কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে (১৯৩৭ সাল) সমাবর্তন-উৎসবে ভাষণ দিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর ২৮তম খণ্ডে ‘ছাত্রসম্ভাষণ’ শীর্ষক সেই রচনায় পাই, “তার পর কিশোরবয়সে অভিভাবকদের নির্দেশমত একদিন সসংকোচে আমি প্রবেশ করেছিলুম বহিরঙ্গছাত্ররূপে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথমবার্ষিক শ্রেণীতে। সেই এক দিন আর দ্বিতীয় দিনে পৌঁছল না। আকারে প্রকারে সমস্ত ক্লাসের সঙ্গে আমার এমন কিছু ছন্দের ব্যত্যয় ছিল যাতে আমাকে দেখবামাত্র পরিহাস উঠিল উচ্ছ্বসিত হয়ে। বুঝলুম মণ্ডলীর বাহির থেকে অসামঞ্জস্য নিয়ে এসেছি। পরের দিন থেকেই অনধিকার প্রবেশের দুঃসাহসিকতা থেকে বিরত হয়েছিলেম এবং আর যে কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হয়ে অধিকারীবর্গের এক পাশে স্থান পাব এমন দুরাশা আমার মনে ছিল না।”
এই বিষয়টির উল্লেখ কিন্তু প্রশান্তকুমার পাল বিরচিত ‘রবিজীবনী’ বা প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্র-জীবনী’-তে উল্লিখিত হয়নি। কিশোরবয়স বলেছেন কবিগুরু। তবে ঠিক কোন বয়সে তিনি প্রেসিডেন্সির চৌকাঠ ডিঙিয়েছিলেন, বলেননি।
বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর সপ্তম খণ্ডে বশীকরণ নামক ব্যঙ্গকৌতুকে কবিগুরু অন্নদা নামক চরিত্রের মুখে বসিয়েছেন, “যদি বুঝতেম, তবে শ্রদ্ধা করতেম। তুমি আশু ফিজিক্যাল সায়ান্সে এম এ দিয়ে এলে… তুমি যে এত ঘন ঘন টিকিনাড়া বরদাস্ত করছ, এ যদি দেখতে পায়, তবে প্রেসিডেন্সি কলেজের চুনকাম-করা দেওয়ালগুলো বিনিখরচে লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে।…”
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ মন থেকে অভ্রভেদী গজদন্তমিনারসর্বস্ব শিক্ষাঙ্গন সম্বন্ধে বিরাগ ও বিতৃষ্ণা কোনওদিনও মোছেনি। তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন, এই প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছেন।
দ্বিতীয়বারের জন্যে জাপানযাত্রার আগে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রদের সামনে কবিগুরু একবার ভাষণ দিয়েছিলেন ১৩৩১ বঙ্গাব্দে (১৯২৪ সাল)। তখন এই বিষটির উল্লেখ করেছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে তিনি যে প্রেসিডেন্সিতে একদিনের জন্যেই ছাত্র হয়েছিলেন (এক্সটারন্যাল) এটা নিয়ে তাঁর মনে কিছুটা শ্লাঘাও ছিল।
রবীন্দ্রনাথ কি করে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হলেন তা কেউ লিখে যাননি। অনুমান করা যায়, সেন্ট জেভিয়ার্সের ফাদারের কাছ থেকে বিশেষ চিঠি নিয়ে তাঁর ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার রেজাল্ট না থাকা সত্ত্বেও পাস দেখিয়ে অভিভাবকরা তাঁকে প্রেসিডেন্সিতে এফএ ক্লাসে ভর্তি করেন। ‘বহিরঙ্গছাত্ররূপে’ রবীন্দ্রনাথ একদিন ক্লাস করে আর কলেজমুখো হননি। তিনি হয়তো কারও দয়ায় ডিগ্রি লাভ করতে চাননি। আর ব্রাহ্মদের তখনকার নব্যহিন্দু ছাত্ররা বিদ্রুপ করত ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে। ব্রাহ্ম হলে তাকে ব্রহ্মদৈত্য বলে বিদ্রুপ করার চল ছিল ছাত্রমহলে। এটাও তাঁর কলেজে ছাড়ার কারণ হতে পারে। কোন তারিখে তিনি প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয়েছিলেন, কোনও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞই সেটা লিখে যাননি। তবে ১৮৭৭-এর জানুয়ারির কোনও তারিখে হতে পারে সেটা।
কবিগুরুর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতের প্রথম আইসিএস। সিন্ধুপ্রদেশে হায়দ্রাবাদের অন্তর্গত শিকারপুরে ডিস্ট্রিক্ট ও সেসন জাজ (অস্থায়ী) হিসেবে পোস্টেড থাকার সময় ১৮৭৭-এর জানুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে তিনি কলকাতায় আসেন। ফার্লো (Furlough) ছুটি নিয়ে সপরিবারে ইংল্যান্ড যাওয়ার আয়োজন করাই হয়তো তাঁর কলকাতায় আসার অন্যতম কারণ ছিল। পরের বছর তিনিই তো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আগেই যাওয়া স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী ও সন্তানদের কাছে উঠবেন লন্ডনের কেনসিংটনে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাসায়।
সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতায় খুব ব্যস্ত ছিলেন কয়েকমাস। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মাঘোৎসবে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও ৩রা ফেব্রুয়ারি তিনি হিন্দুস্কুল থিয়েটারে ‘বঙ্গভাষা-সমালোচনীসভার দ্বিতীয় বৎসরের ত্রিশতম অধিবেশনে কেশবচন্দ্র সেনের সভাপতিত্বে ‘বঙ্গদেশ ও বোম্বাই’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। হিন্দুস্কুল চত্বরে ভাষণ দেবেন আর লাগোয়া বাড়ি প্রেসিডেন্সি কলেজ, যেটা কিনা তাঁর আলমা মাটার (অগ্র-মাতা), সেখানে তিনি যাবেন না, সেটা কী করে হয়!
বলা যায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তাঁর প্রতিভাবান তথা স্কুলছুট ছোটভাইটিকে নিয়ে বিস্তর ঘোরাঘুরি করেন বিভিন্ন জায়গায়। প্রেসিডেন্সী কলেজের সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনিই সম্ভবত প্রেসিডেন্সীর অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনির কাছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গিয়ে তাঁকে এফ.এ ক্লাসে ভর্তি করে দেন। যদিও এক্সটারনাল ক্যান্ডিডেট হিসেবে।
রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখে গেছেন তাঁর প্রেসিডেন্সি কলেজে একদিনের জন্যে ক্লাস করার কথা। কোনও সাপোর্টিভ ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি। তাঁর কথাই তাই বেদবাক্য হিসেবে ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। বেদবাক্য না আর্ষবাক্য, তা ভেবে লাভ নেই।