মুজিব হত্যার পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে নেমে আসে অস্থিরতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের যে বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, যে জাতীয়তাবোধ ও গণতন্ত্রের আস্বাদ দিয়ে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যু হয় নি। রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। রবীন্দ্রচর্চার স্রোত স্তিমিত হয়েছিল, কিন্তু তার গতি একেবারে রুদ্ধ হয়ে যায় নি। শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’ বলে, ‘বিদেশি’ বলে তাঁকে বর্জন করার মনোভাব স্বাধীনতাপূর্ব কালের মতো শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে পারে নি। আমি আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধু তাঁর অকৃত্রিম রবীন্দ্রপ্রেম দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন।
২০২২ সালের ৮ মে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরস্থ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বললেন, — যে জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া রবীন্দ্রচর্চা বিকশিত হতে দেয় নি। ঠিক কথা। তবে এর মধ্যে এরশাদের রকম-সকম একটু ভিন্ন ধরণের।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। যাকে বলে philosopher king. না, এরশাদ ঠিক দার্শনিক নন। তিনি কবি। ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না যে কবিতা লেখেন তিনি। ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেল সব পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হচ্ছে তাঁর কবিতা। সাংবাদিক সম্মেলনে ঠোঁটকাটা সাংবাদিক জাহাঙ্গীর হোসেন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানত না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রহমানেরও এই ভাগ্য হয় নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কি কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে?’ (এরশাদ : কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল এক সেনানায়ক, নিষিদ্ধ কবিতা এবং একটি সংবাদ সম্মেলন / মোয়াজ্জেম হোসেন )
একদিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাশাসক জেনারেল অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ দেশের তরুণ কবির দল। হয়তো এরশাদ চেয়েছিলেন তরুণ কবির দলকে বশীভূত করতে। তাই তিনি বঙ্গভবনে বসিয়েছিলেন কবিতার আসর। নিয়মিত। কয়েকজন নামজাদা কবিও জড়ো হতেন সেখানে।
তখন ঢাকায় কবিদের দুটি সংগঠন ছিল। একটি সংগঠনের নাম ‘কবিকণ্ঠ’। এই সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দিন; ছিলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ আলি আহসান প্রভৃতিরা। জেনারেল এরশাদ এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ধানমণ্ডির এক পরিত্যক্ত বাড়িতে বসত কবিকণ্ঠের কবিতার আসর। আসতেন এরশাদ। পড়তেন কবিতা।
কবিদের আর একটি সংগঠনের নাম ‘পদাবলি’। সে সংগঠন পরিচালনা করতেন শামসুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহরা।
একজন ভুঁইফোড় জেনারেল এসে কবিতার অপমান করছে, এই দেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষার শিক্ষক মোহাম্মদ রফিক প্রচণ্ড রেগে জুন মাসের এক রাতে লিখে ফেললেন এক কবিতা। নাম দিলেন ‘খোলা কবিতা’, যার কয়েকটি পংক্তি :
সব শালা কবি হবে,
পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,
দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই
ফল ? রফিকের নামে জারি হল হুলিয়া। আত্মগোপন করে থাকতে হল কিছুদিন।
১৯৮৭ সালে শামসুর রহমানের নেতৃত্বে কবিতা উৎসব শুরু হল। এই উৎসব পরিণত হল এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মঞ্চে। এরশাদও পিছিয়ে থাকলেন না। এরশাদও তাঁর বঙ্গভবন কেন্দ্রিক কবিরা তখন এশীয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করলেন।
নিজে যখন কবি, তখন কবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতেই হয়। ১৯৮৯ সালে তিনি রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালন করার আয়োজন করলেন। এ কি রবীন্দ্রপ্রেম? না কি রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে নিজের ইমেজ বাড়ানোর চেষ্টা! আতিক আজিজ লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের কয়েকজন আত্মস্বার্থনিমগ্ন, বিবেকবর্জিত, চাটুকার কিংবা আমলাতন্ত্রের জাঁতাকলে ধৃত সাহিত্যিক ও শিল্পী এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। গণতন্ত্রবিধ্বংসকারী প্রতারক কবি-প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সভায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু অনেকেই সেদিন ওই অনুষ্ঠানমালা বর্জন করেন, শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী মহলে এরশাদ সরকারের লেজিটিম্যাসি অর্জনে সহায়তা দান থেকে তাঁরা বিরত থাকেন, নানা প্রকার প্রলোভন এবং প্রকাশ্য ও ছদ্ম চাপের মুখে তাঁরা নতি স্বীকার করেন নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেশ কিছু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এসেছিলেন, যে ঘটনা বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী মহলের বিস্ময় উদ্রেক করেছিল। তাঁরা কি এত কাছে থেকেও কিছু জানতেন না, বুঝতে পারেন নি? যাই হোক, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এরশাদ সরকার আয়োজিত রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপনকে রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসাবেই গ্রহণ করেছিলেন, জাতীয় আয়োজন হিসাবে নয়। সরকারি অনুষ্ঠানের বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে পৃথকভাবে ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছিল যেখানে কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিবেদিত হয় স্বতঃউৎসারিতভাবে, প্রাণের টানে।’ (বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা : বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনার ভূমিকা )
উত্তরাধিকারসুত্রে রবীন্দ্রপ্রীতি নিয়ে জন্মেছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তাই তাঁর আমলে রবীন্দ্রচর্চা গতিবেগ লাভ করেছে। রবীন্দ্রচর্চা ও গবেষণাকেন্দ্র সচল হয়েছে, রবীন্দ্র সংগীতের জাতীয় উৎসব হচ্ছে, রবীন্দ্র নাটক ও নৃত্যনাট্য অভিনীত হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে নতুন নতুন বই লেখা হচ্ছে, রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলি দর্শকদের জন্য সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের এই বই-এর শেষ অধ্যায়ে আমরা বাংলাদেশে সামগ্রিক রবীন্দ্রচর্চার একটি রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করব। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক