রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রেসিডেন্সী কলেজের একদিনের বন্ধন কী করে সম্ভব হয়েছিল, তা কোথাও লেখা নেই। তিনি কোন সালে প্রেসিডেন্সীতে ভর্তি হন তাও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞরা জানাতে পারেননি। কেন তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে স্কুল ড্রপআউট হয়েও প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হতে গেলেন, সেটাও রহস্যময়।
মনে হয়, তাঁকে আইসিএস পরীক্ষায় বসানোর অভিভাবকীয় প্রচেষ্টার অঙ্গ হিসেবেই প্রেসিডেন্সী কলেজের ছাপ্পা দরকার হয়েছিল।
কবিগুরুর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতের প্রথম আইসিএস। তিনি তখন সিন্ধুপ্রদেশে হায়দ্রাবাদের অন্তর্গত শিকারপুরে ডিস্ট্রিক্ট ও সেসন্স জাজ (অস্থায়ী) হিসেবে পোস্টেড ছিলেন। ১৮৭৭-এর জানুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে তিনি কলকাতায় আসেন। ফার্লো (Furlough) ছুটি নিয়ে সপরিবারে ইংল্যান্ড যাওয়ার আয়োজন করাই হয়তো তাঁর কলকাতায় আসার অন্যতম কারণ ছিল।
সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতায় খুব ব্যস্ত ছিলেন কয়েকমাস। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মাঘোৎসবে ভাষণ দেওয়া ছাড়াও ৩রা ফেব্রুয়ারি তিনি হিন্দু স্কুল থিয়েটারে ‘বঙ্গভাষা-সমালোচনীসভার দ্বিতীয় বৎসরের ত্রিশতম অধিবেশনে কেশবচন্দ্র সেনের সভাপতিত্বে ‘বঙ্গদেশ ও বোম্বাই’ শিরোনামে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারপর সত্যেন্দ্রনাথ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, জানকীনাথ ঘোষাল ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বোলপুর যান।
বলা যায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তাঁর প্রতিভাবান তথা স্কুলছুট ছোটভাইটিকে নিয়ে বিস্তর ঘোরাঘুরি করেন বিভিন্ন জায়গায়। প্রেসিডেন্সী কলেজের সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনিই সম্ভবত প্রেসিডেন্সীর অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনির কাছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গিয়ে তাঁকে এফএ ক্লাসে ভর্তি করে দেন। হিন্দু স্কুলে বক্তৃতা দেওয়ার আগেই সেখানে কয়েকবার যেতে হয়। পাশের প্রেসিডেন্সী কলেজে তাঁর পদার্পণ এই সময়েই ঘটে।
সাহিত্যপ্রেমী অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি নিজেও ছিলেন বিখ্যাত লেখক। টনিসাহেব ১৮৭৫-য়ে ইংরেজি অনুবাদে বার করেন জার্মান সাহেব লোথের লেখা বই। বইটির নাম ‘English people and their language’। টনি ছিলেন একজন বিদগ্ধ শেকসপিয়ার বিশেষজ্ঞ। তবে Richard (III)-র সম্পাদনার কাজ ছাড়া তাঁর শেকসপিয়ার-সত্তার কোনও লিখিত দলিল নেই। এটাই আপসোসের। প্রফুল্লকুমার ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শেকসপিয়ার-বিশেষজ্ঞ ছিলেন বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর কিছু কাজে কি আছে চার্লস হেনরি টনির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ?
টনিসাহেবের ল্যাটিন ও গ্রিক ভাষায় পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। কিন্তু কলকাতায় তাঁর সময়ে এই দুটি ভাষায় বিদ্যাচর্চার সুযোগ ছিল না। তাই তিনি সংস্কৃত ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হন। সংস্কৃত ভাষা শিক্ষায় আত্মনিবেদিত প্রাণ ছিলেন তিনি। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল কর্তৃক প্রকাশিত দুই খণ্ডে কথাসরিৎসাগরের (মূল সোমদেব ভট্টের সংস্কৃত রচনা) ইংরেজি অনুবাদ তাঁর জীবনের সেরা কীর্তি। Ocean of Story বিদগ্ধমহলে সাড়া ফেলেছিল দারুণভাবে। তাঁর প্রথম প্রকাশনা দু’টি বিখ্যাত নাটকের ইংরেজি গদ্যানুবাদ, ভবভূতির উত্তর-রামচরিত এবং কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্র, যথাক্রমে ১৮৭৪ ও ১৮৭৫ সালে। ১৮৭৭-এ ইংরেজি পদ্যে তিনি অনুবাদ করেন Two Centuries of Bhartrihari. পরবর্তীকালে স্বদেশে ফিরে গিয়ে টনি জৈনধর্মবিষয়ক সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। জৈন গ্রন্থ ‘কথাকোষ’-এর টনি-কৃত অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৯৫-এ, আর ‘প্রবন্ধচিন্তামণি’-র অনুবাদ মুদ্রিত হয় ১৮৯৯-১৯০১ পর্বে। রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথের সাহিত্য-অনুরাগ হয়তো টনিসাহেবকে প্রবুদ্ধ করেছিল নোমিনেটেড কোটায় রবীন্দ্রনাথকে প্রেসিডেন্সী কলেজের এফএ ক্লাসে ভর্তি করতে।
এর মধ্যে ১৮৭৭এর পয়লা জানুয়ারি কবিগুরুর পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মহারানি ভিক্টোরিয়ার ভারত-সম্রাজ্ঞী উপাধি-গ্রহণ উপলক্ষে একটি রাজকীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ কয়েকজন সেরা বাঙালির একজন হিসেবে Certificate of Honours গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি চিঠি লেখা হয় ইংরেজ ভাইসরয়ের দপ্তর থেকে। চিঠির বয়ান ছিল-
By command of his excellency the Viceroy and Governor-General this certificate is presented in the name of Her Most Gracious Majesty Victoria, Empress of India, to Baboo Debendra Nath Tagore in recognition of his position as son of the late esteemed Baboo Dwaraka Nath Tagore, Head of the Conservative Brahmoo.
January 1st, 1877
Richard Temple
দেবেন্দ্রনাথের বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল ইংরেজ প্রশাসনের উপরমহলে। দ্বারকানাথকে তিনি দেনার দায়ে ডোবানোর জন্যে যতই নিন্দেমন্দ করুন, তাঁর প্রভাব তিনি অস্বীকার করতে পারেননি।
অর্থাৎ প্রেসিডেন্সীতে ভর্তির পক্ষে সেসময় ‘সুপবন বহিতেছিল’ রবীন্দ্রনাথের জন্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেসিডেন্সী কলেজের একদিনের ছাত্র ছিলেন বলে যাঁরা গর্বে ছাতি চাপড়ান, তাঁরা কিন্তু দিনটার সাল-তারিখ উদ্ধার করতে পারেননি। কেউ কিছু বলার চেষ্টা করলেও উপহাস ও বিদ্রুপে ভরিয়ে দেন তাঁকে। অথচ প্রেসিডেন্সীর প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নাম দেওয়ালে খোদাই করা হয়েছে! কবে, কোনদিন তিনি ছাত্র ছিলেন, সে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নীরব। মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন।