বর্ণের ধ্বনি সচেতনতা ও উচ্চারণ
গল্পপাঠ শিশুদের কোনো শব্দের সঠিক উচ্চারণ শেখাতেও অনেকটা সাহায্য করে। কোন শব্দের উচ্চারণ কী হবে, সেটা অনেক সময় শিশুরা শিক্ষক বা অভিভাবকের অনুকরণে শেখে। সহজপাঠ পড়লে শব্দের উচ্চারণেও শিশুদের দখল আসবে। এর দায় শিক্ষকও এড়াতে পারেন না। এর জন্য একটা জিনিস দরকার সেটা হল বর্ণের ধ্বনি সচেতনতা বা ফোনোলজিক্যাল অ্যাওয়ারনেস (Phonological Awareness)। যেমন —
“কালো রাতি গেল ঘুচে
আলো তারে দিল মুছে।”
এই পঙক্তি দুটিতে ৮টি পদ আছে। প্রত্যেকটি পদ আমাদের ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করতে হবে। যেমন —
“কা-লো রা-তি গে-ল ঘু-চে,
আ-লো তা-রে দি-ল মু-ছে.।”
এখানে কোন শব্দে কটি ধ্বনি আছে, প্রত্যেক শব্দের প্রথম ধ্বনি কী, শেষ ধ্বনি কী- এগুলো শেখালে ধ্বনি বা আওয়াজ সম্পর্কে তাদের যেমন ধারণা জন্মাবে ঠিক তেমনি ধ্বনি জুড়ে জুড়ে তারা নতুন শব্দও তৈরি করতে পারবে। তাই Phonological Awareness তাদের শব্দের সঠিক উচ্চারণেও সাহায্য করে।
সহজ পাঠ’-এ আরেকটা জিনিস লক্ষণীয়, যেটা হয়তো অনেকেরই অজানা। শব্দের আদিতে ‘এ’ বা ‘এ’ কার অনেক সময় ‘অ্যা’ রূপে উচ্চারিত হয় আমরা জানি। যেমন —
‘এখন’ এর প্রকৃত উচ্চারণ-‘অ্যাখন’, ‘এক’ এর প্রকৃত উচ্চারণ ‘অ্যাক’। আবার ‘বেলা’, ‘মেলা’ এর দু’রকম উচ্চারণ পাওয়া যায়। কখনো তা ‘ব্যালা’ (অ্যা), আবার কখনো ‘বেলা’ (এ)। কিন্তু কখন কীভাবে উচ্চারণ করব বা কোনটা উচ্চারণ করব তা জানার জন্য রবীন্দ্রনাথ এক নতুন পন্থা আবিষ্কার করেছিলেন। সেটাই এখন বলব। আমরা উচ্চারণ করছি ‘ব্যালা’ বা ‘ম্যালা’। কিন্তু এটা তো লিখতে পারছি না, লিখছি সেই ‘বেলা’ বা ‘মেলা’।এ নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেক সময় দ্বিধা তৈরি হয় কোনটা বলব। তার জন্য রবীন্দ্রনাথের কৌশল বের করলেন। তিনি এক ধরনের আঁকড়ি যুক্ত বা মাত্রা যুক্ত ‘এ’ কার, আরেক ধরনের আঁকড়হীন বা মাত্রাহীন ‘এ’ কার এর ব্লক তৈরি করালেন। সমগ্র সহজপাঠ বইটি বিষয়টি লক্ষ্য করলেই বিষয়টি দেখা যাবে।
যে শব্দের আদি ‘এ’ কার ‘অ্যা’ রূপে উচ্চারিত হয়েছে, তা বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ এই আঁকড়ি যুক্ত বা মাত্রাযুক্ত ‘এ’ কার ব্যবহার করেছেন আর যে শব্দের আদি ‘এ’কার এর উচ্চারণ বহাল থেকেছে তা বোঝাতে তিনি আঁকড়িহীন বা মাত্রাহীন ‘এ’ কার এর ব্যবহার করেছেন।

আমরা ‘সহজ পাঠ’ এর প্রথম ভাগের কিছু কিছু উদাহরণ দেখে নিই যেখানে রবীন্দ্রনাথ এই দুই ধরনের ‘এ’ কার ব্যবহার করেছেন। প্রথম ভাগে প্রথম পাঠে ‘খেলা’ (‘এ’ কার বাঁ দিকে বের করা অর্থাৎ আঁকড়ি বা মাত্রাযুক্ত। কিন্তু এখানে দেখানো সম্ভব হল না। এর উচ্চারণ ‘খ্যালা’।
‘খেয়া’-এর আদ্য ‘এ’ কারের উচ্চারণ ‘এ’ বহাল থাকছে।
ঠিক তেমনি ষষ্ঠ পাঠে
‘ঢেলা’-এর প্রকৃত উচ্চারণ ‘ঢ্যালা’ (এ >অ্যা’), আর ‘লেখা’-এর উচ্চারণ ‘লেখা’ (এ >এ)।
এরকম প্রচুর উদাহরণ রয়েছে এই বইতে। ঠিক তেমনি —
“বাটি হাতে এ ঐ
হাঁক দেয় দে দৈ।”
এখানে ‘দেয়’ এর উচ্চারণ ‘দ্যায়’ (অ্যা) আর ‘দে’ এর আদ্য ‘এ’ কারের উচ্চারণ ‘এ’ বহাল থাকছে। এবার পার্থক্যটা নিশ্চয়ই বোঝা গেল।
আবার ‘সহজপাঠ’ দ্বিতীয় ভাগের আরেকটি কবিতা নেওয়া যাক — “জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে গ্রামের মানুষ বেচে কেনে।”
এখানে ‘বেচে’ শব্দটির আদ্য ‘এ’ কারের উচ্চারণ ‘অ্যা’-এর মত অর্থাৎ এর উচ্চারণ ‘ব্যাচে’ (আঁকড়ি বা মাত্রাযুক্ত), আর ‘কেনে’ শব্দটির আদ্য ‘এ’ কার এর উচ্চারণ ‘এ’ এর মত। অর্থাৎ এর উচ্চারণ হবে ‘কেনে’। ‘সহজপাঠ’ এবং অনেক আগে প্রাথমিক স্তরে যে ‘কিশলয়’ বই পড়ানো হতো সেখানেও এই বিষয়টাকে মাথায় রেখে হরফ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক কালের শিশু পাঠ্যগুলিতে এর কোনো বালাই নেই। এতে শিশুরা সঠিক উচ্চারণ করতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাটা কমতে থাকে। ‘সহজ পাঠ’ যেহেতু শিশুপাঠ্য গ্রন্থ এবং যে বইটা সেলফ স্টাডি বা সেল্ফ লার্নিং কে সহায়তা করবে সেক্ষেত্রে এই বিষয়টি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা রবীন্দ্রনাথ ভালোভাবে জানতেন। তার জন্য এই শিশুরা যাতে সঠিক উচ্চারণটা করতে পারে সেদিকে রবীন্দ্রনাথ সচেতন ছিলেন।
এবার আসি আর একটি বিষয়ে আলোচনায়। শব্দের ভেতর ঊর্ধ্বকমা। উর্ধ্বকমা পদের মধ্যবর্তী কোন একটি বর্ণের ওপরে জায়গা দখল করে বসে। এই বিরাম চিহ্নটাকে বলে ‘লোপচিহ্ন’ বা ‘ইলেক’ চিহ্ন। অন্যান্য বিরাম চিহ্নগুলিতে যেমন আমরা কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিই বা থামি, ঊর্ধ্বকমার ক্ষেত্রে কিন্তু কোন বিরতিকাল নেই। তাই এটি একটি ব্যতিক্রমী বিরাম চিহ্নের উদাহরণ। বর্তমানে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে পুরোনো কবি, লেখকদের রচনায় এটির ব্যবহার যথেষ্ট ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা ‘ঊর্ধ্বকমা’ ব্যবহার করি তার সম্পর্কে এবার আমরা জানব —
অসমাপিকা ক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করতে, তেমনি সমাপিকা ক্রিয়া ও সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করতে ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করার চল৷ ছিল। যেমন — তাহাদের > তা’দের, করিয়াছি > ক’রেছি, হইতে > হ’তে
আবার সংখ্যাশব্দকে ও ইংরেজি বা বাংলা সন কে সংক্ষেপে প্রকাশ করতেও আমরা ঊর্ধ্বকমা এখনও ব্যবহার করি। যেমন — দুইশত > দুশ’, দুইটি > দু’টি, ১৯৭১ > ‘৭১, ১৯৪৭> ‘৪৭
অসমাপিকা ক্রিয়ার সঠিক উচ্চারণ কী হবে এ নিয়ে বড়দের মাথাব্যথা না থাকলেও ছোটরা অনেক সময় গুলিয়ে ফেলে এর উচ্চারণ কী হবে।যেমন-
আমি আমি কাজ ‘করে’ বাড়ি যাব।
সে কাজ ‘করে’।
উপরোক্ত দুটি ‘করে’ দু’রকম ক্রিয়ার দৃষ্টান্ত। প্রথমটি অসমাপিকা ক্রিয়া আর দ্বিতীয়টি সমাপিকা ক্রিয়া। কিন্তু দুটোর উচ্চারণ দু’রকম।প্রথমটির উচ্চারণ
‘কোরে’ [করিয়া > ক’রে]
আর দ্বিতীয় ‘করে’ এর উচ্চারণ
‘করে’ (‘ক’ এর পর অ উচ্চারণ হবে)। যাতে শিশুরা পড়তে অসুবিধার সম্মুখীন না হয়, তার জন্য রবীন্দ্রনাথ এই ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করেছিলেন সহজপাঠে।
‘সহজ পাঠ’ এর প্রথম ভাগে আছে — ১)”চরে ব’সে রাঁধে ঙ,
চোখে তার লাগে ধোঁয়া।”
আলোচ্য অংশে ‘ব’-সে’ শব্দটার সাথে ঊর্ধ্বকমা ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন এর উচ্চারণ — বসিয়া > ব’সে (বোসে)।
২) “ছোট খোকা দোলা চ’ড়ে দোলে।’ “ঐ যে আসে ভেলা চ’ড়ে বৈঠা বেয়ে।” “মেজো মেসো হাতি চ’ড়ে আসে।” — (চড়িয়া > চ’ড়ে, উচ্চারণ-‘চোড়ে’)
৩) “মাছরাঙা ঝুপ ক’রে পড়ে এসে জলে।” — “কী ক’রে যে ওরা শোনে।”
“হয় সে কেমন ক’রে।” — (করিয়া > করে, উচ্চারণ ‘কোরে’)।
৪) “লেগেছে হওয়ার ‘পরে।” “তারি ‘পরে রোদ পড়ে…” — (উপরে > ‘পরে,’পোরে’)।
৫) “রাণীদিদি ওর বাটি ভ’রে আনে দানা।”— “আজ ফুলে যায় ভ’রে।”
“কচি ধান গাছে খেত ভ’রে আছে।” “শিউলির ডালে কুঁড়ি ভ’রে এল।” — (ভরিয়া > ভরে, উচ্চারণ ‘ভোরে”)
সহজপাঠের দ্বিতীয় ভাগেও এই উর্ধ্বকমার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কয়েকটি উদাহরণ আমরা দেখে নেব — ১) “তাই তারা ভিড় ক’রে এসেছে।” “পাতাগুলো খেয়ে সাঙ্গ ক’রে দিয়েছে।” — (করিয়া > ক’রে,উচ্চারণ ‘কোরে’)।
২) “অন্ধ কানাই পথের ‘পরে।” — (উপরে > প’রে)
৩) “ইন্দুকে ব’লে দিয়ো, তাঁর আতিথ্যে যেন খুঁত না থাকে।” — (বলিয়া > বলে, উচ্চারণ ‘বোলে’।
৪) “সন্ধ্যা হ’লে ঘরে ধুনোর গন্ধ দিয়ো।” — (হইলে > হ’লে)।
৫) “কর্তাবাবু বর্ষাতি প’রে চলেছেন।” — (পরিয়া >প’রে)।
৬) “গর্ত সব ভ’রে গিয়ে ব্যাঙের বাসা হ’ল।” — (ভরিয়া > ভ’রে, হইল > হ’ল)।
৭) “ফল ধ’রে মেঘ ঘনিয়ে আছে।” — (ধরিয়া >ধরে, উচ্চারণ ‘ধোরে’)।
প্রাথমিক অবস্থায় শিশুরা এর সাথে অভ্যস্ত হলে সঠিক উচ্চারণ করতে শেখে। পরবর্তীকালে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো না থাকলেও তারা সঠিক উচ্চারণ করতে শিখে যায়। (ক্রমশ)