| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী, অবিস্মরণীয় এক নারী : মনোজিৎকুমার দাস

Reporter
মনোজিৎকুমার দাস / ১৮০০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

প্রতিমা দেবী রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ। তিনি তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী। প্রতিমার পিতার নাম শেষেন্দ্রভূষণ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জন্ম ৫ নভেম্বর ১৮৯৩ — মৃত্যু: ৯ জানুয়ারি ১৯৬৯। তিনি একজন লেখিকা, কবি, চিত্রশিল্পী এবং নৃত্যবিশারদ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলির নৃত্যনির্দেশনা ও পরিকল্পনায় তার ভূমিকা স্মরণীয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর বিভিন্ন কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এগুলো সবই হয়েছিল তিনি রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ হবার পর।

অবনীন্দ্রনাথের ও গগনেন্দ্রনাথের বোন বিনয়িনী দেবী প্রতিমার মা। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী একসময় ছোট প্রতিমাকে দেখে তাকে নিজের পুত্রবধূ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মৃণালিনীর অকালমৃত্যুর ফলে তা সম্ভব হয়নি।

তারপর মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রতিমার বিয়ে হয় গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটবোন কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সাথে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে নীলানাথের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পাঁচ বছর পরে নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথের বিলেত থেকে ফিরলে তার সাথে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমার আবার বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

তিনি সমাজ সংস্কারকে অগ্রাহ্য করে প্রতিমা এবং রথীন্দ্রনাথের বিয়ে দেন। এই বিয়ে ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ। ১৯০৫-এ রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়। রবীন্দ্রনাথ তাই সফল হতে পেরেছিলেন ঠাকুরবাড়িতে প্রথমবারের মতো বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠান সফল করতে।

২৭ জানুয়ারি ১৯১০-এ বিয়ে হয় দুজনের। প্রতিমার জীবনের গতিধারাই পাল্টে যায় এই বিয়ের ফলে। লেখাপড়া না-জানা প্রতিমার জন্য মেম-সাহেব-শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত হন মিস বুর্ডেট। তাছাড়া প্রতিমার শিক্ষাদাতা যেমন ছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী, তেমনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। প্রতিমা দেবী তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে নানাবিধ কাজের মধ্যে দিয়ে তাঁর এই শিক্ষাদানকে কাজে লাগিয়ে গিয়েছেন। নিজেকে যোগ্য বলে প্রমাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যেন তাঁর পরশপাথর। মেয়েদের মধ্যে যে স্বাভাবিক সৌন্দর্য চেতনা রয়েছে, তার বহুমুখী বিকাশ আমরা প্রতিমা দেবীর জীবনব্যাপী সাধনা ও জীবনাচরণে লক্ষ্য করি।

বিয়ের পর প্রতিমা দেবী কখনো শান্তিনিকেতন, কখনো শিলাইদহে থোকেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ এবং তার স্বামীর সাথে বিশ্বভারতী এবং শান্তিনিকেতনের নানা কাজে নিজেকে নিয়োগ করেন। তিনি নানারকমের কারুশিল্প প্রবর্তনে এবং রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য পরিকল্পনায় সহযোগিতা করতেন। তিনি একজন ভালো চিত্রশিল্পীও ছিলেন। কবির উৎসাহেই ওরিয়েন্টাল আর্ট সম্পর্কে জানতে প্যারিসে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা। নৃত্য ও নাটকের জগতেও বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পাশাপাশি তাঁর নিজের বাটিক প্রিন্ট তাঁর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। প্রতিমাদেবীর শিল্পীসত্ত্বার প্রভার রয়েছে বিশ্বভারতীতেও।

রবীন্দ্রনাথ কিছুদিন ইতালীয় শিক্ষক গিলহার্ডির কাছে ছবি আঁকা শিখেছিলেন। শান্তিনিকেতনে কখনো শিলাইদহে যেখানেই থেকেছেন, কবির যত্নপরতা ছিল প্রতিমাকে নানাবিষয়ে শিক্ষিত করে তুলতে। মাঝে মাঝে তিনি নিজেও তাঁকে পাঠদান করতেন। প্রতিমা দেবী তাঁর বৈধব্যজীবনে পিতৃগৃহে দেখেছিলেন তাঁর মাসি সুনয়নী দেবীর ছবি আঁকা এবং ডিকশনারি দেখে দেখে ইংরেজি পড়া ও সেতারবাদন। প্রতিমা তাঁর ‘স্মৃতিচিত্র’ গ্রন্থে লিখছেন, ‘মাসি তখন আপনমনে ইংরেজি ডিকশনারি নিয়ে পড়াশোনা করতেন।’

রবীন্দ্রনাথের গৃহে এসে তিনি নিজে যে লেখাপড়ার সুযোগ পেলেন, তাকে পুরোপুরি কাজে লাগালেন। বিয়ের পরপরই ১৯১২-তে রবীন্দ্রনাথ যখন ইংল্যান্ড ও আমেরিকা যান, রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীও সঙ্গী হন তাঁর। বৃহত্তর পৃথিবী একইভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেল প্রতিমার কাছে। এ সময়েও প্রতিমা ইংরেজি শেখা ও পুষ্পসজ্জাবিদ্যা শিখতে মনোযোগী ছিলেন। শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে তিনি ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বহু নাটক অভিনয় করিয়েছেন। কেবলমাত্র মেয়েদের অভিনয়-উপযোগী নাটক লেখার উপরোধ জানান তিনি কবিকে, এবং এইভাবে রচিত হলো ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’। অভিনয় শেখানোর পাশাপাশি অভিনেতাদের সাজগোজ আর মঞ্চসজ্জার দায়িত্বও তিনি নিতেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ তাঁর নৃত্যনাট্যগুলোতে নৃত্যের সুচারু ব্যবহার, নৃত্য প্রয়োগের সম্ভাবনার কথা ভাবেনই নি। প্রতিমা দেবীর অঙ্গনে এইখানে যে তিনিই প্রথম রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যসমূহের নিবিড় নৃত্যমুদ্রা উদ্ভাবন করে পরিবেশন করেন। তার ইচ্ছে ছিল, রবীন্দ্র সংগীতের স্মরলিপির মতো করে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যেরও ‘নৃত্যলিপি’ প্রস্তুত করেন। রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের তিনিই ছিলেন প্রধান উৎসাহী। রবীন্দ্রনাথ নিজেও চিত্রাঙ্গদা বা পরিশোধ নিয়ে নৃত্যনাট্য রচনার পরিকল্পনা করেননি। কিন্তু প্রতিমা দেবী যখন নৃত্যনাট্যের খসড়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যান তখন তিনি এই নতুন শিল্পরূপ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। প্রতিমা দেবী কখনও নাচ শেখেননি এবং নিজে নৃত্যশিল্পী ছিলেন না। তিনি বর্ষামঙ্গলের দু-একটি নাচে রূপ দেওয়ার পর রবীন্দ্রনাথকে পূজারিনী কবিতার নৃত্যনাট্যরূপ লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে মেয়েদের দিয়ে সেটি অভিনয় করাবেন মনস্থ করেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন নটীর পূজা।

প্রতিমা দেবী অনেক পরিশ্রমের মাধ্যমে শান্তিনিকেতনের মেয়েদের দিয়ে সেটি অভিনয় করালেন। শ্রীমতীর ভূমিকায় নৃত্যাভিনয় করেছিলেন নন্দলাল বসুর মেয়ে গৌরী। প্রায় চোদ্দ বছর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিমা রাবীন্দ্রিক গীতিনাট্যের স্থায়ী রূপ তৈরি করলেন চিত্রাঙ্গদায়। এর আগে এসেছিল শাপমোচন। চিত্রাঙ্গদার নাচের বৈশিষ্ট্যগুলি আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল চণ্ডালিকাতে। প্রতিমা অন্তরালে থেকে পোশাক পরিচ্ছদ সাজ প্রভৃতির দিকে নজর রাখতেন। মঞ্চ-সজ্জাতেও তিনি শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন। তিনি শেষের দিকে মঞ্চসজ্জার পরিকল্পনা ছবি এঁকে রাখতেন। তিনি কলাভবনের শিল্পীদের দিয়ে নাচের ভঙ্গি আঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।

রবীন্দ্রনাথ রচিত নাটকগুলির শালীন সৌন্দর্যের দিকে তিনি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তিনি মায়ার খেলা নাটকেরও নতুন রূপ দিয়েছিলেন। গল্পগুচ্ছের ক্ষুধিত পাষাণ ও দালিয়া, কথা ও কাহিনীর সামান্য ক্ষতি প্রভৃতি গল্পগুলিকে ট্যাবলো ধরনের মূকাভিনয় আকারে রূপায়িত করেছিলেন। যে শান্তি নিকেতন, কলকাতা, ঢাকা বা অন্যত্র আমরা মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলো দেখে তার নান্দনিককতায় আপ্লুত হই, তার পেছনে প্রতিমা দেবীর রবীন্দ্রনৃত্যের প্রায়োগিক ভাবনা একান্ত রূপেই প্রশংসা দাবী রাখে। তিনি এ-বিষয়ে বইও লিখেছেন ‘নৃত্য’, নাম দিয়ে। তাছাড়া ১৯২০-তে বিলেতের উইগমোর হলে রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত পাঁচটি নাট্যকবিতার যে অভিনয় হয়েছিল, সেখানকার মঞ্চ-সজ্জার ভার নিয়েছিলেন প্রতিমা। এরপর কবি ফ্রান্সে এলে প্রতিমা দেবীকে আদ্রে কার্পেলেমের কাছে সেরামিক পেইন্টিং, জাভাদেশীয় বাটিক ও ফ্রেসেকা আঁকার পদ্ধতি শেখার ব্যবস্থা করেন। পরে শান্তিনিকেতনের কলা ভবনে তিনি ছাত্রছাত্রীদের এসব শেখাতেন।

এইভাবে নৃত্য পরিকল্পনা, ছবিআঁকা, শান্তিনিকেতনে আগত অতিথিদের সেবা করা, লেখালেখি ও আশ্রম বালক-বালিকাদের যত্ন নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন কাটতে থাকে। এর পাশাপাশি চলে তাঁর লেখালেখি, খুব বেশি যে লিখেছেন তিনি তা নয়, তবে তাঁর হাত দিয়ে সার্থক গল্প-কবিতাও বেরিয়েছে, যা প্রকাশিত হতো সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা ‘প্রবাসী’-তে। শান্তিনিকেতন থেকে প্রকাশিত মেয়েদের ঘরোয়া পত্রিকা ‘শ্রেয়সী’-তে তাঁর করা অনুবাদ বেরোয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের লেখা।প্রতিমা শান্তিনিকেতনে নারীশিক্ষা এবং নারীকল্যাণের দিকেও নজর রাখতেন। তিনি মেয়েদের নিয়ে আলাপিনী সমিতি গঠন করেছিলেন। এই সমিতিতে অভিনয় এবং গান হত। তার ব্যবস্থাপনায় আশ্রম থেকে মেয়েরা গ্রামে গিয়ে গ্রামের অশিক্ষিতা মেয়েদের স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি, শরীরের যত্ন, হাতের কাজ প্রভৃতি বিষয় শেখাতেন।

রবীন্দ্রজীবনের শেষদিকের কথা নিয়ে অনবদ্য বই রয়েছে তাঁর, ‘নির্বাণ’। তাঁর জীবনের একেবারে অন্তিম মুহূর্তের কথা প্রত্যক্ষদর্শীয় জবানিতে সেখানে পাই আমরা। জানা যায়, প্রতিমা কল্পিতদেবী ছদ্মনামে প্রবাসী পত্রিকাতে অনেক কবিতা লিখেছেন। জানা যায়, তাঁর এই ছদ্মনাম ঠিক করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথ কখনো কখনো তার কবিতাগুলিকে সংশোধন করে দিতেন।

রবীন্দ্রজীবনের শেষদিকের কথা নিয়ে অনবদ্য বই রয়েছে তাঁর, ‘নির্বাণ’। প্রতিমা দেবীর রচিত নির্বাণ বইটিতে রবীন্দ্রজীবনের শেষ বছরের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। স্মৃতিচিত্র বইটিতে অবনীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের কথা আছে এছাড়া এতে বাড়ির মেয়েদের কথা এবং উৎসবের কথাও আছে। নৃত্য বইটিতে শান্তিনিকেতনের নৃত্যধারার বিষয়ে লিখেছিলেন। চিত্রলেখা তার রচিত কবিতা এবং কথিকার সংকলন। সঙ্গে দেশে-বিদেশে গেছেন যেমন, ঠিক তেমনি দুজনে যখন একে-অপরের থেকে দূরে, কবি চিঠি লিখেছেন তাঁকে। দেড়শোরও ওপরে চিঠি আছে কবির, প্রতিমা দেবীকে লেখা। সে-চিঠির মধ্যে যেমন আছে কবির স্বভাবজাত হাস্যরস, তেমনি রয়েছে সংসারে চলার পথে বার্তা, নির্দেশ। শান্তিনিকেতনে কবি প্রথমবারের মতো বৃক্ষরোপণ উৎসব পালন করেছেন, সে-কথা জানাচ্ছেন পুত্রবধূকে। আশ্রমের কাজে কীভাবে নিয়োজিত হতে হয় মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে, চিঠিতে সেকথাও জানাচ্ছেন, আবার অন্যকে লেখা কবির চিঠি পড়ে জানতে পারি, প্রতিমা দেবী যখন বাইরে কোথাও বেড়াতে যেতেন কিছুদিনের জন্য, কতখানি অসহায় লাগত তাঁর নিজেকে। ১৯৩৫ সালে একটি চিঠিতে কবি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ইন্দিরা দেবীকে লিখছেন, ‘বৌমা চলে গেলে দিনগুলো শ্রীহীন হয়ে পড়ে, ভালো লাগে না। তিনি থাকলেও দেখাশুনা বেশি হয় না, তবু তার প্রভাবটা থাকে হাওয়ায়।’

প্রতিমা দেবী ছিলেন নিঃসন্তান। গুজরাট থেকে বেড়াতে আসা চতুর্ভুজ দামোদরের কন্যাকে দত্তক নেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথের আদরের সেই মেয়েটির নাম ছিল নন্দিনী। কবি তাঁকে পুপে, পুষু ইত্যাদি বিচিত্র নামে ডাকতেন।

১৯৩৯-এ পুপের সাড়ম্বরে বিয়ে হয় বিখ্যাত শিল্পপতি আজতসিং মোরারজি খাপউ-এর সঙ্গে। বিয়েতে সানাই বাজিয়েছিলেন আলী হোসেন। রবীন্দ্রনাথ এ-উপলক্ষে তিনটি গান লেখেন। এ-বিয়ে অবশ্য সুখের হয়নি। বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় ওঁদের। নন্দিনী পরে বিয়ে করেন গুজরাটি দন্ত চিকিৎসক গিরিধারী লালাকে। এ-বিয়ে স্থায়ী হয়েছিল। নন্দিনী-গিরিধারী একই সঙ্গে পড়তেন শান্তিনিকেতনে। বিয়ের পরেও তাঁরা শান্তিনিকেতনেই থাকতেন।

প্রতিমাদেবীর জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, তাঁর ছিল সুনিবিড় এক সৌন্দর্য চেতনা, যা তাঁর সমগ্র কর্মপ্রবাহেরই চালিকাশক্তি ছিল। শৈশবে অবনীন্দ্র নাথদের গৃহের সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিবাহসূত্রে রবীন্দ্র নাথের স্নেহ লাভের সৌভাগ্যকে তিনি পরিপূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের একাকিত্বও প্রতিমাদেবীর সাহচর্যে হতো এবং এর ফলে কবির পরিচর্যা হতে পারত যথাযথ।

রবীন্দ্রনাথ যখন ১৯৩৯-এ কালিম্বয় গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন, দার্জিলিং থেকে বিলেতি ডাক্তার এসে কবিকে দ্রুত অপারেশন করতে চাইলে প্রতিমাদেবী সে হঠকারিতা প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের সঙ্গে রুখে দিয়েছিলেন। ১৯৪১, রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোতে, অপারেশনের পূর্বমুহূর্ত। এমন সময় শান্তিনিকেতন থেকে চিঠি এলো প্রতিমা দেবী শারীরিকভাবে অসুস্থ বলে তিনি কবির সঙ্গে আসতে পারেননি কলকাতায়। এসেছিলেন অপারেশনের পরে।

ডা. বিধান চন্দ্র রায়কে অস্ত্রোপচার খানিকক্ষণের জন্য স্থগিত রাখতে বলে তিনি প্রতিমাদেবীকে চিঠির ডিকটেশন দিলেন, রানী চন্দ লিখে নিলেন তা। অবশেষে কাঁপা হাতে দস্তখত করলেন কবি। জীবনের শেষ চিঠি তাঁর। শিখিয়ে গেলেন কর্তব্যপরায়ণতা। রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী অবিস্মরণীয় নারী হিসাবে চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন।

মনোজিৎকুমার দাস, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev