| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রবীন্দ্রনাথের প্রেসিডেন্সি যোগ : অসিত দাস

Reporter
অসিত দাস / ৬৭৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

রবীন্দ্রনাথ যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হতে প্রয়াসী হন, তখন সেখানকার অধ্যক্ষ ছিলেন চার্লস হেনরি টনি। ইনি কিন্তু নীরস কাঠখোট্টা অ্যাকাডেমিসিয়ান ছিলেন না, তাঁর সাহিত্যকৃতি ছিল বিপুল। সংস্কৃত ধ্রুপদী সাহিত্যকে তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের বেতালপঞ্চবিংশতি যে বই থেকে নেওয়া, সেই কথাসরিৎসাগরের ইংরেজি অনুবাদ তাঁর জীবনের সেরা কৃতিত্ব। সংস্কৃত শেখার জন্যে তাঁকে বঙ্গীয় পণ্ডিতকুলের সাহায্য নিতে হয়। তাই তিনি জোড়াসাঁকো ও পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে বিশেষ পরিচিত ছিলেন। বিশেষত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ভালোরকম জানাশোনা ছিল। কারণ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই দুই কৃতী সন্তানই প্রেসিডেন্সির ছাত্র ছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও প্রেসিডেন্সিতে পড়েছিলেন। কথাসরিৎসাগরের অনুবাদ ছাত্রমহলেও বেশ জনপ্রিয় ছিল। চার্লস হেনরি টনির সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সখ্য যেমন অন্তরঙ্গ ছিল, তাতে তাঁকে ধরে ননম্যাট্রিক রবীন্দ্রনাথকে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি করাটা সহজেই ঘটেছিল। তার পরে রবীন্দ্রনাথ ননকলেজিয়েট হবেন কিনা সেটা অন্য ব্যাপার। মোদ্দা কথা আই সি এস পরীক্ষায় বসার জন্যে প্রয়োজনীয় বয়সের শংসাপত্র পেতে প্রেসিডেন্সির ছাপ্পা দরকার ছিল রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর অভিভাবকদের। চার্লস হেনরি টনির কথাসরিৎসাগর একটি মাইলস্টোন। কথাসরিৎসাগরের অনুবাদ নিয়ে চার্লস হেনরি টনির কর্মকাণ্ডের কথা একটু সবিস্তারে বলা যাক-

কথাসরিৎসাগর বিশ্বের দরবারে দেখা দেয় উনবিংশ শতকে। অবশ্যই প্রাচ্যবিদ পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের চেষ্টায়। ১৮২৪ সালে সুবিখ্যাত উইলসন (Horace Hayman Wilson) প্রথম পাঁচটি লম্বকের সারাংশ ইংরেজিতে প্রকাশ করেন ওরিয়েন্টাল কোয়ার্টার্লি ম্যাগাজিনে। সেই হল সূচনা। এরপর আদ্যোপান্ত সংস্কৃত পাঠের সংকলনে প্রয়াসী হলেন জর্মন অধ্যাপক ব্রকহাউস (Hermann Brockhaus)। ছ’টি হস্তলিখিত পুঁথির ওপর নির্ভর করে তাঁর কাজ এগোল। তাঁর সম্পাদনায় মূল পাঠ প্রকাশিত হল লাইপৎসিগ থেকে দু’দফায়, ১৮৩৯-এ প্রথম পাঁচ লম্বক, ১৮৬২-তে বাকি তেরোটি। Kathā Sarit Sāgara, Die Mӓrchensammlung des Somadeva Bhatta aus Kaschmir নামক এই সংকলনে সংস্কৃত শ্লোকসমূহের শেষে থাকল জার্মান গদ্যে তার সারানুবাদ। এখানে লক্ষণীয় যে সোমদেবের কাব্য প্রথম থেকেই গৃহীত হল Mӓrchen অর্থাৎ রূপকথা বা লোকসাহিত্যের শ্রেণিতে, ‘এপিক’-এর পঙ্ক্তিতে নয়।

ব্রকহাউসের নির্মিত পাঠের পরে ভারতবর্ষে পণ্ডিত দুর্গাপ্রসাদ আরেকটি সংশোধিত পাঠ সম্পাদনায় হাত দেন। তাঁর ভিত্তি ছিল ব্রকহাউসের পাঠ ও বোম্বাইয়ে আবিষ্কৃত দু’টি পুঁথি। ‘গ্রন্থকর্তুঃ প্রশস্তিঃ’ নামক পরিশিষ্টটি এই সময় যোগ হয়। ১৮৮৯ সালে দুর্গাপ্রসাদের সম্পাদিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় বোম্বাইয়ের (অধুনা মুম্বই) নির্ণয়সাগর প্রেস থেকে। ব্রকহাউসের কথাসরিৎসাগর ছাপা হয়েছিল প্রথম খণ্ড দেবনাগরী ও পরের খণ্ড রোমান হরফে; দুর্গাপ্রসাদ ব্যবহার করলেন সম্পূর্ণ দেবনাগরী লিপি।

এই দু’টি সংস্কৃত সংস্করণ বর্তমান কাল পর্যন্ত কথাসরিৎসাগরের প্রধান ভিত্তি। কালের বিচারে দুর্গাপ্রসাদের পাঠই অধিকতর শুদ্ধ ও প্রামাণিক বলে গণ্য হয়েছে।

কিন্তু দুর্গাপ্রসাদের সংস্করণ প্রকাশের আগেই কথাসরিৎসাগর পৌঁছে গিয়েছিল অনুবাদ-সাহিত্যের অঙ্গনে। সে কাজে আত্মনিয়োগ করেন চার্লস হেনরি টনি (Tawney)। শ্রী টনি (১৮৩৭–১৯২২) বিশিষ্ট বিদ্বান হলেও ঠিক প্রাচ্যবিদ হিসেবে জীবন শুরু করেন নি। গ্রীক ল্যাটিন ও ইংরেজি সাহিত্যে তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। ১৮৬৫-তে কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক রূপে তাঁর ভারতবর্ষে আগমন। ১৮৭৫-এ তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষের কাজ করেন। ১৮৭৬-৯২ মোটামুটি একটানা, ছোটো ছোটো দু’এক দফা বাদে, তিনি অধ্যক্ষ পদে ছিলেন। ভারতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই টনি সংস্কৃতভাষায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠায় সংস্কৃত আয়ত্ত করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশনা দু’টি বিখ্যাত নাটকের ইংরেজি গদ্যানুবাদ, ভবভূতির উত্তর-রামচরিত এবং কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্র, যথাক্রমে ১৮৭৪ ও ১৮৭৫ সালে। ১৮৭৭-এ ইংরেজি পদ্যে তিনি অনুবাদ করেন Two Centuries of Bhartrihari. পরবর্তীকালে স্বদেশে ফিরে গিয়ে টনি জৈনধর্মবিষয়ক সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। জৈন গ্রন্থ ‘কথাকোষ’-এর টনি-কৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৯৫-এ, আর ‘প্রবন্ধচিন্তামণি’-র অনুবাদ মুদ্রিত হয় ১৮৯৯-১৯০১ পর্বে।

চার্লস টনির মহত্তম সাহিত্যকর্ম অবশ্য কথাসরিৎসাগরের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি গদ্যানুবাদ। তিনি ব্যবহার করেছিলেন ব্রকহাউসের সংস্করণ, ও কোলকাতায় প্রাপ্ত কতিপয় সংস্কৃত পুঁথি। সে অনুবাদ The Kathā Sarit Sāgara, or Ocean of the Streams of Story নামে দু’খণ্ডে প্রকাশ হয় ১৮৮০ থেকে ১৮৮৪-র মধ্যে এশিয়্যাটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল-এর Bibliotheca Indica গ্রন্থমালায়। প্রকাশক ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস, কোলকাতা।

ইংরেজি অনুবাদের ব্যাপারে কোনো সহজ পন্থা অবলম্বন করেন নি চার্লস টনি। তাঁর ভর্তৃহরির ভূমিকাতেই ছিল তাঁর অনুবাদ-চিন্তার বলিষ্ঠ অভিব্যক্তি। তিনি বলেছিলেন যথেষ্ট ‘local colouring’ বজায় রাখতে তাঁর কুণ্ঠা নেই, এবং প্রাচ্য সাহিত্যের এমন কোনও পাঠ পরিবেশনে তাঁর অভীপ্সা নেই যা কেবল ‘Englishmen unacquainted with Sanskrit’-এর রসনার উপযুক্ত — ‘… a certain measure of fidelity to the original, even at the risk of making oneself ridiculous, is better than the studied dishonesty which characterises so many translations of Oriental poets’. কথাসরিৎসাগর অনুবাদের সময় তিনি আরও অভিজ্ঞ অনুবাদক, তাই ভাষান্তরের সমস্ত প্রতিবন্ধক ও জটিলতা উত্তরণের ক্লেশ তিনি বহন করেছেন। তাতে যে ক্লিষ্ট হয়ে পড়েছে তাঁর ভাষা এমন নয়, মূলানুগামিতার প্রয়াস-চিহ্নও যত্রতত্র ফুটে ওঠে নি — বরং কী অবলীলায় তিনি ধারণ করেন সংস্কৃতভাষার কোনো সুনিপুণ টান, কিংবা কোনো ঘননিবদ্ধ চিত্রকল্প, তা মূলের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে বিস্ময় জাগায়। তাই, যেখানে ‘কথামুখ’ লম্বকে বাসবদত্তার পাণিগ্রহণ করলেন বৎসরাজ, সেই অনুপম ‘রতিবল্লরীনবোদ্ভিন্নমিব পল্লবমুজ্জ্বলম্’ হাতটির বর্ণনাকে এই ভাষায় নিবেদন করতে পারেন টনি: Then the King of Vatsa received the hand of Vāsavadattā, like a beautiful shoot lately budded on the creeper of love.

ব্রকহাউসের পাঠ বিষয়ে নানা সংশয় ছিল টনির। স্থানে স্থানে অন্য পুঁথির ভিত্তিতে প্রখর অনুমান কাজে লাগিয়ে তিনি যথার্থ অনুবাদের চেষ্টা করেছেন। তাঁর গ্রন্থপ্রকাশের পাঁচ বছর পর যখন দুর্গাপ্রসাদের সংস্করণ ভূমিষ্ঠ হল তখন দেখা গেল টনির অধিকাংশ অনুমান বেশ অভ্রান্ত। এর একটা নমুনা, পুষ্পদন্তের শাপ প্রসঙ্গে ‘অবিনীত’ শব্দটা। পার্বতী ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘মর্ত্যো ভব অবিনীতেতি’ ইত্যাদি; অর্থাৎ, রে অবিনীত (দাস), তুই মর্ত্যজন হয়ে জন্মাবি। ব্রকহাউসে ছিল ‘অতিবিনীত’ শব্দটি। প্রসঙ্গ বুঝে টনি একেবারে বিপরীতার্থক ‘অবিনীত’ শব্দ অনুমান করলেন। পাদটীকায় লিখলেন, For the ativinīta of Brockhaus’ text, I read avinīta.

টনি তাঁর অনুবাদগ্রন্থ অসংখ্য টীকা ও টিপ্পনীতে সমৃদ্ধ করেছেন। একদিকে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য, অন্যদিকে পাশ্চাত্যের ক্ল্যাসিক ও আধুনিক সাহিত্যে তাঁর অধিকার এই টীকাগুলিকে অমূল্য করে তুলেছে। যে প্রসঙ্গেরই কিঞ্চিৎ পরিচয় আবশ্যক, যেমন শিবের অনুচর নন্দী, অথবা মন্দার পর্বত কিংবা কল্পবৃক্ষ, সৃষ্টির আদিতে যে ‘প্রকৃতি’, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সংক্ষিপ্ত পাদটীকা যোগ করেছেন। ভারতীয় সাহিত্যের অনেক ঘটনা যে ন্যগ্রোধ বৃক্ষতলে সংঘটিত হয় তার জন্য তিনি উল্লেখ করেছেন সেই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম। সংস্কৃত বাগ্ধারায় ‘অস্তি’ শব্দ গল্পারম্ভে ‘একদা’-র ভূমিকা গ্রহণ করে, সেকথাও তিনি পাঠকের জন্য ব্যাখ্যা করেছেন। এসবের সঙ্গে নানা জায়গায় তিনি ব্রকহাউসের পাঠকে নিজের অন্তর্দৃষ্টি বলে পরিশোধন করেছেন। এবং আরও মূল্যবান, অনেক প্রসঙ্গসূত্রে তিনি অন্যান্য প্রসিদ্ধ গ্রন্থে সেই বিশেষ ভাবনা বা কাহিনির উৎস অথবা অনুরণন সন্ধান করেছেন। টনির সময়ের পরে প্রাচ্যবিদ্যা বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু প্রাচ্যবিদ্যার তৎকালীন পরিধির মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রচেষ্টা ও সাফল্য রীতিমতো বিস্ময়কর।

চার্লস টনির এই বিরাট কীর্তি সম্বন্ধে আমরা যে আলোচনা করতে পারছি তার ভিত্তি অবশ্য টনির আদি গ্রন্থ নয়। তার ভিতরে একটি অন্য বৃত্তান্ত নিহিত। টনির অনুবাদগ্রন্থের আদি রূপ ক’জন স্বচক্ষে দেখেছেন আজকের দিনে জানা নেই; হয়তো কোলকাতা শহরের কোনো দুর্ভেদ্য ও সাধারণের অগম্য গ্রন্থাগারে সে বইয়ের কোনো কপি থাকতে পারে। টনির জীবদ্দশায় তাঁর কাজ নিশ্চয়ই সমাদর ও মনোযোগ লাভ করেছিল, কিন্তু সেটা সম্ভবত ঘটেছিল প্রাচ্য বিষয়ে কৌতূহলী অথবা পেশাদার বিশেষজ্ঞ ইংরেজ ও অন্যজাতীয় পাশ্চাত্য বিদ্বানদের মধ্যে। একান্ত গোত্রহীন ও নিছক সাহিত্যরসপিপাসু পাঠকের কাছে, এমনকি ইংরেজ পাঠকের কাছেও, কতখানি পৌঁচেছিল এশিয়্যাটিক সোসাইটির প্রকাশিত এ বই কে জানে। কারণ, এ বইকে আগাগোড়া ঢেলে সাজাবার সংকল্প যিনি করলেন প্রথম প্রকাশের চার দশক পরে, সেই N. M. Penzer নিজে আন্তর্জাতিক লোকসাহিত্যে বিশেষজ্ঞ (folklorist) ও প্রাচ্যবিষয়ে অধিকারী হয়েও টনি এবং কথাসরিৎসাগর সম্বন্ধে ছিলেন সম্পূর্ণ অনবহিত।

N. M. Penzer ইংলণ্ডে ফোক-লোর সোসাইটি ও রয়্যাল এশিয়্যাটিক সোসাইটির মেম্বার, ও রয়্যাল অ্যান্থ্রপলজিক্যাল সোসাইটির ফেলো ছিলেন। আরব্য রজনী, বিক্রম ও বেতালের আখ্যান, বাৎস্যায়নের কামসূত্র প্রভৃতি বহু গ্রন্থের অনুবাদক এক বহুবর্ণ চরিত্র রিচার্ড বার্টনের সম্পূর্ণ গ্রন্থপঞ্জী সংকলন করেন পেন্জ়ার। পুঙ্খানুপুঙ্খ টীকা সমন্বিত সেই পঞ্জীর নাম An Annotated Bibliography of Sir Richard Francis Burton. এই গ্রন্থপঞ্জী প্রণয়নের সূত্রে তাঁকে ডুবে যেতে হয় বার্টনের বিপুল গ্রন্থাবলী ও বিপুলতর ব্যক্তিগত কাগজপত্রের রাশীভূত সংগ্রহের ভিতরে; খুঁটিয়ে দেখতে হয় প্রতিটি পুস্তিকা নিবন্ধ ও পত্র, তার অনেক কিছুই বার্টনের লেখা না হলেও তিনি সাগ্রহে সঞ্চয় করে গিয়েছিলেন। এই নিরীক্ষণের মধ্যে একদিন ১৯১৭–১৮ সালে পেন্জ়ার-এর চোখে পড়ে যায় টনির কথাসরিৎসাগরের আদি সংস্করণের একাংশ। আরব্য রজনী তাঁর প্রায় কণ্ঠস্থ, আর সংস্কৃত কথাসাহিত্যে হিতোপদেশ ও তজ্জাত ইউরোপীয় কথামালা Pilpay’s Fables-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয়; দ্রুত চোখ বুলিয়েই পেন্জ়ার বুঝতে পারেন এই নতুন বস্তুটি একেবারে অপরিচিত। অথচ এ যে কোনো মহৎ সাহিত্যরচনার অংশবিশেষ, যার রচনাকাল রচয়িতা এমনকি অনুবাদক সম্বন্ধেও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তাঁর, সেকথাও উপলব্ধি করেন তিনি। এবং সেই সঙ্গে কোনো দুর্জ্ঞেয় অনুভূতির বশে তাঁর মনে হয়, এই অজ্ঞাতপূর্ব ভারতীয় গ্রন্থটি তাঁর নিজের জীবনে এক বিশেষ তাৎপর্যের সূচনা করছে। এরপর বার্টনের গ্রন্থপঞ্জী কিছুকালের জন্য সরিয়ে রেখে তিনি কথাসরিৎসাগর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। আর ক্রমেই মনে হতে থাকে — ‘… as if Burton, with whom I had now become so intimate, was offering me the chance of giving to the public the Indian counterpart of his own great Arabian Nights’.

যাঁরা বিদ্যানুরাগী ও পুস্তক-পাগল তাঁদের অন্বেষণ ও আবিষ্কারের পথে পথে একধরনের নিয়তি কাজ করে, লেখক পেন্জ়ারের জীবনে যেন তা-ই ঘটল। তিনি সংকল্প করলেন তৎকালপরিজ্ঞাত প্রাচ্যবিদ্যা ও লোকসাহিত্যশাস্ত্রের যাবতীয় গবেষণা সম্ভার কাজে লাগিয়ে টনির অনুবাদের এক বৃহৎ সংস্করণ সম্পাদনা করবেন। বৃদ্ধ চার্লস টনির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করলেন ও বিশিষ্ট বিদ্বানদের পরামর্শ প্রার্থনা করলেন। তারপর প্রকাশকের সন্ধানে বিস্তর অভিযান ও ক্রমাগত ব্যর্থতার পরে Mr. Sawyer নামক জনৈক পুস্তকবিক্রেতা তাঁর প্রস্তাবের গুরুত্ব অনুভব করলেন। এই Sawyer-ও নাকি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, বিশ্বের বৃহত্তম এই গল্পসংগ্রহ তাঁর দীর্ঘ পুস্তকবিক্রয়ের জীবনে কেউ কোনোদিন চায় নি, তিনি নিজেও কখনও চোখে দেখেন নি।

The Ocean Of Story, being C. H. Tawney’s translation of Somadeva’s Kathā Sarit Sāgara (or Ocean Of Streams Of Story), now edited with Introduction, fresh Explanatory Notes and Terminal Essay by N. M. Penzer ছিল দশ খণ্ডের সুবিশাল প্রকল্প। ১৯২৪-এ লণ্ডন থেকে Sawyer-এর ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় প্রথম খণ্ড, কেবল গ্রাহকদের জন্য। চার্লস টনি ততদিনে লোকান্তরিত হয়েছেন; তাঁরই স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হল The Ocean Of Story। ১৯২৮-এ বেরোয় দশম ও অন্তিম খণ্ড, যেটি শুধু পরিশিষ্ট ও নির্ঘণ্টের জন্য নির্দিষ্ট। টনির পুস্তক দু’খণ্ড মিলিয়ে ছিল চোদ্দশো পৃষ্ঠার। পেন্জ়ারের বৃহৎ সংস্করণের আয়তন দাঁড়াল প্রায় তিন হাজার আটশো পৃষ্ঠা।

পরবর্তীকালে কথাসরিৎসাগর বিষয়ে যে-কোনো কাজ, গবেষণা অনুবাদ-প্রচেষ্টা অথবা নতুন সন্দর্ভ, তার আকর ও দিশারী হয়ে আছে পেন্‌জার সম্পাদিত এই গ্রন্থাবলী। টনির অনুবাদ মোটামুটি অবিকল রক্ষিত হয়েছিল এই সংস্করণে। যৎসামান্য যে অংশগুলি অনূদিত হয় নি টনির বইয়ে, একমাত্র তারই নতুন অনুবাদ যুক্ত হয়েছিল। (এইসব অংশের কিছু কিছু ভিক্টোরীয় রুচির প্রতিকূল বলে টনি বর্জন করেছিলেন।) আদি রচনার প্রায় অর্ধশতাব্দী বাদে, একটি বিশ্বযুদ্ধ ও ইংরেজ জাতির মনন রুচি ও ভাষার গুরুতর ওলটপালটের পরেও যে অনুবাদের মূল পাঠটি অবিকৃত রইল তা থেকে বোঝা যায় টনির কাজকে একটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না সম্পাদক পেন্জ়ার। এবং এতটাই ছিল টনির অনুবাদের প্রতি তাঁর দরদ যে অনুবাদের ভ্রান্তি সম্বন্ধে স্থলবিশেষে নিঃসংশয় হয়েও তিনি পাঠের কোনো বদল করেন নি, কেবল পাদটীকা দ্বারা সমস্যার নিরসন করেছেন। এর নমুনা, গুণাঢ্যের জন্মবৃত্তান্তে দৈববাণী ধ্বনিত হয়েছিল, এই সন্তানটি একটি গণের অবতার। ‘গণাবতার’-কে ‘গুণাবতার’ ভেবেছিলেন ব্রকহাউস, হয়তো ‘গুণাঢ্য’ নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, আর তার প্রভাবে টনি করেছিলেন ‘an incarnation of virtue’. পেন্‌জার এই ভ্রান্তির মর্মভেদ করে পাদটীকায় যথার্থ অনুবাদটি যোগ করেছেন।

বস্তুতপক্ষে, পেন্জ়ারের প্রয়াসে The Ocean Of Story হয়ে উঠল কথাসরিৎসাগর সংক্রান্ত এক মহাকোষ। টনির যে টীকাগুলির তাৎপর্য তখনও অখণ্ডনীয় এবং যেসব টীকা স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেগুলিতে হস্তক্ষেপ করলেন না পেন্জ়ার। কিন্তু প্রয়োজনবোধে অধিকাংশ টীকার তিনি পুনর্লিখন করলেন, কোনোটা আংশিক কোনোটা সম্পূর্ণ ভাবে। যেগুলির আংশিক পুনর্লিখন হল সেখানে পেন্জ়ার যথাযোগ্য যতিচিহ্নের কৌশলে নির্দেশ করলেন কতটুকু টনির আর কতটুকু তাঁর নিজের সংযোজন।

এহেন চার্লস হেনরি টনির বদান্যতায় যে আই সি এস-এ বসার অভিপ্রায়ে রবীন্দ্রনাথের বিলেতযাত্রা সম্ভব হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিলেতে গিয়ে তিনি আই সি এস হবেন না ব্যারিস্টার হবেন, সেটা রবীন্দ্রনাথের নিজের ব্যাপার। অবশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানবিমুখ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কোনওটাই হওয়া সম্ভবপর হয়নি শেষপর্যন্ত। মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ আর মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে তিনি ১৮৮০তে দেশে ফিরে আসেন। বলা যায় ‘পালিয়ে বাঁচেন’। কথায় আছে, য পলায়তি স জীবতি। রবীন্দ্রনাথের এতদিন জনমানসে বেঁচে থাকা সম্ভবই হত না, যদি না তিনি বিলেত থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দেশে ফিরে আসতেন!

কথাসরিৎসাগর-বিষয়ক ঋণস্বীকার — পরবাস সাহিত্যপত্রিকা

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev