বোধ পরীক্ষণ
পড়ার মূল উদ্দেশ্য অর্থ বুঝে একটা নির্দিষ্ট গতি মেনে সাবলীল ভাবে পড়া। ঠিক তেমনি বোধ পরীক্ষণ হল কোন পাঠের বর্ণিতব্য বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ এবং তার পরীক্ষা। অর্থ না বুঝে পড়লে পাঠ সম্পর্কে তার বোধ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই যা পড়বে বুঝে পড়ো।তাই পাঠ বা পঠন=দ্রুততা + বোধ
(Reading=Fluency+ Comprehension)
সহজ পাঠের টেক্সটগুলিও এমন ভাবে বোধের কাঠিন্য অনুযায়ী সাজানো হয়েছে, যাতে শিশুরা কোনো সমস্যার মধ্যে না প’ড়ে সহজে বুঝে নিতে পারে। এতে দ্রুততার সাথে তারা যেমন পড়তে পারে তেমনি তাদের বোধের জায়গাটাও পাকাপোক্ত হয়।
পাঠ অভ্যাসের ভিত্তি স্থাপন
‘সহজ পাঠ’ রবীন্দ্রনাথ মূলত শান্তিনিকেতনের ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের জন্যই তৈরি করেছিলেন, যাতে তাদের পাঠ অভ্যাসের ভিত্তি স্থাপিত হয়। যাতে তারা সেলফ্ লার্নিং বা আত্মপাঠের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। বইটা শিশু শিক্ষার ভিত্তি বা Bas। একটা বাড়ির ভিত মজবুত না হলে যেমন তার উপর দোতলা, তিন তলা বাড়ি বানানো যায় না, তেমনি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয় তবে পরবর্তীকালে তার চলার পথটাও মসৃণ হয় না। তাই শিশুদের পড়ার সেই অভ্যাসটা রবীন্দ্রনাথ গ’ড়ে দিতে চেয়েছিলেন একদম ছোটবেলা থেকেই।
জানা থেকে অজানা জগতে প্রবেশ ও কল্পনাশক্তির বিকাশ
জানা থেকে অজানা (Known > Unknown), মূর্ত থেকে বিমূর্ত (Concrete > Abstract), সহজ থেকে কঠিন (Easy > Hard) এর দিকে যাত্রাকে বলা হয় আরোহী পদ্ধতি Inductive Method। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সহজ পাঠে এই ধারণাটিকে প্রয়োগ করে পঠিতব্য বিষয়কে তাদের কাছে মূর্ত করে তুলতে চেয়েছিলেন। যা কিছু পড়ানো হয়েছে শিশু তার চারপাশে দেখছে, তা থেকে জ্ঞান আহরণ করছে, ও শেষে একটা বিমূর্ত জায়গায় প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। আর শিশুরা যেহেতু কল্পনা প্রবণ হয়, সেহেতু কল্পনার রাজ্যে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছে যায় কোন এক বিমূর্ত জগতে। শিশু তার ভাবনা ও কল্পনার রসে জারিত হয়েই অনেককিছু শেখে। যেমন —
“কাল ছিল ডাল খালি
আজ ফুলে যায় ভ’রে।
বল দেখি তুই মালী,
হয় সে কেমন ক’রে।
*
গাছের ভিতর থেকে
করে ওরা যাওয়া-আসা।
কোথা থাকে মুখ ঢেকে,
কোথা যে ওদের বাসা।
*
থাকে ওরা কান পেতে
লুকানো ঘরের কোণে
ডাক পড়ে বাতাসেতে
কী ক’রে যে ওরা শোনে।”
এখানে প্রথম স্তবকে বর্ণিতব্য বিষয় ছিল ‘কাল ছিল ডাল খালি’ তবে আজ কীভাবে ফুলে ভরে যায়? স্বভাবতই তার মনে প্রশ্ন জেগেছে। এই কেনর উত্তর সে খুঁজতে চাইবে, কল্পনা প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, জানা থেকে অজানা স্তরে পৌঁছে যাবে সে। আবার ‘গাছের ভিতর থেকে করে ওরা যাওয়া আসা’এখানে ‘ওরা’ কারা?’ওরা’ বলতে ফুল। কেন ওরা লুকানো ঘরের করে থাকে? ওদের বাসা কোথায়? এ সমস্ত নানা প্রশ্ন তারা করবে এজন্য সহজপাঠ শিশুদের কল্পনার রাজ্যে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
আবার অষ্টম পাঠের একটি কবিতায় আছে —
“দিনে হই একমতো রাতে হই আর
রাতে যে স্বপন দেখি মানে কী যে তার! আমাকে ধরিতে যেই এল ছোটো কাকা স্বপনে গেলাম উড়ে মেলে দিয়ে পাখা।” আবার শেষে আছে —
“ভয়ে কাঁপি, মা কোথাও নেই কাছাকাছি ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখি বিছানায় আছি।” এই স্বপনে উড়ে যাওয়া আবার ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখি বিছানায় আছি- এর মধ্যে দিয়ে শিশুর কল্পনা প্রবণতা যেন প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে। ঠিক তেমনি —
“জানি না কোন দেশে
পৌঁছে যাবে শেষে,
সেখানেতে কেমন মানুষ
থাকে কেমন বেশে।
*
থাকি ঘরের কোণে,
সাধ জাগে মোর মনে
অমনি ক’রে যাই ভেসে ভাই
নতুন নগর বনে।”
এখানেও শিশুরা জানা থেকে অজানায় প্রবেশ করবে। “থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে” এই অভিপ্রায় জাগে সবারই। কারণ মানুষ সুদূরের পিয়াসী।অজানাকে জানবার, অদেখাকে দেখবার এবং অচেনাকে চেনবার বাসনা তার চিরকালের। শিশুর সেই কল্পনাপ্রবণতা, সুদূরের পিয়াসী মনকে কবি জানেন বলেই তাদের সেই বোধ টাকে আরেকটু উসকে দিতে চেয়েছেন।
“কতদিন ভাবে ফুল উড়ে যাব কবে, যেথা খুশি সেথা যাব ভারি মজা হবে। তাই ফুল একদিন মেলি দিল ডানা — / প্রজাপতি হল, তারে কে করিবে মানা।”
ফুলের উড়ে গিয়ে প্রজাপতি হওয়া, প্রদীপের আলোর পাখা পেয়ে জোনাকি হওয়া, পুকুরের জল পাখির মত ধোঁয়া হয়ে মেঘে রূপান্তরিত হওয়া- এসবই কল্পনা। তাই ছোট্ট শিশু মনে মনে কল্পনা করে —
“আমি ভাবি ঘোড়া হয়ে মাঠ হবো পার। কভু ভাবি মাছ হয়ে কাটিব সাঁতার।
কভু ভাবি পাখি হয়ে উড়িব গগনে। কখনো হবে না সে কি ভাবি যাহা মনে।”
শিশু কল্পনা করতে ভালোবাসে। শিশুর কল্পনায় শরৎ মেঘে রবীন্দ্রনাথকেও দেখতে পাওয়া যায়, কখনো আবার রংচটা দেওয়ালে উগ্র সিংহের রুদ্রমূর্তি। এসব দেখে দিদিমণি বলতেই পারেন “এসব কথা আবার যেন না শুনি কক্ষনো”। কিন্তু শিশুমন তো নিষেধের মানা মানে না,তারা কল্পনা করবেই।জনৈক কবির লেখাতে তাই পড়েছিলাম শিশুর কল্পনা ভেসে উঠেছে —
“উডু উডু জাম গরু
আকাশে খেলিং,
শরতের মেঘ রোদে
নেই কো রেলিং।”
শিশু মনের কল্পনায় যা কিছু উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ তাকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এতে তাদের চিত্ত প্রসারিত হবে, বিমূর্ত বিষয়গুলি নিয়ে তারা চিন্তাভাবনা করতে শিখবে শিমুকাল থেকেই।
শৃঙ্খলা, নীতিবোধ, আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ ইত্যাদি সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ :
এগুলো হলো ভাষা শিক্ষার দ্বিতীয় ধাপ। মানব শিশু ভাষা অনুকরণের মাধ্যমে শিখে নেয়। কিন্তু শৃঙ্খলা, নীতিবোধ, আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ ইত্যাদি সামাজিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটে অনুশীলনের মাধ্যমে। এগুলো শিখনের বিষয়। তাই বিভিন্ন পাঠে টুকরো টুকরো ঘটনা যেগুলো শিশুদের কোনো না কোনো গুণাবলীর বিকাশ ঘটাবে। দুখী বুড়ির উনুন ধারে বসে আগুন পোহানোর দৃশ্য কিংবা অন্ধ কুঞ্জ বিহারীকে দেখলে আমাদের মনেও সহমর্মিতা জাগে। গঞ্জের জমিদার সঞ্জয় সেন সেই সহমর্মিতার জায়গায় এসে দুমুঠো অন্য তাকে দুই বেলা দেন, আবার ভঞ্জের পিসি তাকে কম্বল দান করেন কখনো বা ডেকে পৌষের পিঠে পুলি খাওয়ান। এইসব নীতিবোধ গুলোই তো শিশুকাল থেকে শেখার কথা। কিম্বা “আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করবার দিন। সব ছেলেরা দঙ্গল বেঁধে যাবে।” এর মধ্যে দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বোধ যেমন শিখবে শিশুরা, পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বোধ, নান্দনিক চেতনাও বৃদ্ধি পাবে।
আমি আগেই বলেছি ‘সহজ পাঠ’ প্রথম ভাগে শিশুর প্রকৃত ভাষা শিক্ষার সূচনা ঘটবে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাগে গিয়ে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি চলবে ভাষার অন্যান্য দিকগুলোর বিকাশ। তার (ভাষার) নান্দনিক দিক, সৃজনশীলতার দিক, জানা থেকে অজানা, সহযোগিতা, সহমর্মিতার দিকগুলোও সে বুঝতে শিখবে। দ্বিতীয় ভাগে ‘হাট’ নামক ছড়ায় তারা জানবে হাটে কী কী জিনিস পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় হাটের বিবর্তন এল কীভাবে সেই বিষয়টাও তাদের চোখ এড়াবে না।
“কুমোর পাড়ার গোরুর গাড়ি
বোঝাই করা কলশি-হাঁড়ি।
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।
হাট বসেছে শুক্রবারে
বকশিগঞ্জে পদ্মাপারে।”
তখনকার দিনে হাট কোথায় বসত সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা হবে।বেশিরভাগ হাটই বসত নদীর ধারে। এখানেও তেমনটা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের পদ্মার পারে বকশিগঞ্জে হাট বসেছে।
সেই হাট বর্তমানে আর সস্থানে আছে কি না জানি না। কিন্তু বক্সীগঞ্জে যে হাট হয় না তা নয়। সেখানেও হাট বসে। আবার সেই বংশী বদন বা ভাগ্নে মদনকে হয়তো পাওয়া যাবে অন্য কোন রূপে। কিন্তু হাটুরে আনাগোনা অনন্ত কাল ধরে চলে আসছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। হয়তো তার পরিসর বেড়েছে, হাটের সংখ্যা বেড়েছে আর জিনিসপত্র তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
সহজপাঠের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে নানান রকম জীবিকার নানা মানুষ। কখনো ধোবা, কখনো ফেরিওয়ালা, আর্দালি সহ মেহনতি মানুষের চিত্র দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাদের কাজটা যেমন শিশুদের কাছে তুলে ধরেছেন তেমনি তাদের প্রতি সহানুভূতির জায়গাটাও খুব পাকাপোক্ত করে তুলেছেন।
“বাসনওয়ালা থালা বাজায়; / সুর ক’রে ওই হাঁক দিয়ে যায় আতাওয়ালা নিয়ে ফলের ঝোড়া।”
জীবজন্তুদের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতাবোধ :
শৈশবের সঠিক শিক্ষা একটা শিশুর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানবিকতার শিক্ষা যদি শৈশবে না শেখানো যায় তবে ভবিষ্যৎ জীবনে তা শেখানো খুবই কষ্টকর বিষয় হয়ে ওঠে। মানবতার প্রাথমিক পাঠ শুরু করা উচিত শিশুকাল থেকেই। অনেক উন্নত দেশে যে Moral Education বা নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয়, রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’ এক্ষেত্রে অনেকটা কাজে দেবে।
“এ কী পাখি? এ যে টিয়ে পাখি। ও পাখি কি কিছু কথা বলে? কী কথা বলে? ও বলে, রাম রাম, হরি হরি। ও কি খায়? ও খায় দানা। রানীদিদি ওর বাটি ভ’রে আমি দানা। বুড়ি দাসী আনে জল। পাখি কি ওড়ে? না, পাখি ওড়ে না, ওর পায়ে বেড়ি।
ও আগে ছিল বনে। বনে নদী ছিল, ও নিজে গিয়ে জল খেত। দীনু এই পাখি পোষে।”
পাখিদের প্রতি ভালবাসার চিত্রটিও সহজ পাঠ এ উঠে আসে।শুধু পাখি নয়
দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে —
“দুর্গানাথের আঙিনায় জল উঠেছে। তার দর্মার বেড়া ভেঙে গেল। বেচারা গোরুগুলোর বড়ো দুর্গতি। এক-হাঁটু পাঁকে দাঁড়িয়ে আছে।”
তাই কখনও পাখি আবার কখনও গরুর মতো মনুষ্যেতর প্রাণীদের ব্যথা শিশুদের অনুভব করানোর চেষ্টা করেছেন রবীন্দ্রনাথ।এই টুকরো টুকরো ছবিগুলির দ্বারা পারস্পরিক সাহায্যের যে চিত্র উঠে আসে তেমনি মানবিকতার উন্মেষ ঘটে।জীবনের চলার পথে কীভাবে চলতে হয় তা আয়ত্ত করার নামই হল শিক্ষা।
আইনস্টাইন বলেছিলেন —
“ইস্কুল কলেজে অংক, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি সমস্ত ভুলে যাওয়ার পর, যা বাকি থাকে তা হল শিক্ষা।”
রবীন্দ্রনাথ সেই মানবিকতা, সৌন্দর্য চেতনা, নান্দনিকতাবোধ তথা শৃঙ্খলাবোধ, নীতিশিক্ষার পাঠই দিতে চেয়েছেন সহজপাঠের পাতায়।
বেড়ি হাতা–বেড়ি শব্দের অর্থ কী?
বেড়ি বড়ো বাঁকানো সাঁড়াশির মত,বাড়িতে মাটির খোলায় (হাড়ি)মুড়ি ভাজার সময় হাড়িতে রাখা বালি গরম হলে ওর মধ্যে চাল দিয়ে বেড়ির সাহায্যে ধরে ঘোরানো হয়।এভাবেই মুড়ি ফুলে উঠলে চালুনিতে ঢেলে মুড়ি আর বালি আলাদা করে নেওয়া হয়।