শিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব একটা ধারণা ছিল। তাই তিনি বুঝেছিলেন প্রকৃতির অনাবিল সংস্পর্শের মধ্যে বেড়ে ওঠাই হল শিশু মনের আনন্দ। তাই শান্তিনিকেতনের মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম। শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটানো তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। শিশুর বিকাশ ঘটাতে প্রয়োজন তাকে মুক্ত ভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া। ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন —
“আমাদের দেহ তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া সেই সাড়ে তিন হাত পরিমান গৃহনির্মাণ করিলেই চলে না।স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত ঘটে। শিক্ষা সম্বন্ধেও একই কথা খাটে। যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা আবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না।অত্যাবশ্যকীয় শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না।”
তাই শিশুদের সার্বিক বিকাশের কথা মাথায় রেখেই রবীন্দ্রনাথ তাদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, — “বাংলা ভাষায় রত্ন স্বরূপ এই গ্রন্থ যেন প্রতিভার বেলাভূমিতে সংক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র নিটোল স্বচ্ছ একটি মুক্তো। এর ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে চারিত্র্য, আর সেই সঙ্গে ব্যবহারযোগ্যতা,পরিশীলিত বিরল হওয়ার মধ্যে নিকটতম অন্যচেতনা।মহোত্তম বাণীসিদ্ধির সরলতম উচ্চারণ। কী ছন্দোবদ্ধ ভাষা, কী কান্তি তার, কীরকম চিত্ররূপে মালা গেঁথে চলেছে, অথচ কঠিনভাবে প্রয়োজনের মধ্যে আবদ্ধ থেকে, শিশু মনের গন্ডি কখনও না ভুলে বর্ণশিক্ষার উদ্দেশ্যটিকে অক্ষরে অক্ষরে মিটিয়ে দিয়ে, পদ্য ছন্দের বৈচিত্র্য, মিলের অপূর্বতা, অনুপ্রাসের অনুরণন- সমস্তই এখানে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সমস্তই আঁটোমাপের শাসনের মধ্যে দেখেছেন। কোনখানেই পাত্র ছাপিয়ে উপচে পড়েনি।”
প্রকৃতির কোলে শিশুরা যাতে শিখতে পারে সহজাত পাঠ, যাতে তারা হাতে কলমে কিছু শিখতে পারে অর্থাৎ Activity Based Learning বা কৃত্যালি ভিত্তিক শিখন, কিছু প্রয়োগ করতে পারে তার জন্য রবীন্দ্রনাথ সেচেষ্ট ছিলেন।কারণ আধুনিক শিক্ষার মূল কথাই হচ্ছে অর্জিত জ্ঞানের বোধ ও প্রয়োগ অর্থাৎ Understanding and Applicatio। এজন্য রবীন্দ্রনাথ বলতেন, —

“শিশু যখনই যাহা শিখিবে তখনই তাহা প্রয়োগ করিতে শিখিবে, তাহা হইলে শিক্ষা তাহার উপর চড়িয়া বসিবে না, সে-ই শিক্ষার উপর চড়িয়া বসিবে।” এরকম একটা লক্ষ্য থেকেই বোধ হয় রবীন্দ্রনাথ ‘সহজ পাঠ’ এর পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই এই বই দুটির গল্পগুলি রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন শিশুর চেনা পরিবেশ থেকে, যাতে শিশুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে চেনা পরিবেশের বিষয়গুলিকেই প্রিন্ট হিসাবে পড়তে পারে।
শিশুর যখন ভাষার বিকাশ হয় তখন তার বয়স মোটামুটি এক বছর। কান্না দিয়ে শিশুর যাত্রা শুরু। তারপর ছয় সপ্তাহ কাল সময়ে শিশুরা মুখে কু কু একটা আওয়াজ করে, যাকে বলে কুইং (Cooing)।ছয় মাস বয়সে শিশু স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে আ এবং ব্যঞ্জনধ্বনির ক্ষেত্রে প, দ, ম এই আওয়াজ গুলি করতে থাকে। যেমন — দদা, পা, মমা। একে বলে কলধ্বনি বা Babling। তারপর ৮ মাস বয়সে তার কথার সুর তৈরি হয়। এক থেকে দেড় বছর বয়সে সে এক বা দুই পর্বের শব্দ বলতে শেখে। দু বছর বয়সে সে পদনির্মাণ শিখে যায়। তারপর পাঁচ বছর বয়সে এসে সে সরল বাক্য এবং জটিল বাক্য ব্যবহার করতে পারে, প্রশ্ন করতে শেখে, নিষেধ করলে সেটা বোঝে। এই পর্ব বারবার চলতে থাকে। মোটামুটি এক বছর বয়সে শিশুরা হামাগুড়ি দেয়, পাশাপাশি ভাষার বিকাশ প্রক্রিয়া চলতে থাকে অবাধে। ‘সহজ পাঠ’-এর প্রথম ভাগের প্রথমেই একটি শিশুর হামাগুড়ি দেওয়ার ছবি আছে। এই ছবিটা দেখলেই আনন্দে মন ভরে ওঠে। তার সঙ্গে ওই লেখাটাও —
“ছোটো খোকা বলে অ আ।
শেখেনি সে কথা কওয়া।।”

প্রশ্ন হল যে ছোটো খোকা কথা বলাই শেখেনি, সে কীভাবে অ আ বলবে? আদৌ হামাগুড়ি দেওয়া ছোটো খোকা কি কথা বলা জানে না? এখানেই তো রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিন্তার মধ্যে ফেলে দিলেন। সে কথা হয়তো বলতে পারেনা কিন্তু মুখ দিয়ে নানান রকম আওয়াজ তো করে।নানান রকম অঙ্গভঙ্গি করে মনের ভাব প্রকাশ করে, সে কান্না করে। এই কান্না অথবা মুখের আওয়াজ তো অনেক সময় অ বা আ এর মত শোনায়। তাহলে শিশুর বা রবীন্দ্রনাথ কথিত ছোটো খোকার কথা বলা আর না বলার মধ্যে এমন কিছু এসে যায় না।তার ভাষার বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়টিকেই রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন।
আবার
“হ্রস্ব ই দীর্ঘ ঈ
বসে খায় ক্ষীর খই।”
কিংবা
“হ্রস্ব উ দীর্ঘ ঊ
ডাক ছাড়ে ঘেউ ঘেউ।”
এই চার পঙক্তি লেখার প্রধান উদ্দেশ্য শিশুদের সঠিক উচ্চারণ শেখানো। ‘ই’ বা ‘উ’ এর উচ্চারণ হবে হ্রস্ব বা কম সময় ধরে আর দীর্ঘ ঈ বা দীর্ঘ ঊ এর উচ্চারণ হবে একটু দীর্ঘ বা বেশি সময় ধরে। এই সঠিক উচ্চারণের সচেতন প্রয়াসটিকেও রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছেন। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে লেখার সময় তাদের বানান সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরি হয় সেটাকেও রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য রেখেছেন। কারণ সঠিক উচ্চারণ সঠিক বানান লেখার কাজে সাহায্য করে। তেমনি —
“ডাক পাড়ে ও ঔ
ভাত আনো বড়ো বৌ।”
ছড়াটিতে একান্নবর্তী পরিবারের একটা ছবি তুলে ধরা হয়েছে। ভাত আনতে বলা হয়েছে বড় বৌকে। মেজো, সেজো বা ছোটোকে নয়।একান্নবর্তী পরিবারে শাশুড়ির পর বাড়ির বৌ হিসেবে বড়ো বউয়ের উপর বেশ কিছুটা দায়িত্ব বর্তে। তারই ছবি তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ।
তাছাড়া জেলের ডিঙি চালানোর দৃশ্য, বোঝা মাথায় নিয়ে হাটে চলার দৃশ্য, সারা দিন মাঠে ধান কাটার ছবি, পরিবহন ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গরুর গাড়ি ছিল একটা প্রধান মাধ্যম। গরুর গাড়িতে ধান কেটে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, কিংবা ঘরে বসে এক মনে পড়া করা এসবের মধ্যে দিয়ে বাংলার চিরন্তন ছবি রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুলেছেন।
“রেগে বলে দন্ত্য ন
যাব না তো কক্ষনো।”
আবার
“বলে মূর্ধন্য ণ
চুপ করো কথা শোনো।”
এই পঙক্তি গুলির মধ্যে দিয়ে ‘ন’ এবং ‘ণ’ এর সঠিক উচ্চারণ শেখানো হয়েছে। বাংলা ভাষায় এসে ‘ণ’ তার সঠিক উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। এখন তা ‘ন’ রূপে উচ্চারিত হয়। তাই শিক্ষক মহাশয়ের দায়িত্ব এই দুই প্রকারের ‘ন’ এর উচ্চারণ সঠিকভাবে শেখানো। রবীন্দ্রনাথ খুব সচেতনভাবে বিষয়টিকে ছুঁয়ে গেছেন।
প্রথম ভাগের প্রথম পাঠের বিষয় ‘বন’। ছোটো ছোটো বাক্য সহযোগে শিশুদের বন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে চেয়েছেন তিনি।
“বনে থাকে বাঘ।
গাছে থাকে পাখি।
জলে থাকে মাছ।
ডালে আছে ফল।
আর এই বন শিশুরা তাদের আশেপাশেই দেখেছে,তাদের চেনা পরিবেশগুলিই রবীন্দ্রনাথ তুলে এনেছেন বইয়ের পাতায়। এ যেন অনেকটা জানা থেকে অজানা, মূর্ত (Concrete) থেকে বিমূর্ত (Abstract), সহজ থেকে কঠিন এর দিকে যাত্রা। একেই আধুনিককালে Inductive Method বা আরোহী পদ্ধতি নামে অভিহিত করা হয়। (ক্রমশ)