“যে আত্মবিসর্জন করতে পারে, আত্মার উপর শ্রেষ্ঠ অধিকার শুধু তারই জন্মাতে পারে।” — রবীন্দ্রনাথ, প্রবন্ধ — ‘আত্মা’।
কাদম্বরী মারা যাওয়ার কিছু দিন পর ‘তত্ত্বাবোধিনী’ পত্রিকায় ‘আত্মা’ নামক প্রবন্ধটি লেখেন কবি। ১৮৮৪ সাল। চারপাশের গাছপালা, মাটিজল, চন্দ্রসূর্য, গ্রহতারা সব যেমন ছিল তেমনই। কিন্তু তাদের থেকেও সত্যি হয়ে দেহ-প্রাণ-হৃদয়-মনের হাজার-রকম ছোঁয়ায় যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভুবন জুড়ে, সেই নতুন বৌঠান কাদম্বরী, অভিমানে আফিন খেয়ে মারা গেলেন ঠাকুরবাড়ির এক বিমর্ষ, করুণ ঘরে। এত কাছের এত হাসিখেলার সাথী এক নিমেষে স্বপ্নের মতো মিলিয়েই গেলেন না শুধু, রবীন্দ্রনাথের জন্য রেখে গেলেন নিকষ-কালো এক জীবন অন্ধকার। এই অন্ধকারই তারপর যেন তৈরি করে দিল সর্বকালের সেরা এক কবিকে। কাদম্বরীর না-থাকার অন্ধকারের বেড়া ঠেলে রবীন্দ্রনাথ যেন খুঁজে বেড়ালেন এক আলোর পথ। লিখলেন, “… সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে!”
ছেলেবেলা থেকে ব্রহ্মদর্শনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় করিয়েছিলেন তাঁর বাবা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যক্তিগত অভিঙ্গতা ছাড়াও, এই দর্শনে দীক্ষিত হয়েই জীবন আর মৃত্যু নিয়ে কবির একটা পৃথক ধারণা গড়ে উঠেছিল। জীবনের মধ্য থেকে মৃত্যুকে আর দুঃখকে সহজে বরণ করার কথা তিনি বারবার বলেছেন। উপনিষদ থেকে তাঁর ভাবানুবাদ করা এই শ্লোক যেন তাঁর নিজের মৃত্যু চিন্তারই প্রতিধ্বনি :
“শোনো বিশ্বজন, শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ
দিব্যধামবাসী।
আমি জেনেছি তাঁহারে মহান্ত পুরুষ যিনি
আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়।
তাঁরে জেনে তাঁর পানে চাহি
মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্য পথ নাহি।”
আত্মহত্যাকে যদি ‘আত্মবিসর্জন’ বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে তেমনই একটা ইচ্ছে জীবনে একবার কিন্তু তাড়া করেছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও। মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর গভীর আকাঙ্ক্ষা একবার গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৪। শ্রীনিকেতন থেকে রথীন্দ্রনাথকে একটা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ইউনানি ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা দূর হলেও কিছু মানসিক উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ‘মেটিরিয়া মেডিকা’ পড়ে নিজের সেই সব উপসর্গ চিহ্নিত করলেন রবীন্দ্রনাথ : অবসাদ, মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা, কান্নার তাগিদ, হতাশা, আত্মহত্যার প্রবণতা, আক্রোশ ইত্যাদি। রথীন্দ্রনাথকে লিখলেন, “দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে, মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবেনা। আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ …।” ২৯ জানুয়ারি, ১৯১৫। বন্ধু সিএফঅ্যান্ড্রুজকে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন প্রায় একই কথা : “আই ফিল দ্যাট আই অ্যাম অন দ্যা ব্রিক অফ এ ব্রেকডাউন।” লিখলেন পদ্মার নির্জনতায়, প্রকৃতির কোলে তিনি ছুটি চান। অছচ এর দিন কয়েক বাদেই উধাও সেই গভীর অবসাদের ছায়া। ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫, রথীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ জানালেন, শিলাইদহে এসে তাঁর ক্লান্তি আর দুর্বলতা দূর হয়ে গেছে। লিখলেন, “কিছুকাল থেকে মনে হচ্ছিল মৃত্যু আমাকে তার শেষ বান মেরেছে এবং সংসার থেকে আমার বিদায়ের সময় এসেছে — কিন্তু তস্য ছায়ামৃতং তস্য মৃত্যু — মৃত্যু যাঁর ছায়া, অমৃতও তাঁরি ছায়া। এতদিনে আবার সেই অমৃতেরই পরিচয় পাচ্ছি।”
জীবন বড়ই বৈচিত্রময়। কবির জীবনে আবার দোলাচলের ছোঁয়া। ‘ছিন্নপত্রাবলী’-তে রবীন্দ্রনাথকে বলতে শোনা যায় যে, ব্যক্তি হিসেবে দেখতে গেলে মৃত্যুটা কত উৎকট, যার মধ্যে কোন সান্ত্বনা নেই। কিন্তু “বিশ্বজগতের হিসেবে দেখতে গেলে মৃত্যুটা অতি সুন্দর ও মানবাত্মার সান্ত্বনাস্থল।” অথচ মৃত্যুর সেই প্রশান্ত মুখ তাঁর নিজের সন্তানদের মায়ের মৃত্যুর সময় তিনি দেখতে দেননি। মাধুরীলতা, রথীন্দ্র, রেণুকা, মীরা, শমীন্দ্র — পাঁচ সন্তানের মা মৃণালিনীর শরীর তখন একেবারে ভেঙে গেছে। শান্তিনিকেতন থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে জোড়াসাঁকোয়। ডাক্তারদের সঙ্গে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করছেন রবীন্দ্রনাথ নিজেও। শান্তিনিকেতন থেকে রথী এসে থেকে গেলেন মায়ের সঙ্গে। মীরা আর শমী তখন খুবই ছোট। শমী রইল শান্তিনিকেতনেই। এর পর একদিন, মৃণালিনীর তখন বাকরোধ হয়েছে। রথীন্দ্রনাথকে ডেকে মায়ের বিছানার পাশে বসালেন রবীন্দ্রনাথ। মৃণালিনীর চোখে তখন শুধুই অঝোর জলের ধারা। সেই রাতে রথী আর ছোটোদের পুরনো বাড়ির তেতলায় পাঠিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। কোনও এক অনির্দিষ্ট আশঙ্কায় তাঁদের সারারাত কাটল নির্ঘুমে। পরদিন ২৩ নভেম্বর, ১৯০২। ভোরে রথী গিয়ে দাঁড়ালেন বারান্দায়। তাকালেন লাল বাড়ির দিকে। বাড়িটি তখন অন্ধকারে ঢাকা, নিঃঝুম, সাড়াশব্দহীন। রথী বুঝলেন তাঁদের মা আর নেই, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অনেকেই মনে করেন, ‘আত্মা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যেন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কাদম্বরীর মারা যাওয়া আসলে এক জরুরি ‘আত্মবিসর্জন’। তথাপি অপঘাতে মৃত্যুকে খুব ভয় পেতেই রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৯ সালে কুমার জয়ন্তনাথ রায়কে রবীন্দ্রনাথ আকস্মিক মৃত্যু সম্পর্কে বলেন, “শান্তিপূর্ণ মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র ভয় করিনা। ভয় করি অপঘাত মৃত্যুকে। যদি মৃত্যুর পূর্বে হাসিমুখে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারি, তবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করবো না।” কিন্তু অসম্ভব কষ্ট পেয়ে সংসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে, চেয়েছিলেন নিজের মেয়ের অপঘাতে মৃত্যু। ছোট মেয়ে মীরার সঙ্গে না ভেবে, না বুঝে নগেন্দ্রনাথের বিয়ে দিয়েছিলেন কবি। এরপর দেখতে পেয়েছিলেন নগেনের ‘দুর্দ্দাম বর্ব্বতা’-য় আতঙ্কগ্রস্ত মীরা। পারছেনা তার স্বামীকে ভালবাসতে। এমনই এক শোচনীয় উপলব্ধির মধ্যে রথীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “বিয়ের রাতে মীরা যখন খাবার ঘরে ঢুকছিলেন তখন একটা গোখরো সাপ ফস করে ফনা ধরে উঠেছিল — আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি তখনই ওকে কাটত তাহলে ও পরিত্রাণ পেত।”
রবীন্দ্রনাথের মেজ মেয়ে রেণুকা তখন খুবই অসুস্থ। জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বন্ধু রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মাঝেমধ্যেই খোঁজ নিয়ে যান রেণুকার। তেমনই একদিন, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লম্বা আলাপের শেষে রামেন্দ্রসুন্দর জানতে চাইলেন, রেণুকার শরীর কেমন আছে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, “আজ সকালে সে মারা গিয়েছে।” কবির মুখের দিকে তাকিয়ে স্থীর হয়ে গেলেন রামেন্দ্রসুন্দর। তার পর নিঃশব্দে নেমে এলেন সিঁড়ি বেয়ে। দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথ মারা গেলে মেয়ে মীরাকে একটি চিঠি লেখেন কবি। সেই চিঠিতে ছিল ছোটো ছেলে শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু প্রসঙ্গ। লিখেছিলেন, “যে রাতে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্ত্বার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোকতাপে একটুও পিছপা না টানে। আরও লিখেছিলেন, মৃত্যুর পর সবাই যেখানে যায়, সেখানে মানুষের সেবা পৌঁছয় না, কিন্তু ভালবাসা হয়ত বা পৌঁছায় — “নাইলে ভালবাসা এখনো টিকে থাকে কেন?” উত্তর আজও অজানা।