‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় (০৭.০৫.২০২৩) ‘বাঙালির মুক্তি আন্দোলন ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে লেখক ও সাংবাদিক শেখর ভট্টাচার্য বলেছেন যে সাতচল্লিশে দেশভাগের পর যতবার বাঙালি আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগেছে, ততবার রবীন্দ্রনাথ বাঙালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা কাজ করেছেন ‘ইতিহাসের অচেতন হাতিয়ার’ হিসেবে। তাঁরাই প্রকারান্তরে রবীন্দ্রনাথকে স্থাপিত করে দিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানের হৃদয়-মন্দিরে।
শেখর ভট্টাচার্য বলেছেন যে, — জোড়াতালি দিয়ে সৃষ্ট অদ্ভুতুড়ে এক রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই বাঙালিদের আত্মপরিচয়ের গোলকধাঁধায় ফেলে দেওয়া হয়। জাতীয়তা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য-সহ কোন বিষয়েই পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কোন সাদৃশ্য নেই। তারপরও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ তৈরির অপচেষ্টা চালানো হয়। এই প্রচেষ্টা ছিল অদ্ভুত। উদাহরণ : মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কবিতার ইসলামি রূপান্তর। মদনমোহন লিখেছিলেন :
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।
কবিতাটিকে পরিবর্তন করে গোলাম মোস্তফা লিখলেন : —
ফজরে উঠিয়া আমি দেলে দেলে বলি,
তামাম রোজ আমি যেন নেক হয়ে চলি।
এরকম পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের কবিতার হিন্দি রূপান্তরের কথা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : —
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণ ধুলার তলে
তার হিন্দি রূপান্তর হল : —
মেরা শির লেটেক দে তেরা টেংরি পর
আত্মপরিচয়ের সংকটের কারণে পূর্ব বাংলার বাঙালির মনে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হতে থাকে ক্ষোভ। মাতৃভাষার প্রশ্নে সেই ক্ষোভ ঘনীভূত হয়ে ওঠে। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ফররুফ আহমদ, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আবুল মনসুর আহমদ, কাজি আবুল হোসেন, আবদুল মতিন প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা।
১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দরাবাদে যে উর্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে মুসলিম লিগ নেতা খালেকুজ্জামান উর্দুকেই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। তার প্রতিবাদ করেন মুহম্মদ শাহীদুল্লাহদের মতো মানুষেরা। পাকিস্তানের জন্মের এক মাস আগে, ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর কথা বলেন। তারও প্রতিবাদ হয়।
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘তমদ্দুন মজলিশ’। ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁরা ভাষা আন্দোলনের উপর প্রকাশ করেন তাঁদের প্রথম বই — ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। তমুদ্দুন মজলিশ তথা ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল ১৯নং আজিমপুর রোড ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রশিদ বিল্ডিং। এমদাদুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন যে অর্থ সংগ্রহ, লিফলেট ছাপা ও বিতরণ, মিছিল, শ্লোগান সব কিছুই পরিচালিত হত তমদ্দুন মজলিশের নেতৃত্বে। সে সময়ে তমদ্দুন মজলিশ ছিল সব পেশার এবং সব শ্রেণির মানুষের প্রাণের সংগঠন। তমদ্দুন মজলিশের ব্যানারে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক আবদুল গফুর, আবদুল মতিন, অধ্যাপক শাহেদ আলি, অধ্যাপক চেমন আরা, বিচারপতি আবদুর রহমান প্রমুখেরা।
[প্রসঙ্গত উর্দু সম্পর্কে একটা মজার কথা বলেছেন মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তাঁর ‘আমাদের জাতিসত্তার বিকাশের ধারা’ বইতে : “নিখিল পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ জনগণের ভাষা ছিল বাংলা। আরও মজার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাদের কারও ভাষাই উর্দু ছিল না। খোদ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলি জিন্না উর্দু লিখতে বা পড়তে জানতেন না। পাকিস্তানের মাত্র ২ শতাংশ লোকের ভাষা ছিল উর্দু।”]
প্রকৃত প্রস্তাবে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, —
“আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিমছাত্র লিগ এবং তমদ্দুন মজলিশ-এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লিগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল। সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।”
১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের আলোচনা হয় এবং তারপরে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিগুলির দফা : —
ক] পূর্ববঙ্গ পরিষদের চলতি অধিবেশনে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা এবং সর্বস্তরের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাব পাশ করতে হবে।
খ] বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ সম্বলিত প্রদেশিক পরিষদে গৃহীত একটি প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।
গ] ভাষা আন্দোলন চলাকালে যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের মুক্তি দিতে হবে।
ঘ] আন্দোলন সমর্থনকারী কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের সমস্ত পত্র-পত্রিকার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
ঙ] পুলিশের নির্যাতনমূলক কার্যকলাপের তদন্ত করতে হবে।
চ] সরকারিভাবে ঘোষণা করতে হবে যে এই আন্দোলন গভীর দেশপ্রেম থেকে উৎসারিত।
কিন্তু এই চুক্তি সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে এক নাগরিক সংবর্ধনায় মুহম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সেই একই কথা তিনি বলেন ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন যখন পূর্ববর্তী চুক্তি অস্বীকার করে ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’ তখনই মানুষ ফেটে পড়ে ক্ষোভে। সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে নেমে আসে রাজপথে। আর তাদের দমন করতে এগিয়ে আসে পূর্ব পাকিস্তানের তথাকথিত আইনরক্ষকের দল। রক্তরঞ্জিত হয় রাজপথ। আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, আবুল বরকতসহ হতাহত হয় বহু ছাত্র। অচিরেই সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে-গঞ্জে।
পূর্বপাকিস্তানের এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁদের পাশে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছিল তাঁর স্বদেশি সংগীতগুলি। রণসংগীতই হয়ে উঠেছিল সেগুলি। সেলিনা হোসেন তাঁর মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’য় তুলে ধরেছেন সে ইতিহাস। উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র লেখক আলি আহমদের বয়ানে সেলিনা লিখেছেন : —
“অনেক রাত হয়ে গেলে একসময় আলি আহমদের চিন্তা গাঢ় হতে থাকে। বাঙালি জাতীয়তাবোধ বড় তীব্র হয়ে উঠেছে। তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কোন আপোষ নেই।” ( চলবে )
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক