সময়টা তিরিশের দশকের প্রায় মাঝামাঝি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিরও প্রায় এক দশকের বেশি সময় কেটে গেছে। মিষ্টির এক বিরাট হাঁড়ি নিয়ে এক মিষ্টির দোকানের মালিক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছে হাজির। না,কবিতা,গল্প বা নাটক দেওয়ার কোন অনুরোধ নয়, অভিনব এক আবদার তাঁর। ভদ্রলোকের দোকানের মিষ্টি খেয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে দিতে হবে কবির অভিমত৷ ‘জলযোগ’ নামে এক মিষ্টির দোকানের মালিক এই বলে খানকয়েক সন্দেশ একটা প্লেটে তুলে কবির দিকে এগিয়ে দিলেন৷ অন্য একটা হাঁড়ি থেকে বের করে আনলেন চিনি পাতা দই৷ মিষ্টির দোকানের মালিকের চাপাচাপিতে কবিকে দই — সন্দেশ দু’রকমের মিষ্টি চেখে পরখ করতে হল৷ কবি লিখলেন,’ জলযোগ-এর মিষ্টান্ন পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম। তৃপ্তি লাভ করিয়াছি৷ ইহার বিশেষত্ব আছে সেজন্য ইহা আদরনীয়৷ সেইসঙ্গে যে দধি সেবন করিলাম তাহা বিশেষ প্রশংসার যোগ্য’৷ ১৯৩৪ সালের ৫ অক্টোবর শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাক্ষর সহ অভিমতটি বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল৷ শ্রীঘৃত’ কোম্পানির কয়েকজন একদিন রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে সেই জলযোগ মিষ্টির দোকানের মালিকের মত একই রকম আবদার করলেন,তাদের ঘি নিয়ে রবীঠাকুর যদি দু’কলম লিখে দেন৷ আপত্তি করেন নি নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তাদের শ্রীঘৃত সম্পর্কে লিখে দিয়েছিলেন — ‘বাংলাদেশে ঘৃতের বিকারের সঙ্গে সঙ্গে যকৃতের বিকার দুর্নিবার হয়ে উঠেছে৷ শ্রীঘৃত এসেই দুঃখ দূর করে দিয়ে বাঙালীকে জীবন ধারনে সহায়তা করুক এই কামনা করি৷’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই মন্তব্য সহ শ্রীঘৃতের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪৪ সালের ১ বৈশাখ সেসময়ের বিখ্যাত পত্রিকা ‘প্রবাসী’তে।

সাহিত্য রসিক প্রখ্যাত বাঙালি হেমেন্দ্রমোহন বসু ছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত কুন্তলীন তেলের প্রস্তুতকারক৷ রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর সখ্যতা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং নিজেও এই তেল মাখতেন৷ কুন্তলীন তেল প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ অভিমতে লিখেছিলেন — ‘কুন্তলীন তেল আমরা দুইমাস কাল পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি৷ আমার কোন আত্মীয়ের বহুদিন হইতে চুল উঠিয়া যাইতেছিল কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া এক মাসের মধ্যে তাহার নতুন কেশোদগম হইয়াছে৷ এই তেল সুবাসিত এবং ব্যবহার করিলে ইহার গন্ধ ক্রমে দুর্গন্ধে পরিণত হয় না’ রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষর সহ কবির প্রশংসা সম্বলিত এই বিজ্ঞাপনটি ‘বাংলার বানী’ পত্রিকায় বাংলা ১৩৩৮ সালের জন্মাষ্টমী সংখ্যায় বেরিয়েছিল। স্বদেশী অধ্যাবসায় কে উৎসাহ দিতে স্বদেশী প্রসাধনী সংস্থা রেডিয়ম সংস্থার ক্রীমকে রবীন্দ্রনাথ লিখে দিয়েছিলেন প্রশংসাপত্র৷ কি লিখেছিলেন কবি, চলুন একটু দেখে নেওয়া যাক—’যাঁহারা স্নো, ক্রীম জাতীয় প্রসাধন দ্রব্য ও ওডিকোলন প্রভৃতি গন্ধরস ব্যবহার করিয়া থাকেন তাঁহারা রেডিয়ম কারখানা হইতে প্রস্তুত উক্ত দ্রব্যগুলি পরীক্ষা করিয়া দেখিলে বিলাতি সামগ্রী হইতে তাহার পার্থক্য বুঝিতে পারিবেন না৷ প্রথমস্থলে এই স্বদেশী অধ্যাবসায়কে উৎসাহ দেওয়া তাঁহাদের পক্ষে কর্তব্য বলিয়া মনে করি।’
তিরিশের দশকেই ‘গোদরেজ’ কোম্পানী কবিকে দিয়ে তাদের তৈরি সাবান সম্বন্ধে একটি অভিমত লিখিয়ে ছিলেন।বিশ্বকবিও সানন্দে লিখে দিয়ে ছিলেন ‘গোদরেজ সাবানের তুলনায় কোন বিদেশীয় সাবান এত উৎকৃষ্ট আছে কিনা তাহা আমার জানা নেই৷ ভবিষ্যতে আমি গোদরেজ সাবান ব্যবহার করব বলিয়া স্থির করিয়াছি’৷ ১৯৩৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের আনন্দ বাজার পত্রিকায় কবির কথা গোদরেজ কোম্পানির তরফ থেকে বিজ্ঞাপিত করা হয়েছিল।

নিজে ব্যবসায়ী না হয়েও সমাজে ব্যবসার প্রচার ও প্রসারে রবীন্দ্রনাথ এতটাই প্রভাব ফেলেছিলেন যে ৮০/৮৫ বছর আগেও রবীন্দ্রনাথের থেকে বিজ্ঞাপন দাতারা তাদের পণ্যের জন্য প্রশংসা সম্বলিত অভিমত পেতে তাঁর কাছে দেশের প্রখ্যাত কোম্পানী থেকে মিষ্টির দোকানী, ঘি-বিক্রেতা সহ অন্যান্যরা তাদের পণ্যের প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি লাইন লিখে দেবেন এই আশায় ঠাকুর বাড়িতে নিয়মিত উপস্থিত হতেন। অনেকের আবদার মেনে রবীন্দ্রনাথ অভিমত লিখেও দিয়েছেন। কবির অভিমত নিয়ে মিষ্টি থেকে ঘি,তেল,সাবান ও অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে নানান পত্রপত্রিকায়৷
তিনি বিজ্ঞাপন জগতে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বও ছিলেন।শুধু মাত্র দেশীয় পণ্য নয়,বরং বিদেশি ও দেশীয় এয়ারলাইন্স, ভারতীয় রেল, সমবায়, বিমা সংস্থার বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞাপন দাতাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যকে সফল করতে বিজ্ঞাপনের জন্য জিঙ্গল লেখা, মডেলিং করা থেকে বিজ্ঞাপনের কপিও পর্যন্ত লিখেছেন। বিজ্ঞাপনে অংশ নেওয়ার জন্য টাকা নিয়ে তিনি সেই টাকা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল সংগ্রহের কাজে লাগাতেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি বিশ্বভারতীকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের প্রচার ও টাকা সংগ্রহ করতেন। বিশ্বভারতীর নাটক “বিসর্জন” এর মতো অনুষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপনও লিখেছেন, যা ১৯২৩ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঠাকুর্দা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত কখনোই ব্যবসায়ী ছিলেন না। নিজের সৃষ্টি সাহিত্য,সঙ্গীত, শিল্পকলা কোন কিছুই নিয়ে কোনদিন ব্যবসা বাণিজ্য করেন নি। বরং যে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য বিজ্ঞাপনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন মৃত্যুর পর সেই বিশ্বভারতীকেই তাঁর যাবতীয় লেখার পেটেন্ট রাইট দিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পেটেন্ট রাইটের দৌলতে বিশ্বকবির প্রয়াণের পর রবীন্দ্র রচনাবলী সহ রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় রচনা প্রকাশ ও বিক্রির একমাত্র একচেটিয়া অধিকার ছিল বিশ্বভারতীর। বেশ কিছু বছর আগেই বিশ্বভারতীর হাত থাকা পেটেন্ট রাইট এর মেয়াদ শেষ। ফলে বিশ্বভারতীর ঘেরা টোপ মুক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথ এখন সর্বজনীন।

পেটেন্ট এর ঘেরাটোপ মুক্ত সর্বজনীন রবীন্দ্রনাথের শিল্প সৃষ্টি নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে এই সুযোগে নেমে পড়ছেন বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
নিজের সৃষ্ট সাহিত্য, শিল্প কৃতির মধ্য দিয়ে বাঙালি মননে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, আঁকা ছবি আর স্কেচকে বিনা রয়েলটিতে ব্যবসায়িক মূলধন হিসাবে ব্যবহার করে চুটিয়ে মুনাফা লুটে নিচ্ছেন তাঁরা।
তাই ফ্যাশন জগতে গেঞ্জি, টিশার্টে রবীন্দ্রনাথের মুখ, স্কেচ, কবিতার লাইন, শাড়িতে চারুলতার দু’চারটি লাইন, চুড়িদারে গীতাঞ্জলির পঙক্তি, ওড়নায় স্ত্রীর পত্র,বলাকা’র কয়েক লাইন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এলিট শ্রেণি থেকে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির মননের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় রবীন্দ্রনাথ নামক শক্তিশেল ছুঁড়ে মুনাফা তুলছেন ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে বুটিক শিল্পের কারবারীরা। শুধুই ফ্যাশন আর বুটিক শিল্প নয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ও ব্যবহার করে ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রকাশনা ও চলচ্চিত্র শিল্পের বাজার তৈরি করে রমরমা ব্যবসা চলছে। প্রাবন্ধিক সিদ্ধার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘রবীন্দ্র সংগীতের বহুলাংশই প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার লহরীতে ভেসে চলা এক ভেলা-এক নৌকো। এই সংগীত শুধু কর্ণে প্রবেশ করে না, মরমেও আঘাত হানে। পরমব্রহ্মের প্রতি নিবেদিত সংগীত শুনলে শ্রোতা যেন খুঁজে পায় পরমেশ্বরের ঠিকানা। বহু অফিসে,বহু প্রতিষ্ঠানে,বহু কর্পোরেট হাউসে রবীন্দ্র সংগীতের সুচারু প্রয়োগের দ্বারা কর্মীদের কর্ম দক্ষতা বাড়ানো হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রান্তিক উৎপাদন বাড়ে। শুধু সরকারি অফিস নয়,বহুজাতিক সংস্থা, বিমা অফিস,ব্যাঙ্ক এবং বিমান সংস্থাতেও রবীন্দ্রসঙ্গীতের ও সুরের চাহিদা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই প্রয়োগ অর্থনীতির ভাষায় পজিটিভ এক্সর্টারনিলিটি তৈরি করে বলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। সর্বশেষে জাতীয় স্তরে জিডিপি বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও হয়তো ভাবেননি যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে যুক্ত না থেকেও সবার অলক্ষে ব্যবসা বাণিজ্যের একজন পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠবেন। দেশের রাজনীতিতেও তাঁকে চাই। উত্তাল ও হিংস্র রাজনীতির প্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ হাজির হয়েছেন সংগীতের ডালি হাতে। রবীন্দ্রসঙ্গীত পৌঁছে দিয়েছে শান্তির বার্তা। শান্ত করেছে বিবদমান দুই পক্ষকে। থেমে গেছে অনভিপ্রেত রক্তপাত।সামাজিক শান্তি অক্ষুন্ন থেকেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটের আগে সেই রবীন্দ্রনাথের শরণাগত ভোটের বৈতরণী পেরিয়ে যাবার জন্য।

দেওয়াল লিখনেও রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক উক্তি। প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিকই হোক, রবীন্দ্রনাথ কেই চাই। একমাত্র তিনিই পারেন বাঙালির মন জয় করতে। ভোটের বৈতরণী পার করে দিতে।
অব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ কোনদিনই ব্যবসা করেন নি। পারিবারিক কারণে জমিদারি দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ডুবে থাকতেন নিসর্গ ভাবনায়, প্রকৃতির প্রেমে তন্ময় থাকতেন কবি। তাঁর জীবনবোধ, নিসর্গ ভাবনা ও আধ্যাত্ম দর্শনে বাণিজ্যের গঙ্গাজল নেই যা ছিটিয়ে অব্যবসায়ী বাঙালিকে ব্যবসায়ী করে তোলা যাবে। অথচ তিনি ব্যবসার মূলধন। যাকে বাদ দিয়ে ব্যবসা নৈব নৈব চ।’ আজও রবীন্দ্রত্তোর সময়ে বাঙালির মননের সব থেকে দুর্বলতম স্থান সেই রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র মনন, দর্শন, সংস্কৃতি বা ভাবনা নির্ভর বাঙালির মনে যদি উস্কে দেওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের কথা তাহলে বিজ্ঞাপনের সাফল্য আটকায় কে? ভারতীয় রেল, কলকাতা কর্পোরেশন,পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রচেষ্টায় সুস্থ ও রুচিশীল বাতাবরণ সৃষ্টির প্রয়াসে বিজ্ঞাপন শিল্পে আজও চির অম্লান সর্বকালের সেলিব্রিটি রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে সুচারু ভাবে ব্যবহার করে শুধু অভিনবত্ব আসেনি। এসেছে ও আসছে অর্থও। আর এখানেই অনন্য বিজ্ঞাপনের সর্বকালের সেলিব্রেটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার প্রাবন্ধিক সিদ্ধার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ইন্টারনেট।
অসামান্য তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। ঋদ্ধ হলাম।
কাজল কালির বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্র অভিমত বহু চর্চিত, অথচ আপনার প্রবন্ধে তা অনুল্লেখিত।