২০২৩ সালে ঢাকায় যখন অমর একুশে বইমেলা চলছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাশে একদিন দেখা গেল অদ্ভুত এক রবীন্দ্রনাথকে। সেই লম্বা জোব্বা, দীর্ঘ চুল আর দাড়ি। ১৯ ফুট লম্বা এই রবীন্দ্রনাথকে তৈরি করা হয়েছে থার্মোকল আর কাগজ দিয়ে। তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্ররা।
এই রবীন্দ্রনাথের হাতে একটা গীতাঞ্জলি, যে বইটির ইংরেজি অনুবাদ তাঁকে এনে দিয়েছিল নোবেল প্রাইজ। গোটা এশিয়ার মধ্যে তিনিই এ পুরস্কারের প্রথম প্রাপক। কিন্তু এ কি! রবি ঠাকুরের হাতের গীতাঞ্জলির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটা পেরেক। রক্ত ঝরছে গীতাঞ্জলি থেকে। হয়তো কিছু বলতেন রবীন্দ্রনাথ, প্রতিবাদ করে বলতেন হয়তো ‘এইসব শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না’। কিন্তু বলতে পারছেন না। কারণ তাঁর মুখ টেপ দিয়ে বন্ধ।
প্রতীকী ছবি নিশ্চয়ই। হ্যাঁ, প্রতীকী ছবি এটা।
প্রতিবাদের প্রতীক। ছবির স্রষ্টারা বলতে চান দেশে বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ করা হচ্ছে। আদর্শ প্রকাশনীর স্টল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ‘নারীর বাড়ি’, ‘তালাভাঙার পালা’, ‘ক্রীড়াবালিকা’, ‘উনিশ বসন্ত’, পাপ বিষয়ক পাপেট শো’, ‘জারজ’, ‘এই সব উড়ে আসা দিন’ প্রভৃতি বই-এর লেখক স্বাধীনচেতা জান্নাতুন নাঈম প্রীতির লেখা ‘জন্ম ও যোনির ইতিহাস’ বইটির বিক্রি ও প্রদর্শনী মেলায় এসে বন্ধ করে দিয়ে গেছে বাংলা অ্যাকাডেমির টাস্ক ফোর্স। ‘ব্যাচেলর’, ‘থার্ড পারশন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ প্রভৃতি ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্রের পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকির ‘শনিবারের বিকেল’ ছবিটিকে তিন বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে সেন্সরের জটিলতায়। গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিকে বলে হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী।
না, পেরেকবিদ্ধ গীতাঞ্জলি হাতে রবীন্দ্রনাথের ছবিকে রাখতে দেন নি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। পরের দিনই ছবিটি সরিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে গোলাম রব্বনি বলেছেন, ‘এই ভাস্কর্য অবৈধ বলে এটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল’। ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শিমুল কুম্ভকার বলেছেন, ‘যেহেতু ভেঙে ফেলা হয়েছিল, সেটা প্রমাণ করে যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাকস্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার বিষয়টি সমর্থন করেন না’।
প্রশাসন তার কাজ করেছে। ছাত্ররা নতুন করে জানিয়ে দিয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথ গুম হয়ে গেছেন’। তার মানে মুক্ত চিন্তার প্রতীককে গুম করতে চায় প্রশাসন। বারবার এই রবীন্দ্রনাথ বলে এসেছেন, ‘জ্ঞান যেথা মুক্ত যেথা গৃহের প্রাচীর…’।
গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে ‘পাকিস্তানী সাহিত্যতত্ত্বে’র প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করার আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীতকে নিষিদ্ধ করতে। নানা অপপ্রচার চালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে। জাতীয় সংগীত হিসেবে বাদ দিতে চেয়েছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’কে। বলেছিলেন নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। হিন্দুসমাজের প্রতিভূ বলে দেগে দিতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু পারেন নি শেষপর্যন্ত।
মৃত্যুর পরেও বাংলাদেশের সংকটের সময় বার বার রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের পাশে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর ‘গোরা’র মতোই; মানবধর্মই তাঁর ধর্ম। আজও আবার বাকস্বাধীনতার আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথকে দরকার সে দেশের তরুণ ও যুবকদের। তাঁদের প্রতিবাদের মুখপাত্র তাই রবীন্দ্রনাথ।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেযক