’ (২৩-২৮, জুন ১৯৬৭)।
১৯৬৭ সালের ২৫ জুন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে যে সব বুদ্ধিজীবী বিবৃতি দেন তাঁরা হলেন : ড. মুহাম্মদ কুদরত-এ-খুদা, ড. কাজি মোতাহার হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, জয়নুল আবেদিন, এম এ বারি, মুহাম্মদ আবদুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, সিকান্দার আবু জাফর, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আহমদ শরিফ, নীলিমা ইব্রাহিম, শামসুর রহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, হাসান হাফিজুর রহমান, আনুসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, শহিদুল্লাহ কায়সার। (প্রথমে ১৮ জন ছিলেন, পরে ১ জন যুক্ত হন )
২৯ জুন ‘দৈনিক পাকিস্তানে’ পূর্ববর্তী বিবৃতির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক — সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, এম শাহাবুদ্দিন, মোহাম্মদ মাহের আলি, এ এফ এম আবদুর রহমান, কে এম এ মুনিম এক বিবৃতিতে বলেন : —
“১৮ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতির ভাষায় এই ধারণা জন্মে যে স্বাক্ষরকারীরা বাংলাভাষী পাকিস্তানি ও বাংলাভাষী সংস্কৃতির মধ্যে সত্যিকারের কোন পার্থক্য আছে বলে স্বীকার করেন না। বাংলাভাষী পাকিস্তানিদের সংস্কৃতি সম্পর্কে এই ধারণার সঙ্গে আমরা একমত নই।”
১৯৬৭ সালে ‘দৈনিক পাকিস্তানে’ আর একটি বিবৃতি প্রকাশ পায়। তাতে বলা হয় : —
“রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি মারাত্মক। যে তমদ্দুনিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা, উপরোক্ত বিবৃতি মেনে নিলে তার ভিত্তিই অস্বীকৃত হয়। এই কারণে উপরোক্ত বিবৃতিকে আমরা শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, অত্যন্ত মারাত্মক ও পাকিস্তানের মূলনীতি বিরোধী বলেও মনে করি।”
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী এই ৪০ জন রবীন্দ্র-বিদ্বেষী হলেন : — মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, বিচারপতি আবদুল মওদুদ, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামদুদ্দিন, অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ, মজিবর রহমান খাঁ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, কবি আহসান হাবিব, বেনজির আহমদ, কবি মইনুদ্দিন, অধ্যক্ষ শেখ শরফুদ্দিন, আ কা ম আদমুদ্দিন, তালিম হোসেন, শহেদ আলি, আ ন ম বজলুর রশিদ, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, সানাইল্লা নূরী, আবি আবদুস সাত্তার, কাজি আবুল কাশেম, মুফাখাখারুল ইসলাম, শামসুল হক, গোসমান গণি, মফিজ উদ্দিন আহমদ, আনিসুল হক, চৌধুরী, মোস্তফা কামাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ মতিউর রহমান, জহুরুল হক, ফারুক আহমদ, শরফুদ্দিন আহমদ, বেগম হোসেন আরা, মাফরুহা চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসের আলি, এম নুরুল ইসলাম, কবি জাহানারা আরজু, কাজি আবদুল ইয়াদুদ, আখতার উল-আলম। এই ৪০ জনকে কবি আবদুল গণি হাজারি ‘চল্লিশ চোর’ আখ্যা দিয়েছিলেন। কুলদা রায় বলেছেন যে অনেক স্বাক্ষরকারী উত্তরকালে অনেক মূল্যে কলঙ্কমোচনের প্রয়াস পেয়েছেন ; কিন্তু তাঁদের অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার ভূমিকা পালন করেছেন (রবীন্দ্র বিরোধিতার স্বরূপ : পাকিস্তানপর্ব )।
রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে এঁরা নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে সভা করেছেন এই আদর্শকে সামনে রেখে : বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত হিসেবে নজরুলের ভূমিকাকে তুলে ধরা, পাকিস্তানি জীবনাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবধারার সকল উপাদানকে আত্মস্থ করা, মুসলিম ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করা। সেখানে তাঁরা রবীন্দ্র বিরোধিতাত্যাগ করেন নি। এক বিবৃতিতে বলেছেন :
“রবীন্দ্রসংগীতের ভাব, ভাষা ও সুরের কোনটার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের তৌহিদবাদী জনসাধারণের তিলমাত্র যোগ নেই। রবীন্দ্রনাথের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি পূর্ব পাকিস্তানি তমদ্দুনের সম্পূর্ণ বিপরীত।”
১৯৬৭ সালের জুন মাসে ‘সংবাদে’ প্রকাশিত হল কবি জসিমউদ্দিনের বক্তব্য। তিনি বললেন, ‘রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে বাঙালির নাড়ির বন্ধন, কোন সরকারি আইন দিয়ে সে বন্ধন ছিন্ন করা যাবে না।’
ওই সালের জুন মাসে ‘দৈনিক পাকিস্তানে’ এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানি বললেন, ‘ইসলাম সত্য ও সুন্দরের জয় ঘোষণা করিয়াছে। এই সত্য ও সুন্দরের পতাকাকে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাই যারা ইসলামের নামে রবীন্দ্রনাথর উপর আক্রমণ চালাচ্ছেন, তারা আসলে ইসলামের সত্য ও সুন্দরের নীতিতে বিশ্বাসী নন।’ বলা বাহুল্য, ভাসানির বক্তব্যের প্রতিবাদ হয়।
১৯৬৭ সালের ৩০ জুন ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় ২৪ জুনের ১৯ জন বুদ্ধিজীবীর বক্তব্যের প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবাদপত্রে স্বাক্ষর করেন মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, ইব্রাহিম খাঁ, আহসান হাবিব প্রমুখেরা।
জুলাই মাসে ‘পয়গাম’ পত্রিকায় মওলানা আকরম খান-সহ ২৯ জন এক বিবৃতিতে জানালেন : —
“রবীন্দ্রনাথের বহু সংগীত মুসলিম তনদ্দুনকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়া হিন্দু সংস্কৃতি ও যৌন ভোগলালসার জয়গান গাহিয়াছে। সুতরাং পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম দিন হইতেই এ সকল সংগীতের আবর্জনা হইতে রেডিয়ো ও টেলিভিশনকে পবিত্র রাখার প্রয়োজন ছিল।”
১৯৬৭ সালে ঘটে আর একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
ঢাকার রমনার বটমূল থেকে শুরু হয় বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণ। শাসক ও তাঁদের তাঁবেদারদের রবীন্দ্র-বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে শিল্পীরা খোলাখুলি রবীন্দ্র সংগীত গাইবার পরিকল্পনা করেন। প্রকৃতিপ্রেমিক ড. নওয়াজেস আহমদ এমন একটি গাছের সন্ধান করেন যার তলায় রবীন্দ্র সংগীতের অনুষ্ঠান হতে পারে। সারা রাত আলো জ্বেলে ‘ছায়ানটে’র কর্মীরা জঙ্গল সাফ করেন। ভোর সকালে সেখানে ধ্বনিত হয় শিল্পীদের সমবেতকণ্ঠের গান —
আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও…
তারপর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় দৃপ্তকণ্ঠে বললেন, : —
“আমরা এই ব্যবস্থা মানি না। আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়িবই, আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাহিবই এবং রবীন্দ্র সংগীত এ দেশে গীত হইবেই।” কামাল লোহানি তাঁর ‘রবীন্দ্র-আন্দোলন ও ছায়ানট’ নিবন্ধে বলেছেন, —
“এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে এ দেশে রবীন্দ্রচর্চা, সংগীতশিক্ষা এবং শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ছায়ানট সংগীত বিদ্যানিকেতন এখন সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুপরিচিতও। বিশাল ছায়ানট ভবনে রবীন্দ্র-আন্দোলন এবং শুদ্ধ সংগীত প্রচার ও প্রসারে কেবল প্রতীকস্তম্ভ হয়ে নয়, নবাগত প্রজন্মকে সৎ ও যথার্থ বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারে স্নাত করতে চায় বলে ‘নালন্দা’ গড়ে উঠেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপলক্ষ বলেই বঙ্গসংস্কৃতির নানান রূপ ফুটিয়ে তুলতে ‘ছায়ানট বিদ্যানিকেতন’ ১৯৬৭ সাল থেকে রমনা অশ্বত্থমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। আজ সেই বিশাল ও বিপুল আয়োজন জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই সংস্কৃতিমনা সব মানুষ তাকিয়ে থাকেন পহেলা বৈশাখের দিকে। এখানে ঘৃণিত পাশবিক অপশক্তি আঘাত হেনেছিল ছায়ানটের অনুষ্ঠানে এবং দশজন প্রাণ হারিয়েছিলেন তাতে। কিন্তু সেই শোক শক্তিতে পরিণত হয়েছে পরের বছর থেকে।” (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক