সংগ্রামে, আন্দোলনে সংগীতের ভূমিকা বিরাট। এস্তোনিয়ার song revolution-এর কথা অনেকেই জানেন। আমাদের দেশে স্বদেশি আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি সংগীতগুলি রণসংগীত হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও সংগীতের ভূমিকা ছিল বিরাট। জিয়াউদ্দিন তারেক আলি ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ বইতে তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন।
ড. অনুপমকুমার পাল তাঁর ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির সাহসের দীপশিখা রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে (নিউজজি ২৪,কম) বলেছেন : —
“পরিবেশ পরিস্থিতি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের অমোঘভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আন্দোলনের পথে। সেদিনকার গানের দল শুধু এপার বাংলা নয়, ওপার বাংলার আনাচে-কানাচে তো বটেই, বাংলার বাইরে গিয়েও মুক্তিষুদ্ধের প্রতি মানুষের সমর্থনের মনোভাব গড়ে তুলেছে। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ হয়েছিল দিল্লিতে, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সেখানে নানান দেশের প্রতিনিধিদের সামনে গাওয়া হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদারদের পাশবিকতার বেদনাগাথা, আর স্বাধীনতার লালসূর্য ছিনিয়ে আনার শপথের কথা। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়ে দেশের গান গেয়ে তাদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখা, শরণার্থীদের দুর্দশার দিনে আশার সুর শোনানো গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত করা, জনসচেতনতা বাড়ানো, অর্থসংগ্রহ, ইত্যাদি বহুমাত্রিক অংশগ্রহণে সেদিনকার রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীরাও হয়েছিলেন এক একজন মুক্তিযোদ্ধা।
“নিঃস্ব, ভাগ্যবিড়ম্বিত, শোষিত বাঙালি রবীন্দ্রাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বুকের রক্ত ঢেলে পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে অর্জন করল স্বাধীনতার লাল সূর্য।”
“বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে পর্যায়ে পর্যায়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ধরেছে যারা তারা অধিকাংশই তরুণ যুবা। এই শহিদ তরুণ যুবারা কাতরতাহীন মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে জনগণকে অবিশ্রান্তভাবে প্রেরণা দিয়ে এসেছে পশ্চিম পাকিস্তানের গণবিরোধী শাসকচক্রের দানবীয় ঔপনিবেশিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। বিদ্রোহী যৌবনের প্রতিনিধিত্ব করেছে সংগ্রামী তরুণীরাও। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ মোহ ছিল বাংলার আদর্শবাদে উৎসর্গিত তরুণ-তরুণীদের প্রতি এবং সে কারণে অজস্র ছবি বেরিয়ে এসেছে বিশেষ করে নাটকে মৃত্যুভেদী যৌবনের দীপ্তশিখায় এরা যেন সেইসব ভবিষ্যতবাদী ছবি, যেগুলি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের পরে বর্তমান হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ সমকালীন পটভূমিতে উপেক্ষিত জীবনের বেদগান রচনা করেছেন।”
১৯৭১ সালে রবীন্দ্রনাথের যে সব গান মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে, সংগ্রামের প্রেরণা হয়েছে সেগুলি হল : —
ক] আমার সোনার বাংলা
খ] আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
গ] আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে
ঘ] ও, আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা
ঙ] বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও
চ] যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
ছ] বাংলার মাটি বাংলার জল
জ] যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক
ঝ] আমি ভয় করব না ভয় করব না
ঞ] শুভ কর্মপণে ধরো নির্ভয় গান
ট] সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান
ঠ] ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে
ড] নাই নাই ভয় হবে হবে জয়
ঢ] দেশে দেশে ভ্রমি যব দুখ গান গাহিয়ে
ণ] এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে
মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের গানের পাশে ছিল নজরুলের গান; ছিল জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিনয় রায়, সলিল চৌধুরীর লেখা গণসংগীত। এঁরা বিভিন্ন স্বদেশি গানও কোরাসের মাধ্যমে ‘গণসংগীতে’ রূপান্তর করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গানও তাঁরা অনেক গেয়েছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে খাজা আহমদ আব্বাস লিখেছিলেন, “For through famine or invasion, imperialist oppression or proletarian upsurge, the voice of Tagore remains the voice of Bengal consoling, exhorting the people of great unhappy land।” [অনুরাধা রায়ের ‘চল্লিশ দশকে বাংলায় গণসংগীত আন্দোলন’]
এবার বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত প্রসঙ্গ। এখানেও বাদ-প্রতিবাদ, বিতর্কের ঝড়। ১৯৬৯ সালে গণ অভ্যুত্থানের সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ কে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচন করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের এই গানটিকে প্রথম জাতীয় সংগীত হিসেবে গাওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথকে জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিবাদ। কারণ পাকিস্তানি শাসকরা রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করতে চেয়েছিলেন। তাই দেখানো দরকার ছিল যে বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের বিরুদ্ধে সংস্কৃতি দিয়েও লড়াই করছেন। ‘আমার সোনার বাংলা’ কে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করায় পাকিস্তানপন্থী কিছু লেখক, বুদ্ধিজীবীর আপত্তি ছিল কারণ রবীন্দ্রনাথ অন্য দেশের মানুষ, তিনি হিন্দু, তিনি গগন হরকরার সুর চুরি করে এই গানটি লিখেছেন।
‘আমার সোনার বাংলা’র বিরুদ্ধে এই আপত্তি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে মুজিব হত্যার পরে। মোজাফফর হোসেন তাঁর চমৎকার প্রবন্ধ ‘টার্গেট রবীন্দ্রনাথ না জাতীয় সংগীত’ প্রবন্ধে সে বিষয়টির উপর আলোকপাত করেছেন।
জাতীয় সংগীত প্রথম পরিবর্তনের চেষ্টা করেন মোশতাক সরকার। ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির অভিপ্রায় অনুসারে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। বলা হয় এক মাসের মধ্যে এই পরিবর্তন করতে হবে। দ্বীন মুহাম্মদের নেতৃত্বে কমিটির তিনটি বৈঠক হয় এবং শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় কাজি নজরুলের ‘চল চল চল’ অথবা ফররুখ আহমদের ‘পাঞ্জেরি’ — এই দুয়ের মধ্যে যে কোন একটিকে জাতীয় সংগীত করা যেতে পারে। কিন্তু এঁদের চেষ্টা সফল হয় নি।
পরে মেজর জিয়াও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিল মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে লেখেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান ভারতের জাতীয় সংগীত। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও নন। হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন কবির লেখা গান জাতীয় সংগীত হওয়ায় মুসলিম উম্মাহ উদ্বিগ্ন। এই গান আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থী বিধায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তন আবশ্যক।’ প্রধানমন্ত্রীর এই চিঠিতে ‘আমার সোনার বাংলা’র পরিবর্তে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’কে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করা হয়। তারপরে রেডিয়ো, টেলিভিশন ও সরকারি অনুষ্ঠানে ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’ গানটি প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি ‘প্রথম বাংলাদেশ’ গানটি গাওয়া শুরু হয়।
১৯৮১ সালে মৃত্যু হয় মেজর জিয়ার। তারপর জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগ থেমে যায়। আবার ২০০১-২০০৬ সালে বি এন পি-জামাত জোট সরকারের সময় জাতীয় সংগীতের পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়।২০০২ সালে শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলি আহসান মুজাহিদ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে একটি যৌথ ডিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। ২০০২ সালের ১৯ মার্চ এক চিঠিতে তাঁরা বলেন, ‘সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের ইসলামি মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে জাতীয় সংগীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন।’
এর পরে আর জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের কোন চেষ্টা দেখা যায় নি। তবে প্রচ্ছন্ন বিরোধিতা ছিল রক্ষণশীলদের মধ্যে (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক