রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় শীতকালে অগ্রহায়ণ মাসে। দিন তারিখ ২৪ অগ্রহায়ণ ১২৯০। বিবাহ হয়েছিল তাঁর নিজের বাড়ীতে। বিয়ে করতে যেতে হয়নি তাঁকে শ্বশুরবাড়ি। পরিবারের বড় ছেলের ও ছোট ছেলের বিয়ে বাপ-মা-রা ঘটা করে দিয়ে থাকেন। তাঁদের প্রথম কাজ ও শেষ কাজ বলে। রবীন্দ্রনাথ মহর্ষিদেবের শেষ পুত্র। মা নাই—আড়ম্বরে উদাসীন পিতা তখন হিমালয়বাসী । বিয়েতে ঘটা করে কে। ঘরের ছেলে নিতান্ত সাধারণ ঘরোয়াভাবে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল। ধূমধামের সম্পর্ক ছিল না তার মধ্যে। পারিবারিক বেনারসী শাল ছিল একখানি — যার যখন বিয়ে হত সেইখানি ছিল বরসজ্জার উপকরণ। নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে — স্ত্রী আচারের সরঞ্জান যেখানে সাজানো। বরসজ্জার শালখানি গায়ে জড়ানো রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন সিঁড়ির উপর। নূতন কাকিমার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী) আত্মীয়া — যাকে সবাই ডাকতেন ‘বড় গাঙ্গুলীর স্ত্রী’ বলে — রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি। তাঁর পরণে ছিল একখানি কালোরঙের বেনারসী জরির ডুরে।
বিয়ের সময় কাকিমা ছিলেন খুব রোগা। গ্রামের বালিকা শহুরে হাবভাব কিছুই জানতেন না। কী মানুষের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হচ্ছে — সে যে কত বড় আশ্চর্য মানুষ — কাকে তিনি পেলেন, এর কোনো ধারণাই তাঁর ছিলনা। কনে এনে সাত পাক ঘুরানো হল — শেষে বরকনে দালানে চললেন সম্প্রদানস্থলে। বাড়ির অবিবাহিত বড় মেয়ে গুলি সঙ্গে সঙ্গে চলল। আমিও জুটে গেলুম তাদের সঙ্গে। দালানের একধারে বসবার জায়গা ছিল আমাদের। দেখলুম সেখানে বসে স্বচক্ষে কাকিমার সম্প্রদান।

সম্প্রদানের পর বর কনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বউ এলে তার থাকবার জন্যে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসলো সেই ঘরেই। বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড়কুলো খেল আরম্ভ হল, ভাঁড়ের চালগুলি ঢালা-ভরাই হল ভাঁড়খেলা। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুর করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। তাঁর ছোট কাকীমা ত্রিপুরাসুন্দরী (নগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী) বলে উঠলেন,
— ও কি করিস্ রবি? এই বুঝি তোর ভাঁড় খেলা? ভাঁড়গুলো সব উল্টে পাল্টে দিচ্ছিস কেন?
রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ি — নিজেই বর । তাঁকে শ্বশুর বাড়ি যেতে হয়নি। লজ্জা সংকোচের কারণ ছিলনা। রবীন্দ্রনাথ বললেন,
— জানোনা কাকিমা — সব যে উলট পালট হয়ে যাচ্ছে — কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উলটে দিচ্ছি।
রবীন্দ্রনাথ বাক্সিদ্ধ মানুষ — কথায় তাঁকে হারাতে পারবেনা কেউ। তাঁর কাকিমা আবার বললন,
—তুই একটা গান কর। তোর বাসরে আর কে গাইবে — তুই এমন গাইয়ে থাকতে?
রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর তখন কি চমৎকার ছিল, সে যারা না শুনেছে বুঝতে পারবেনা। আমরা যে কানে শুনেছি সে আমাদের কম সৌভাগ্য নয়। এখন সবই হারিয়ে গেছে — তবু যা পেয়েছি তাই রেখেছি মনে ধরে।
বাসরে গান জুড়ে দিলেন :
আ মরি লাবণ্যময়ী
কে ও স্থির সৌদামিনী
পূর্ণিমা জ্যোছনা দিয়ে
মার্জিত বদনখানি
নেহারিয়া রূপ হায়
আঁখি না ফিরিতে চায়
অপ্সরা কি বিদ্যাধরী
কে রূপসী নাহি জানি।
দুষ্টমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। বেচারী কাকিমা রবীন্দ্রনাথের কাণ্ড দেখে জড়োসড়ো। ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন। আরও একটা গান তখন গেয়েছিলেন — সেটা আমার স্মরণ নাই। সেদিনকার পালা ওখানেই শেষ।

কাকিমা প্রায় আমার সমবয়সী ছিলেন — মাত্র ১বৎসরের বড় আমার থেকে। তাই তার সাথে আমাদের বেশ ভাব জমেছিল পরে। নানারকম ছেলেমানুষি গল্প হত খুব। নতুন কাকিমার এক বোনঝি নীরজা থাকতেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে — তিনিও আমাদের গল্পের দলের একজন। কাকিমার বিবাহের তিনমাস পরে আরেকটি ঘটনা না বলে পারছিনা। ন’পিসিমার (স্বর্ণকুমারী) প্রথমা কন্যা হিরন্ময়ীর বিবাহ। গায়েহলুদে দুপুরে আমরা নিমন্ত্রণে গিয়েছি। মধ্যাহ্ন ভোজনে বসতে প্রায় একটা বেজে গেল। খেয়ে উঠতে দুটো। সেই সময়ে কলকাতা মিউজিয়মে প্রদর্শনী খুলেছে নূতন। সেই প্রথম কলকাতায় প্রদর্শনীর প্রচলন। তিনটের সময় প্রদর্শনীতে যাবার জন্যে সকলে প্রস্তুত, আমরাও বাড়ি ফেরবার মুখে। মেজো কাকিমার (হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী) সঙ্গে কাকিমাও যাবেন প্রদর্শনীতে। বাসন্তীরঙের জমিতে লাল ফিতের উপর জরির কাজ করা পাড় বসানো শাড়ি পরেছেন কাকিমা। বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। কথায় বলে বিয়ের জল গায়ে পড়লে মেয়েরা সুন্দর হয়ে বেড়ে ওঠে। সেই রোগা কাকিমা দিব্যি দোহারা হয়ে উঠেছেন তখন। রবীন্দ্রনাথ কোথা থেকে এসে জুটলেন সেই সময় সেইখানে — হাতে একটা প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি নিয়ে খেতে খেতে। কাকিমাকে সুসজ্জিত বেশে দেখে দুষ্টুমি করে গান জুড়ে দিলেন তাকে অপ্রস্তুত করবার জন্যে —
হৃদয় কাননে ফুল ফোটাও
আধো নয়নে সখি চাও চাও
এমন চড়া সুরে ধরেছেন যে জোর পৌঁছে যায় সবার কানে —
ধীরি ধীরি প্রাণে আমার এসোহে
মধুর হাসিয়ে ভালোবেসোহে।
হৃদয়ে কাননে ফুল ফোটাও
আধো নয়নে সখি চাও চাও
পরাণ কাঁদিয়ে দিয়ে হাসিখানি হেসোহে।
পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫-এ প্রকাশিত