আয়েত আলি খাঁ (১৮৮৪-১৯৬৭)। সবদর হোসেনের ছোটছেলে, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-এর ছোটভাই। বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁদের গোটা পরিবারই মেতে ছিলেন সংগীতের সাধনায়। তাই আয়েত আলির মা চান নি তাঁর ছোটছেলেটাও এই পাগলামিতে ভিড়ে গিয়ে তাঁর থেকে দূরে সরে যাক।
কিন্তু রক্তে যার সংগীতের সুর, তাকে বাধা দেবে কে! বড়ভাই ফকির আফতাবউদ্দিনের কাছে বায়না ধরলেন আয়েত আলি। তখন তাঁর বয়েস মাত্র দশ। দাদার কাছে সরগম আর রাগ-রাগিনীর তালিম গ্রহণ করলেন। আরও গভীরে যেতে হবে। আয়েত আলি ঠিক করলেন যাবেন তিনি মাইহার। সেখানে আছেন তাঁর আর এক দাদা আলাউদ্দিন খাঁ। তিনিও নামকরা সংগীতজ্ঞ। রাজদরবারের সভাবাদক। দাদার কাছে শিখলেন সেতার আর সুরবাহার। আলাউদ্দিন তাঁকে বললেন, এবার তোকে পাঠাব আমার গুরু ওয়াজির খাঁ-এর কাছে। কিন্তু নিজের পরিচয় গোপন করে তাঁর কাছে যেতে হবে। আমার কথা বলা চলবে না। নিজের যোগ্যতায় মন জয় করতে হবে গুরুর।
আয়েত আলি রাজি।
ঘটল এক কাকতালীয় ঘটনা। পেটের ভাত জোগাড় করার জন্য আয়েত আলি মজুরি করেন দিনেরবেলায়। এক বড় বাড়ির দারোয়ান তাঁকে দয়া করে দিয়েছেন থাকার জায়গা। পরে আয়েত আলি জেনেছেন তিনি ওয়াজির খাঁ-এর বাড়ির দারোয়ানের কাছেই লাভ করেছেন আশ্রয়। কিভাবে তিনি যাবেন গুরুজির কাছে, সে চিন্তা করেন তিনি। দিন-মজুরি করেন দিনে, আর রাতে করেন সুরসাধনা।
একদিন বেশ রাতে যখন তিনি সুরসাধনায় মগ্ন, কড়া নড়ে উঠল দরজায়। চমকে উঠলেন আয়েত আলি। এত রাতে কে কড়া নাড়ে! দরজা খুলে অবাক। এ তো স্বয়ং গুরুজি! এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে তিনি তাঁরই দারোয়ানের ঘর থেকে অপূর্ব সুরঝংকার শুনে ব্যাপারটা জানার জন্য কড়া নেড়েছেন দরজায়।
দীর্ঘ তেরো বছর ওয়াজির খাঁ-এর কাছে তালিম নিলেন আয়েত আলি। তারপর দাদা আলাউদ্দিনের মতো তিনিও হলেন মাইহার রাজ্যের সভাবাদক। শুধু সুরস্রষ্টি করে তৃপ্ত থাকেন নি আয়েত আলি। ‘সরোদ’ আর ‘সুরবাহার’ যন্ত্রদুটির আধুনিক রূপদান করলেন; ‘চন্দ্রসারঙ্গ’, ‘মনোহরা’, ‘মন্দ্রনাদ’ নামে তিনটি নতুন যন্ত্র উদ্ভাবনও করেছিলেন। তিনি দাদার সঙ্গে মিলে একটা অর্কেস্ট্রাদলও গঠন করেছিলেন, দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রাচ্যদেশের যন্ত্রের কনসার্ট হার মানাতে পারে পাশ্চাত্যের অর্কেস্ট্রাকে।
কলকাতার এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ শুনলেন আয়েত আলির সরবাহার। মুগ্ধ হলেন তিনি। মনে হল এঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসতে হবে। খবর গেল আয়েত আলির কাছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না তিনি। তাঁর দাদা আলাউদ্দিনকে জানানো দরকার, দরকার মাইহার রাজা ব্রজনাথের সম্মতি।
না, কোন বাধা এল না।
১৯৩৫ সালের জুলাই মাসে বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ওস্তাদ আয়েত আলিকে নিয়ে এলেন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর বাদ্যযন্ত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজে যোগ দিলেন ওস্তাদ আয়েত আলি। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতির অভিনবত্ব লক্ষ্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষার্থীদের কাছেও জনপ্রিয় হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধল শান্তিনিকেতনের আবহাওয়া। আয়েত আলির স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগল। মনের দুঃখ মনে চেপে তিনি জানালেন রবীন্দ্রনাথকে। একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বে রবীন্দ্রনাথও বিদায় দিলেন তাঁকে। তাঁকে দিলেন এক অভিজ্ঞানপত্র। শিবপুর হয়ে আয়েত আলি চলে গেলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে আয়েত আলি বিশ্বভারতীতে অধ্যাপনার জন্য পাঠালেন তাঁর প্রিয় শিষ্য আলি মহম্মদকে।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক