সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন আমেরিকায় ঘর-বাড়ি বদলে যাওয়ার কথা। তিনি প্রথম যখন আইওয়া যান তখন যে বাড়িতে ছিলেন, পরের বার গিয়ে সে বাড়ির চিহ্ন খুঁজে পান নি। এ কথা আরও কিছু কিছু মানুষের মুখে শুনেছি। কিন্তু একশো বছরের আগে ইলিনয়ের আর্বানা শহরে যে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ পাঁচ-ছয় মাস ছিলেন, সেটি এখনও কালের প্রহার সহ্য করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সাদা দোতলা বাড়ি, ইংল্যাণ্ডের ধাঁচে তৈরি।
প্রথমবার আমেরিকা এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১২ সাল। ২৭ অক্টোবরে এলেন নিউইয়র্ক। তারপরে ৭ নভেম্বর এলেন আর্বানা শহরে। জ্যোতিদাদাকে এখান থেকে তিনি চিঠিতে লিখছেন, ‘ভাই জ্যোতিদাদা, আমরা আমেরিকায় এসে পৌঁচেছি। সে কারণে তোমার চিঠি আসতে দেরি হয়েছে। … আমরা একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছি’। বেশ পছন্দ হয়েছে রবীন্দ্রনাথের। গ্রাম্য এলাকা। পরিবেশ তাঁর দেশের মতোই, দেশের মতোই নীল আকাশে মেঘের খেলা।

কাজল মুখোপাধ্যায় ও মৌসুমী দত্ত রায়
কোনও বিশেষ কাজ নিয়ে আসেন নি তিনি। নিজের মনে করছেন, গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের প্রুফ দেখছেন, যে বই তাঁকে অনতিবিলম্বে এনে দেবে বিশ্বখ্যাতি। কবি ইয়েটস, রেদেনস্টাইনদের লিখছেন চিঠি। ‘সাধনা’র প্রবন্ধ লিখছেন। কিন্তু এখানেও জুটে গেল কাজ। কবি পরিহাস করে বলেছেন যে এখানকার মানুষ বক্তৃতা শোনের জন্য পাগল (ইংরেজি ‘ম্যানিয়া’ শব্দই ব্যবহার করেন তিনি)। ক্যাণ্ডি ও চকোলেটের মতই তারা ভালোবাসে ভাষণ। স্থানীয় ইউনিটি ক্লাবে বক্তৃতা করতে হলে এক রবিবার। বক্তৃতা পাগল মানুষ ছাড়ল না তাঁকে। পর পর কয়েকটি রবিবারে তিনি বক্তৃতা করলেন। জনসভায় ইংরেজিতে এই প্রথম বক্তৃতা তাঁর। রোদেনস্টাইনকে এখান থেকে কবি লিখছেন, ‘You will be surprised to learn that I have read four papers in the Unity Club here on four consecutive Sundays, It has not been an easy task for me to express my thoughts in English, especially thoughts which are not similar to the audience here.’
সেই ঐতিহাসিক দোতলা বাড়িটির বর্তমান মালিক স্ট্যান শার্লো। রবীন্দ্রনাথের কথা তিনি জানেন। কবিকে শ্রদ্ধাও করেন। কিন্তু বাড়িটি সংরক্ষণ করার ব্যাপারে শার্লো কোন উদ্যোগ নেন নি। সে উদ্যোগ নিলেন দুই বাঙালি। কাজল মুখোপাধ্যায় ও মৌসুমী দত্ত রায়। টেগোর ফেস্টিভ্যালের সময় তাঁরা এই বাড়ির হদিশ পান, আর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মৌসুমী বলেছেন, “আফগানিস্তানের ঘটনার পর সে দিন জার্মান চ্যান্সেলরকে দেখলাম ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ আবৃত্তি করছেন। মনে হল, দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ এখনও কত প্রাসঙ্গিক এই পশ্চিমে। অথচ বাঙালি তাঁর মূল্যায়ন করতে পারে নি এখনও। এমন কি পূর্ব-পশ্চিমের সেই যোগসূত্র এখন ছিন্ন। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে পুরনো সেই যোগসূত্র ফের জুড়তে চাই আমরা। তাই বাড়িটা কিনেছি।”
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেযক