তুমিই আমাকে করেছ সুদূরের পিয়াসী। সেই ছোট্টবেলায় বাবার কিনে-আনা টেপরেকর্ডারে শুনেছি দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে ‘আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী। সুদূরের ব্যাকুল বাঁশরি কানে এসে পৌঁছেছিল সেই কিশোরবেলাতেই। রৌদ্রমাখানো অলস বেলায় তরুমর্মরে ছায়ার খেলায় নীল আকাশে কার মূর্তি তুমি দেখিয়েছিলে রবীন্দ্রনাথ? আমি উন্মনা হলাম, হলাম উদাসী। প্রাণেমনে সুদুরের পরশ পাবার প্রয়াসী হলাম। অঞ্জনা নদীতীর থেকে শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন থেকে শিলংপাহাড়, কালিম্পং থেকে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে ত্রিপুরা রাজ্য — যেখানেই গিয়েছে ছুটে হৃদয় আমার, তোমাকে পেয়েছে এ মন। স্কুলের খাতায় ভ্রমণ নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই তুমি এসে দাঁড়াতে সামনে, উচ্চারণ করতে, “বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু।” বুঝেছিলাম ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’। মন ছুটেছিল তেপান্তরে। চোখ মেলে ধানের উপরের শিশিরবিন্দুকে দেখাতে শেখালে তুমিই। বাড়ির পাশের আরশিনগরে কত না মনের মানুষ! তোমার সুরের ধারায় ছুঁয়ে ফেললাম তাদেরও।
তোমার মতো আমার মধ্যেও বরাবর ছিল ‘বাহির পথে বিবাগী হিয়া আর ঘরের মধ্যে চিরপ্রবাসী অস্থির এক সত্তা।’ ভ্রমণ ব্যাপারটি তাই তোমার মতো আমার কাছেও ‘ছুটির নিমন্ত্রণ কিংবা দূরের আহ্বান।’ সারাজীবন ধরে বাইরের নিসর্গ, দূরের অজানা দেশ আর অজ্ঞাত সব মানুষের টান এত যে প্রবল হয়েছিল তোমার মনে, তার কারণ ছোটবেলা থেকে তুমি পেয়েছিলে এক সুদৃঢ় অন্দর।
ছিন্নপত্রের পাতায় চোখ রাখলাম যখন তখন বৃহৎ ধরণীর প্রতি আমিও অনুভব করলাম নারীর টান। বুঝতে পারলাম একসময় পৃথিবীর সঙ্গে এক হয়েছিলুম আমিও। তুমিই আমাকে শোনালে “এই পৃথিবীটি আমার অনেক দিনকার এবং অনেক জন্মকার ভালোবাসার লোকের মতো আমার কাছে চিরকালের নতুন। আমাদের দুজনকার মধ্যে একটা খুব গভীর এবং সুদূরব্যাপী চেনাশোনা আছে।”
মস্ত পৃথিবীটা, যে চুপ করে পড়ে রয়েছে, ওটাকে ভালোবেসে ফেললাম আমিও। ওর গাছপালা, নদীমাঠ, কোলাহল, নিস্তব্ধতা,প্রভাত-সন্ধ্যা সমস্তটা সুদ্ধ দুহাতে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করলো আমারও। তুমিই আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে গেলে পদ্মাপারে, রূপনারানের তীরে। তোমার চোখে ধরা পড়েছিল পরিবর্তনশীল কতনা ছবি, যে ছবি তৈরি করেছিল কল্পনার স্রোত মনের ভিতরে। নদীর দুই পাড়ে তত দৃশ্যের মতো নব নব আকাঙ্ক্ষার চিত্র দেখা দিতে থাকে। আমিও দেখি।মনের ভিতর কেমন যেন করে। রূপনারানের কূলে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে উচ্চারণ করে ফেলি তোমার কবিতা —
রূপনারানের কূলে
জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ
স্বপ্ন নয়।
রক্তের অক্ষরে দেখিলাম
আপনার রূপ,
চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
তোমার ‘শেষের কবিতা’ আমাকে পৌঁছে দিলো শিলং পাহাড়ে।
শান্তিনিকেতনের লালমাটি,কোপাই, তোমার আশ্রম কোন্ অমোঘ আকর্ষণে টানে বারবার। সবুজ অরণ্যঘেরা শান্তির নিকেতনে তুমিও তো ছুটে এসেছিলে রবীন্দ্রনাথ! বসন্ত উৎসবের সকালে তোমাকেই খুঁজেছি আমি সেই লালমাটির দেশে। শুষ্ক নগ্ন মরু প্রতিমুহূর্তে লজ্জায় মরে আমাদের চিত্ত মাঝে। সুন্দর শ্যামল রসের আঁচল টেনে দেয় সেই বুকে। তুমি লেখো, “লহো লহো তুলে লহো/ নীরব বীণাখানি/ তোমার নন্দননিকুঞ্জ হতে সুর দেহো তায় আনি/ ওহে সুন্দর হে সুন্দর।” সকলে মিলে একসঙ্গে গেয়ে ওঠি গান “ওহে সুন্দর, মরি মরি,/তোমায় কী দিয়ে বরণ করি/তব ফাল্গুন যেন আসে/আজি মোর পরানের পাশে/দেয় সুধারসধারে-ধারে/মম অঞ্জলি ভরি ভরি।” নৃত্যের তালে তালে নটরাজ ঘুচিয়ে দেন সকল বন্ধন, সুপ্তি ভাঙে, চিত্ত জেগে ওঠে মুক্ত সুরের ছন্দে। এভাবে দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যায় তোমার ‘সুন্দর’ এসে ধরা দেয় আমাদের মনে।পাহাড় কেন ডাকে বারবার।তোমাকেও ডেকেছে সে আপন করে। অপরূপ মংপু আরও অপরূপ হয়ে উঠেছে তোমার জন্য। আকাশে তখন মেঘ। শিশিরবাবু গেয়ে উঠলেন — “আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে”। আমার ছোট্ট মেয়েটি গুনগুন করে গাইল বসন্তের গান — “ওরে গৃহবাসী খোলা দ্বার খোলা লাগল যে দোল…”। এখানে বসেই তুমি লিখেছ, অনেক কবিতা। ‘জন্মদিনে’, ‘সানাই’, ‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাগুলি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে লিখেছ ‘ছেলেবেলা’, ‘বাংলাভাষা পরিচয়’। এঁকেছ অনেক ছবি। মংপুর প্রকৃতি ও মানুষ আকৃষ্ট করেছিল তোমাকে। প্রতিদিন গান-কবিতা শোনাতে তুমি কবিগুরু। এখানে আলাপচারি রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছেন সকলে। তোমার কথায় — “এ তো চমৎকার বাড়ি! …কি সুন্দর এই সামনের ঢালু পাহাড়টি, আকাশের কোলে থেকে সবুজ বন্যা নেমে এসেছে। এই সামনের মাঠটিও তোমার ভাল, আমি মাটির কাছাকাছিই থাকতে চাই, চলচ্ছক্তিও কমে আসছে; মাটির স্পর্শ চোখ দিয়েই তাই মিটিয়ে নিতে হয়। চল তা’হলে তোমার বাড়ির জিওগ্রাফিটা জেনে আসি।… এই কাচের ঘর টি বুঝি আমার লেখবার?) এ তো খুবই ভাল, একেবারে উত্তম বলা যেতে পারে। এ চৌকিতে সকালবেলা বসব আর রোদ্দুর এসে পড়বে কাচের ভেতর দিয়ে। তোমার ওই বৃহৎকার বনস্পতির পাতার ফাঁক দিয়ে শতধারায় ঝরে পড়বে সকাল বেলার আলো, ভোরের সেই রৌদ্রস্নানটি আমার কত সুন্দর হবে।” মংপু থেকে বিদায় নিয়েছিলাম তোমারই কবিতা উচ্চারণ করতে করতে। এই কবিতাটি সম্পর্কে মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছেন — “একদিন তাঁর যে অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ ছিল, আমার জীবনে তা চিরদিন অসীম মাধুর্যয বিস্তার করবে। কিন্তু তিনিও যে হৃদয়ে আমাদের স্থান দিয়েছিলেন, তাঁর ক্লান্ত রোগশয্যা থেকেও মংপুর কথা বারবার স্মরণ করতেন, সেই দুর্লভতম সৌভাগ্য প্রতিদিন অন্তরে লালন করছি।”
“মনে পড়ে শৈলতটে তোমাদের নিভৃত কুটীর
হিমাদ্রি যেখানে তার সমুচ্চ শান্তির
আসনে নিস্তব্ধ নিত্য, তুঙ্গ তার শিখরের সীমা
লঙ্ঘন করিতে চায় দূরতম শূন্যের মহিমা
অরণ্য যেতেছে নেমে উপত্যকা বেয়ে
নিশ্চল সবুজ বন্যা, নিবিড় নৈঃশব্দ্য রাখে ছেয়ে ছায়াপুঞ্জ তার। শৈলশৃঙ্গ অন্তরালে
প্রথম অরুণোদয় ঘোষণার কালে
অন্তরে আনিত স্পন্দ বিশ্ব জীবনের
স্বতস্ফূর্ত চঞ্চলতা।
গূঢ় আনন্দের যত ভাষাহীন বিচিত্র সংকেতে লভিতাম হৃদয়েতে
যে বিস্ময় ধরণীর প্রাণের সূচনায়।
সহসা নাম- না- জানা পাখীদের চকিত পাখায়
চিন্তা মোর যেত ভেসে
শুভ্র হিম রেখাঙ্কিত মহা নিরুদ্দেশে”
তুমিই আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে গেছো কালিম্পং-এর পাহাড়ি নির্জনতায়। গৌরীপুর ভবন তথা চিত্রভানুতে ।তুমি ছিলে চিত্রভানুতে। কালিম্পং-এর সৌন্দর্য তোমার ভাষাতেই খোদিত আছে সেখানে—
আমার আনন্দে আজ
একাকার ধ্বনি আর রঙ
জানে তা কি এ কালিম্পঙ।
প্রথম যেদিন উড়ে গেলাম ত্রিপুরা রাজ্যে, আমাদের বিমান উড়ে গেল মেঘের ভিতর, সেদিন মনে হলো এই তো পাখা পেয়েছি। শরীর কত হালকা হয়ে যাচ্ছে। নিচের সেই চেনা পৃথিবীটাকে উপর থেকে কত সুন্দর দেখাচ্ছে। ছককাটা মাঠ, আঁকাবাঁকা নদী বাংলাদেশকে সাজিয়ে তুলেছে। আমাদের বিমানের জানালা দিয়ে সূর্যাস্তের আলো তখন আমার মেয়ের মুখে পড়েছে। কাঁটাতারের পাশে বিমান ল্যান্ড করল যখন তখন সূর্য ডুবছে বাংলাদেশের শ্যামল মাঠে। তোমার নাটক ‘বিসর্জন’ পড়তে গিয়ে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। গোমতী নদীর দক্ষিণ পাড়ে মহারাজা গোবিন্দ মানিক্যের তৈরি ভুবনেশ্বরী মন্দিরের কথা বারবার মনে পড়ছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল জয়সিংহ-রঘুপতি-অপর্ণার কথা। তাই আলাদা অনুভূতি নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে পৌঁছালাম। ছুটে গেলাম সেই ভুবনেশ্বরী মন্দির দেখতে। মন্দিরের কাছেই অতীতের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ আজও দেখা যায়। ধ্বংসস্তূপের দক্ষিণ দিকে জরাজীর্ণ বিষ্ণুমন্দির, গুণবতী মন্দিরের দেবতাও বিষ্ণু। ভুবনেশ্বরী মন্দির দেখতে দেখতে বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম তোমার নাটকের পাতায়। মন্দির থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে দূরে। একসময় নাকি বলির রক্ত এই পথ দিয়েই বয়ে যেত। ভুবনেশ্বরী মন্দির চত্বরে স্থাপিত হয়েছে তোমার মূর্তি।মাথা নত হল তোমার কাছে।
রাজাভাতখাওয়া থেকে বেশ কিছুটা পথ ট্রেক করে পৌঁছাতে হয় বক্সা দুর্গে। শালগাছের শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নিতে নিতে চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছে যাব বক্সা ফোর্টে। এই পথের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কোথাও কোথাও ভয় লাগতে পারে, ডান পাশে গভীর খাত। কোথাও কোথাও গাছের শিকড় খুব আলগা। একটু সাবধানে চলতেই হবে। ঝরনার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। পথে দেখা হয়ে গেল একদল পাহাড়ি মানুষের সাথে। ভাবলে অবাক হতে হয় পাহাড়ের অত উঁচুতে সবুজ ঘাসের সুন্দর এক মাঠ! মাঠ পেরিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়বে জরাজীর্ণ বক্সা দুর্গ। এক বিরাট ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ। কোনো এক সময় ছিল এখানে ছিল জেলখানা। বিনা বিচারে বন্দী করে রাখার জন্যে পাহাড়ের ওপর দুর্গম এই স্থানকে বেছে নেয় ইংরেজরা। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এখানে মোট বন্দী ছিলেন ৫২৫ জন। এখানে পৌঁছেও জেনেছিলাম রবীন্দ্রনাথ, তোমার জন্মজয়ন্তী পালন করেছিল রাজবন্দীরা। তুমি তখন ছিলে দার্জিলিঙে, সালটা ১৯৩১, তুমি তাঁদের জন্য বার্তা পাঠিয়েছিলে। লিখেছিলে, —
নিশীথেরে লজ্জা দিল অন্ধকারে রবির বন্দন।
পিঞ্জরে বিহঙ্গ বাঁধা, সঙ্গীত না মানিল বন্ধন।
ফোয়ারার রন্ধ্র হোতে
উন্মুখর ঊর্দ্ধস্রোতে
বন্দীবারি উচ্চারিল আলোকের কী অভিনন্দন।
মৃত্তিকার ভিত্তিভেদি অঙ্কুর আকাশে দিল আনি
স্বসমুখ শক্তি বলে গভীর মুক্তির মন্ত্রবাণী।
মহাক্ষণে রুদ্রাণীর
কী বর লভিল বীর,
মৃত্যু দিয়ে বিরচিল অমর্ত্য নরের রাজধানী।
‘অমৃতেব পুত্র মোরা’ কাহারা শুনালো বিশ্বময়।
আত্মবিসর্জন করি আত্মারে কে জানিল অক্ষয়!
ভৈরবের আনন্দেরে
দুঃখেতে জিনিল কেরে,
বন্দীর শৃঙ্খলছন্দে মুক্তের কে দিল পরিচয়।
এ লেখা খোদাই করা আছে, বক্সা দুর্গের বাইরের পাথরের ফলকে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছি সেই অক্ষরগুলোর দিকে।
এভাবেই রবীন্দ্রনাথ তুমি আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তোমার মতো আমারও ‘পথের সঞ্চয় ভরে উঠবে দেশ সংসর্গে ও মানব সন্নিধানে।’
ঋণ : ‘পথিক রবীন্দ্রনাথ : ভ্রমণ ও মাধুকরী’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ, লেখক : সুধীর চক্রবর্তী। দেশ, ২ মে ২০১১