১৯২১ সালের ১৬ জুলাই। বিদেশ ভ্রমণ করে দেশে ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ। দিন কয়েক পরে শান্তিনিকেতন থেকে তিনি এলেন কলকাতায়। তখন শহরে অসহযোগ আন্দোলনকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা। সহযোগের পূজারী রবীন্দ্রনাথ অসহযোগকে সমর্থন করতে পারেন নি। লিখলেন ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধে তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করলেন অসহযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য। কিন্তু সে বক্তব্য সমর্থন করতে পারলেন না অনেক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। যেমন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রবীন্দ্রের বক্তব্যের প্রতিবাদে শরৎচন্দ্র লিখে ফেললেন ‘শিক্ষায় বিরোধ’। রবীন্দ্রানুরাগী হলেও অসহযোগ আন্দোলনে মেতে উঠেছিলেন সি এফ এন্ড্রুজ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কবি কাজি নজরুল ইসলাম প্রমুখেরা।
বিদেশি বস্ত্র বর্জন ছিল অসহযোগ আন্দোলনের একটাঅঙ্গ। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে বিদেশি বস্ত্র বর্জনের ডাক দিলেন। এই বয়কট আন্দোলনকে তীব্র ও ব্যাপক করার জন্য গাঁধীজি বিদেশি বস্ত্র অগ্নিদগ্ধ করার কর্মসূচি গ্রহণ করলেন এবং তাঁর পৌরোহিত্যে ৩১ শে জুলাই মুম্বাইএর প্যারেলে বস্ত্রদাহ অনুষ্ঠানের সূচনা হল। এই ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ বিচলিত হয়ে উঠলেন। তিনি তখন নেতিবাচক এই আন্দোলনের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে রচনা করলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সত্যের আহ্বান’। কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটের এক সভায় তিনি পাঠ করলেন তাঁর প্রবন্ধ। বলা বাহুল্য রবীন্দ্রের বক্তব্য নেতা ও কর্মীদের মনে দাগ কাটতে পারে নি। তাঁরা তখন উত্তেজনার আগুন পোহাতেই ব্যস্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর বক্তব্যে অনড় ছিলেন। দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার উপর কাপড় পোড়াইবার হুকুম আসিয়াছে। সে হুকুমকে আমি হুকুম বলিয়া মানিতে পারিব না। ’
রচনাকালের বিচারে ‘সত্যের আহ্বানে’র বয়েস হল একশো বছর। এই প্রবন্ধের আলোকে একশো বছর পরে দেশের অবস্থা দেখে নিতে ইচ্ছে করে। প্রথমেই আসে দেশপ্রেমের কথা। রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন যে দেশ শুধু একটা ভৌগোলিক সত্তা নয়, ‘যে দেশকে মানুষ আপনার জ্ঞানে-প্রেমে-কর্মে সৃষ্ট করে তোলে, সেই তার স্বদেশ।’ তাঁর মতে দেশের মধ্যে নিজের আত্মাকে ব্যাপকভাবে উপলব্ধি করাই প্রকৃত দেশাত্মবোধ। তিনি বলেন, ‘আপনার চিন্তার দ্বারা, কর্মের দ্বারা, সেবার দ্বারা দেশকে যখন নিজে গড়ে তুলতে থাকি তখনই আত্মাকে দেশের মধ্যে সত্য করে দেখতে পাই। মানুষের দেশ মানুষের চিত্তের সৃষ্টি, এইজন্য দেশের মধ্যে মানুষের আত্মার ব্যাপ্তি, মানুষের আত্মার প্রকাশ।’ আমরা কি এইরকম দেশাত্মবোধের উত্তরাধিকারী হতে পেরেছি? আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেছি কিন্তু দেশকে জ্ঞানে-প্রেমে-কর্মে সৃষ্টি করে তোলার শিক্ষা লাভ করতে পারি নি। তার জন্য দায়ী স্বাধীন ভারতের প্রশাসকরা। প্রয়োজনের সময়, আপনাপন স্বার্থসিদ্ধির সময় তাঁরা দেশপ্রেমিক আবেগের সুড়সুড়ি দেন, দেশবাসী সে আবেগের পুতুল হয়ে যায়।
মানুষকে বাদ দিয়ে দেশ হয় না। নানা জাতি, নানা ধর্ম সমন্বিত ভারতবর্ষ একটি বিরাট দেশ। বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সাধনাই ছিল স্বাধীন ভারতের অন্বিষ্ট। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পরে শাসকবর্গ ঐক্য স্থাপনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন নি। বরং ইংরেজ আমলের ‘ভাগ করে ভোগ করার’ নীতিকে অনুসরণ করে গেছেন। নারী পুরুষের বিভাজন, সবল দুর্বলের বিভাজন, মালিক শ্রমিকের বিভাজন, কায়িক শ্রম ও মানসিক শ্রমের বিভাজন, উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণের বিভাজন বজায় রেখেছেন তাঁরা। কারণ বিভাজনে স্বার্থসিদ্ধ হয়। দেশ নয়, দেশের মানুষ নয়, ঐক্য ও সংহতি নয়, রাজনৈতিক মহাজনদের একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতালাভ, ভোটব্যাঙ্ক। তাই কেউ তোষণ করেন সংখ্যালঘুকে, কেউ বা তোষণ করেন সংখ্যাগুরুকে। ধর্ম ও বর্ণে প্রবলভাবে বিভক্ত ভারতে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ একটি আপ্তবাক্য হয়ে রইল। সংবিধানপ্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকর একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন ১৯৪৯ সালে, যা আজও সমান সত্য হয়ে রেয়েছে। তিনি বলেছিলেন যে দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে গণতন্ত্র থাকলেও ভারতীয় সমাজ অগণতান্ত্রিক রয়ে গেছে স্বাধীনতার পরেও। সেই অগণতান্ত্রিকতার উৎসে আছে বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতা। আর, বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতা থাকলে দেশকে জ্ঞানে-প্রেমে-কর্মে সৃষ্টি করে তোলা সম্ভব নয়।
ভারতে গাঁধীজির ঐতিহাসিক ভূমিকাকে নতমস্তকে স্বীকার করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে ‘মহাত্মা’ বলে সম্বোধন করেছেন। বলেছেন গাঁধীর প্রেমের ডাকে ভারতের হৃদয়ের আশ্চর্য উন্মোচন হল। বিদেশে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন দেশে একটা মুক্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কিন্তু দেশে ফিরে দেখলেন, ‘দেশের হাওয়ায় আজ প্রবল একটা উৎপীড়ন আছে, সে লাঠি-সড়কির উৎপীড়ন নয়, তার চেয়ে ভয়ংকর, অলক্ষ্য উৎপীড়ন। ’ অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে তিনি সেই অলক্ষ্য উৎপীড়নের চেহেরা দেখতে পেলেন। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসেও অলক্ষ্য উৎপীড়নের ছবি এঁকেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ গাঁধীর সমালোচনা করে বললেন, ‘মহাত্মা তাঁর সত্য প্রেমের দ্বারা ভারতের সমস্ত হ্রদয় জয় করেছেন, সেখানে আমরা সকলে তাঁর কাছে হার মানি’ কিন্তু ‘প্রেমের সত্যকে প্রেমের দিকে যেমন মানি, বুদ্ধির সত্যকে বুদ্ধির দিকে তেমনি মানতে হবে।’ দেশে ফিরে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন বুদ্ধি আর বিদ্যাকে চাপা দেবার চেষ্টা, বাধ্যতাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। কার কাছে বাধ্যতা? মন্ত্র ও অন্ধবিশ্বাসের কাছে বাধ্যতা। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে মন্ত্রবলে সোনা ফলাতে পারেন সন্ন্যাসী, আমাদের বিশ্বাস করতে হবে কোন বাহ্যানুষ্ঠানের দ্বারা অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। অসহযোগ আন্দোলন নির্বাসন দিয়েছে বুদ্ধির সত্যকে। অর্থশাস্ত্রকে বহিষ্কার করে তার জায়গায় টেনে আনা হয়েছে ধর্মশাস্ত্রকে। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কাপড় ব্যবহার বা বর্জন ব্যাপারে অর্থশাস্ত্রিক তত্ত্বের ঘনিষ্ঠ যোগ আছে; এ সম্বন্ধে সেই তত্ত্বের ভাষাতেই দেশের সঙ্গে কথা কইতে হবে। বুদ্ধির ভাষা মান্য করা যদি বহুদিন থেকে দেশের অভ্যাসবিরুদ্ধ হয় তবে আর সব ছেড়ে দিয়ে ওই অনভ্যাসের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে ; কেননা ওই অনভ্যাসই আমাদের গোড়ায় গলদ — original sin.’
একশো বছর আগে বুদ্ধির সত্যকে চাপা দেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একশো বছর পরেও আমরা দেখছি বুদ্ধির সত্যকে চাপা দেবার চেষ্টা। রামনামে মাতাল করে তোলা হল মানুষকে, ভেঙে ফেলা হল বাবরি মসজিদ, বলা হল হিন্দুদের প্রাচীন শাস্ত্রগুলি সব্যবিদ্যার খনি, আধুনিক বিজ্ঞানের নানাবিধ আবিষ্কার সহস্র বছর আগেই অধিগত ছিল হিন্দুদের, বলা হল গোমূত্রে আছে করোনা প্রতিষেধক, গোদুগ্ধে আছে সোনা, গায়ত্রী মন্ত্র জপ করলে প্রতিহত করা যাবে কালান্তক ব্যাধি।
যুক্তি-তর্ক নয়, আমাদের শাসকমণ্ডলী ক্যাসাবিয়াঙ্কার মতো বাধ্যতা চান। প্রশ্ন করো না, তর্ক করো না, মেনে নাও, বিশ্বাস করো। রাজনৈতিক মহাজনেরা মন্ত্রবলে সোনা ফলাবেন। অলীক সেই সোনার লোভে দেশের মানুষ বিচার-বুদ্ধিকে বিসর্জন দিলেন। বিশ্বাস করলেন নোটবন্দি হলে কালো টাকা সব ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়বে। থালা বাজালে আর মোমবাতি জ্বালালে করোনার হৃদপিণ্ড ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। এভাবে একের পর অনেক …. নাগরিকপঞ্জি, কাশ্মীরে ৩৭০ধারা রদ, কৃষিবিল, প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং এ সবের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদের জিগির।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে বুদ্ধি সকলকে সংযুক্ত করে সেই হচ্ছে শুভবুদ্ধি। আমাদের শাসকরা শুভবুদ্ধিকে পরিহার করে চলেছেন সর্বেবভাবে। জাতিধর্মনির্বিশেযে মানব মিলন তাঁদের কাম্য নয়। তাঁরা বিভাজনের পুরোহিত। তাঁরা স্বাজাত্যের অহমিকাকে জাগিয়ে তুলতে চান, ‘জাতীয় গণ্ডিদেবতার পূজার অনুষ্ঠানে চারিদিক থেকে নরবলি’ আনতে চান।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক