১৮৭৮-এ রবীন্দ্রনাথের বিলাতযাত্রা নিয়ে কয়েকটি পরস্পরবিরোধী মত পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন, ‘ভারতী যখন দ্বিতীয় বৎসরে পড়িল মেজদাদা প্রস্তাব করিলেন, আমাকে তিনি বিলাত লইয়া যাইবেন।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘কথা ছিল পড়াশুনা করিব, ব্যারিস্টার হইয়া দেশে ফিরিব।’
সত্যিই কি তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার বাসনা নিয়েই বিলেত গিয়েছিলেন মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে?
নাকি তাঁর মনে মেজদার মত আই সি এস হওয়ার সুপ্ত বাসনা ছিল?
রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল তাঁর রবিজীবনী বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়তে (২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯) শোভন বসুর প্রবন্ধ, ‘রবীন্দ্রনাথ আই সি এস হতে চেয়েছিলেন?’ এবং ওই বছরই ৯ মার্চ অমৃত সাপ্তাহিকী পত্রিকায় মুদৃলকান্তি বসুর ‘রবীন্দ্রনাথ সিভিলিয়ান হতে চেয়েছিলেন’ প্রবন্ধে লেখকদ্বয় প্রামাণ্য নথি দিয়ে দেখিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার নয়, আই সি এস হওয়ার জন্যেই বিলেত গিয়েছিলেন। আই সি এসের প্রবেশিকা পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত দিয়েছিলেন কিনা, বা দিলেও অকৃতকার্য হয়েছিলেন কিনা তা জানা যায় না।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্টেট আর্কাইভে রক্ষিত একটি ফাইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাওয়া গেছে। সেটা থেকেই তাঁদের এই ধারণা হয়।
চিঠিটি তুলে দিলাম এখানে —
To Sir,
The Secretary to the Government of Bengal.
As I intend to proceed to England for the purpose of competing at the Indian Civil Service Examination I beg to request the favour of your granting me a certificate of my age as required by the Rules. I beg to submit my Horoscope in evidence of my age and to express my readiness to appear at the time & place which you may be pleased to appoint to prove the same.
Calcutta
The [12)th March, 1878.
I have the honor to be Sir,
Your obedient servant,
[Rabi]ndranath Tagore
এই চিঠির সঙ্গে জানকীনাথ ঘোষালের দুটি চিঠিও ছিল সরকারী আধিকারিক রাজেন্দ্রনাথ মিত্র ও জনৈক Mr Stapleton এর উদ্দেশে। যাতে রবীন্দ্রনাথ বয়সের সার্টিফিকেট পান, তার তদারকি করতেই এই চিঠি। সঙ্গে ছিল রবীন্দ্রনাথের হরোস্কোপ বা ঠিকুজিকোষ্ঠী। পরে হরোস্কোপটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জামাইবাবু, দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী। তিনি রাজা উপাধি পেয়েছিলেন। জাতীয় কংগ্রেসের আদিযুগের নেতা ছিলেন। তাঁর খুব প্রতিপত্তি ছিল ইংরেজ প্রশাসনের উপর মহলে। পরে তাঁর ছেলে জ্যোৎস্নানাথ ঘোষালও আই সি এস হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠির সঙ্গে আরও কয়েকটি নথি ছিল।
সেগুলি পরবর্তীকালে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত স্নাতক না হলে আই সি এস পরীক্ষায় বসা যায় না। রবীন্দ্রনাথ সেন্ট জেভিয়ার্সে ক্লাস নাইনে ওঠার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। ১৮৭৫-এ তাঁর স্কুলশিক্ষা শেষ হয়। তাহলে ১৮৭৮-এ তিনি আই সি এস -এর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসার জন্যে সরকারি প্রশাসনের কাছে বয়সের শংসাপত্র চেয়ে আবেদন করেন কীভাবে? তিনি কী তাহলে ১৮৭৫ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে কোনও কলেজে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন? এফএ-বিএ করার জন্যে?
বিভিন্ন জায়গায় পড়েছি, তিনি নাকি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন একদিনের জন্যে। তিনি কি তাহলে অভিভাবকদের পীড়াপীড়ি ও তদ্বিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলেন? কিন্তু একদিন গিয়ে আর যাননি কলেজে? এই প্রেসিডেন্সি-ছাপ্পার জোরে স্পেশাল কোটায় তিনি আই সি এস পরীক্ষায় বসার আবেদন করেন? বয়সের সার্টিফিকেটের জন্যে চিঠি লেখেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে?
প্রসঙ্গত জানাই, তিনি ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে বয়সের শংসাপত্র পেয়েছিলেন ১৮৭৮এর ২০ মার্চ। তবে কলকাতা থেকে আমেদাবাদে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের কাছে (রবীন্দ্রনাথের তখন সেখানেই) সেই চিঠি পৌঁছতে চার-পাঁচ মাস সময় লাগে।
এখানেই টানাপড়েনের একটা আঁচ পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজ কর্তৃপক্ষ হয়ত তাঁকে ডিগ্রি দিতে রাজি হননি কোনওমতেই। রবীন্দ্রনাথও অন্যায় সুবিধা নিতে চাননি। অভিভাবকদের চাপেই হয়ত তিনি বয়সের সার্টিফিকেট পাওয়ার চিঠিটি লিখেছিলেন।
আসলে তিনি ১৮৭৮-এ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিতেই লন্ডন গিয়েছিলেন মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে। সেখানে তখন সম্পর্কিত দাদা জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাড়িতে রয়েছেন মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ভাইঝি ইন্দিরাকে নিয়ে।
মনে হয় রবীন্দ্রনাথ আই সি এস এর প্রবেশিকা পরীক্ষা দেননি। কিংবা দিলেও অকৃতকার্য হন। পরে ব্রাইটন প্রোপায়েটরি স্কুলেও ভর্তি হন। সেটাও ছেড়ে দিয়ে তিনি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন ব্যারিষ্টার হওয়ার আশায়। তবে সেখানেও সাফল্য অধরা ছিল। আইন পরীক্ষায় পাস না করেই ১৮৮০-তে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। সাঙ্গ হয় তাঁর আই সি এস ও ব্যারিস্টার হওয়ার অভিযান।
অভিভাবকদের চরম অবিমৃশ্যকারিতার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।