রবীন্দ্রনাথ যেখানে গিয়েছেন, সেখানকার নূতন যা কিছু ভালো দেখেছেন, তার প্রয়োগ নিজের দেশে বা তাঁর শিক্ষাশ্রমে করতে চেয়েছেন। সে বাইরের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি হোক বা কৃষিব্যবস্থা।
শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার সময় নিজে উদ্যোগী হয়েছিলেন কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন বা নতুন কিছু করার জন্য। সাধারণ কৃষকদের কাছে চিরাচরিত চাষ পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় আছে, কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। তাদের কাছে মুখে বক্তৃতা দিলে তা বাস্তবায়িত হবে না, এইজন্যে রবীন্দ্রনাথ নিজে উদ্যোগী হয়েছিলেন। একবার তখন বর্ষাকাল আসন্ন, এ সময় নতুন শাক সবজির চাষের সময় নয়, সেই জন্য তিনি শীতের শুরু পর্যন্ত অপেক্ষা করে রইলেন। এই সময় বর্ষাকালের উপযোগী বেগুন চাল কুমড়া কাকরোল প্রভৃতি কাঁচা তরকারির ও নোটে শাক প্রভৃতির বীজ বপন করলেন এবং যাতে কৃষি কাজে যথাসম্ভব সঠিক সময় দেওয়া যায়, তার জন্য তিনি মালি ও কিছু মজুর নিয়োগ করেন।
রবীন্দ্রনাথ শীতের শুরুতেই নৈনিতাল আলুর চাষ করবেন বলে মনস্থির করলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন পশ্চিম দেশে গিয়েছিলেন তখন তিনি এই আলুর চাষ দেখেছিলেন। এতদিন অপেক্ষার পর তাঁর স্বপ্ন বুঝি বাস্তবায়িত হল। কিন্তু এই আলুর চাষের নানা নিয়ম তিনি জানতেন না, তার জন্য তিনি তাঁর বন্ধু-কবি দ্বিজেন্দ্রলালের শরণাপন্ন হন। দ্বিজেন্দ্রলাল তখন ভারতের এগ্রিকালচার বিভাগের অন্যতম সহকারি ডিরেক্টর, কবির অনুরোধে তখন তিনি শিলাইদহে উপস্থিত হন। দ্বিজেন্দ্রলাল, কবিকে এই আলুচাষ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
আলুর জমি কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, কতবার লাঙ্গল দিতে হয়, কেমন ভাবে মই দিয়ে মাটি সমান করতে হয়, প্রতি বিঘা জমিতে কি পরিমান সার দিতে হয়, সারের মধ্যে গোবর পচার পরিমাণ কীরকম বা রেড়ি খোলের পরিমাণ কত, সার কীভাবে প্রস্তুত করা জমিতে ছড়িয়ে দিতে হয় ইত্যাদি। এছাড়া আলুর বীজ কেমন ভাবে ও কয়টি করে কাটতে হয়, কত হাত অন্তর কেমন শ্রেণীবদ্ধভাবে বীজ বপন করতে হয়, গাছে প্রথম পাতা হওয়ার পরে গাছের গোড়ায় মাটি দিতে হয় কেমন ভাবে, কীভাবে আল বাঁধতে হয়, গাছে জল দেওয়ার নিয়ম কী, আলুর গাছ পাকলে কীভাবে মাটির নিচের আলু সংগ্রহ করতে হয়, বীজ আলু কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয় ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কৃষি বিভাগের ডিরেক্টর দ্বিজেন্দ্রলাল, রবীন্দ্রনাথকে বুঝিয়ে দেন।

সুরুল খামারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাল চালানো (১৯২৯)।
রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কৃষকদের আলু চাষের বিষয়ে কী জ্ঞান উপলব্ধ হলো, তা কয়েকটি প্রশ্নের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করতেন। যে আলু চাষ শুরু হলো তা যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তার নজরদারি ও পরীক্ষা করার জন্য কলকাতা এগ্রিকালচার অফিস থেকে ইন্সপেক্টর নিয়ে আসতেন। আলুর চাষ সঠিকভাবে করার জন্য কবির চেষ্টা স্মরণীয়, যদিও এই ব্যয়বহুল আলু-চাষ ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ জলের অভাব। যে পরিমাণ জল ব্যবহার করা হয়েছিল তার দ্বিগুণ জলের প্রয়োজন ছিল।
রবীন্দ্রনাথের এই আলুচাষের উল্লেখ রয়েছে ‘Land Records and Agriculture “অফিস থেকে প্রকাশিত ১৮৯৯ সালের বাৎসরিক রিপোর্টে। নির্বাচিত কিছু অংশ উল্লেখ করছি — ‘Experiments with Nainital potatoes were made by Mr. Rabindranath Tagore in the Tagore Estate at shelidah in the Kustea Sub Division. The crop was not satisfacterilly owing to the defective cultivation. One of Mr.Tagore’s continents however working under more favourable circumstances obtained a bumper crop from a portion of the save seed… These experiments together with others introduced by Mr. Tagore on his farm.’
রবীন্দ্রনাথ এই আলুর বীজ আনতেন, কলকাতা এগ্রিকালচার অফিস থেকে। এই বীজ তিনি প্রজাদের মধ্যে বিতরণ করতেন এবং তাদের আলু-চাষ নিয়ে উপদেশ দিতেন। আলু ছাড়াও কবি বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, বিট, গাজর, সিম, লাল আলু, পাটনাই মটর, বরবটি, শাকআলু প্রভৃতির চাষও করেছিলেন।
আগাগোড়াই রবীন্দ্রনাথের দেশীয় পদ্ধতিতে চাষের ব্যাপারে উৎসাহ ছিল, সঙ্গে পল্লীর উন্নয়ন। বৃক্ষরোপন উৎসব, হলকর্ষণ উৎসব কবির ভাবনার প্রতিফলন, তিনিই লিখেছেন — “ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল মাটির টানে”।
দুই কবির আন্তরিক মিল আমরা দেখেছি, যদিও এই সম্পর্ক পরবর্তীতে মনান্তরে পর্যবসিত হয়।