রবীন্দ্রনাথের জন্মের ৩৪ বছর পর সিনেমার উদ্ভাবন। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পাওয়ায় ধরা যায় রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা সাহিত্য আন্তর্জাতিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারও বেশ কয়েক বছর পর ১৯২০ ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নিয়ে সিনেমা করতে উৎসাহী হন। কিন্তু রবীন্দ্রসাহিত্য প্রথম সিনেমায় রূপ পায় আরও কয়েক বছর পর নরেশচন্দ্র মিত্রের পরিচালনায়। ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এর পরেও তপতী ছবির কাজ শুরু করলেও শুটিং মাঝপথে থমকে যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজি হলেও বিদেশ ভ্রমণের কারণে ছবির কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। এরপর শিশির ভাদুড়িও বিসর্জন ও বিচারক নামে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে দুটি ছবি করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের নিজের চলচ্চিত্র ভাবনার কথা প্রসঙ্গে আসে মুরারি ভাদুড়িকে লেখা রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠে। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর ‘তপতী’ নিয়ে ছবি করার কথাও ভেবেছিলেন। ১৯৩০ সালে জার্মানির মিউনিখে বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিশুতীর্থ’ কবিতা অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন—‘দ্য চাইল্ড’।
আদৌ কি সিনেমা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছিল? কতটা গভীর ছিল রবীন্দ্রনাথের সিনেমাভাবনা? গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক এবং পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর প্রিয়জনদের যেসব চিঠিপত্র লিখছেন তাঁর লেখা সেইসব চিঠিপত্রের মধ্যে থেকে বেশ কয়েকটির মধ্যেই কথাসৃষ্টির ব্যাপারে তাঁর সংশয়ের কথা ধরা পরে। এরপর একে একে মিউনিখে বসে ‘দ্য চাইল্ড’ চিত্রনাট্য রচনা, বিশেষ করে ১৯৩৪ সালে লেখা তাঁর ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসটির রচনা কাঠামো গঠনরীতি যদি খুব মন দিয়ে খেয়াল তাহলে দেখব এখানে একদিকে যেমন অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে আমরা পাচ্ছি- যিনি তার গদ্যে নতুন এক নির্মাণরীতির জন্ম দিচ্ছেন অন্যদিকে চারটি অধ্যায় যেভাবে শুরু হচ্ছে, তা পাঠেই মনে হচ্ছে যেম একটি সিনেমার চিত্রনাট্যের কাঠামোতে ভর করেই লেখা হচ্ছে আধুনিক আখ্যান।

তখন বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক দেবকী বসু রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। ঠিক করলেন ‘চোখের বালি’ নিয়ে ছবি করবেন। কিন্তু তার জন্য তো রবীন্দ্রনাথের অনুমতি প্রয়োজন। একদিন দেবকীবাবু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে হাজির হয়ে গেলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের সামনে উপস্থিত ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। দেবকীবাবু তার ইচ্ছের কথা রবীন্দ্রনাথকে জানালেন। তা শুনে রবীন্দ্রনাথ সম্মতিসূচক ইঙ্গিতই দেন। কিন্তু এরপরই দেবকীবাবু বললেন যে তিনি তাঁর ছবির জন্য চিত্রনাট্যে মূল গল্পের সামান্য হলেও পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। এতে রবীন্দ্রনাথের আপত্তি আছে কিনা তা জানতে চাইলেন। ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথ কিছু বলার আগেই তীব্র আপত্তি জানিয়ে বসলেন প্রশান্ত মহলানবীশ। তার প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথের লেখায় কলম চালানোর কথা আর কেউ ভাবে কি করে? এটাই ছিল মহলানবিশের আপত্তির মূল কারণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শান্তভাবেই থামিয়ে দিয়ে বললেন যে এ ব্যাপারে তাঁর নিজের তেমন আপত্তি নেই, কারণ সাহিত্য ও সিনেমা দুটি আলাদা মাধ্যম, দুটি মাধ্যমের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই আলাদা। রবীন্দ্রনাথের সিনেমা সম্পর্কে ধারণা আমরা যে এখান থেকেও বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই ঘটনার আগে তিনি মস্কোয় গিয়ে সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’ ছবিটি দেখেছিলেন। তিনি সিনেমা পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আইজেনস্টাইন ওই সময়ে মস্কোতে ছিলেন না। আইজেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের সিনেমার প্রতি আগ্রহ, নতুন মাধ্যমের প্রতি উৎসাহ বলেই ধরতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ তার ৬৭ বছর বয়সে ছবি আঁকায় মন দিয়েছিলেন আর এরও প্রায় বছর তিন পর তিনি সিনেমা বানাতে উৎসাহী হয়ে উঠলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর বহু কাহিনি নিয়ে ছবি হয়েছে কিন্তু প্রথম ও শেষ বারের মতো তিনি সিনেমা পরিচালনা করেন নিজের নাটক ‘নটীর পূজা’। ঘটনাটিকে এই উপমহাদেশের একটি অন্যতম ঘটনা বলাই যায়। তিনি নিজে যে সিনেমা মাধ্যমটির প্রতি বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তা আগের কয়েকটি ঘটনার মধ্যেও স্পষ্ট। ‘নটির পুজা’ পরিচালনার আগেও তিনি ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ফিল্মস লিমিটেড তাঁর ‘তপতী’ অবলম্বনে যে ছবিটি করেছিল তাতে রবীন্দ্রনাথ প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে সেই ছবির শ্যুটিংয়ের সময় থেকেই তিনি নতুন এই শিল্প মাধ্যমটির বিপুল সম্ভবনা টের পেয়েছিলেন। চলমান ছবির গতিপ্রবাহের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতেও তাঁর উৎসাহ ছিল যথেষ্ট।
‘পূজারিণী’ কবিতার আধারে রবীন্দ্রনাথ ‘নটির পুজা’ নাটকটি লিখেছিলেন। নিউ থিয়েটার্স-এর প্রতিষ্ঠাতা বীরেন্দ্রনাথ সরকার রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানান নিউ থিয়েটার্সের ব্যানারে নাটকটিকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করার জন্য। রবীন্দ্রনাথও মঞ্চায়নের ভঙ্গিতে নাটকটি চলচ্চিত্রায়িত করতে রাজি হন। মাত্র চার দিনে এই ছবির শ্যুটিং সম্পন্ন হয়েছিল। শ্যুটিং হয়েছিল নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর ১ নম্বর ফ্লোরে। রবীন্দ্রনাথ নিজে উপালি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আর ছিল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা।
১৯৩২ সালের ২২ মার্চ ‘নটীর পূজা’ ছবিটি চিত্রা(পরবর্তীতে মিত্রা)সিনেমা হলে মুক্তি পায়।নিউ থিয়েটার্স কর্তৃপক্ষ মনে করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এই ছবিতে অভিনয় করেছেন বলে ছবিটি জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। তাঁরা লভ্যাংশের ৫০% শান্তিনিকেতন শিক্ষাপ্রকল্পে দান করতে সম্মত ছিলেন। কিন্তু ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে অসফল হয়। তার থেকেও দুঃখজনক ঘটনা ১৯৪০সালে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ছবিটির প্রিন্টের সঙ্গে নেগেটিভও পুড়ে যায়।
Very nice writing।
মাধ্যমটি ব্যায়বহুল বলে রবীন্দ্রনাথ পিছিয়ে এসেছিলেন, তাছাড়া ‘নটির পুজা’-য় একটা বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন।
বাহ বেশ লাগল