গল্পগুচ্ছের অন্তর্গত ‘অধ্যাপক’ গল্পটির মত আত্মজৈবনিক উপাদানে ভরা ছোটগল্প রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর লিখেছেন বলে মনে হয় না। গল্পটি উত্তমপুরুষে বিবৃত। ১৩০৫ বঙ্গাব্দে (১৮৯৮খ্রিস্টাব্দ) মাত্র সাঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তিনি গল্পটি লেখেন। রবীন্দ্রনাথ এখানে হয়েছেন মহীন্দ্রনাথ। তিনি যে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন, তা গল্পটির মুখ্যচরিত্র নিজমুখে স্বীকার করছেন। তবে ক্লাস নাইনে ওঠার (এন্ট্রিলেভেল) পরীক্ষার নয়, বিএ পরীক্ষায়। অর্থাৎ মূল বিষয়টি ঠিক রেখে সময় বদলে দিয়েছেন। ১৮৭৫ সালে তাঁর বয়স ছিল চোদ্দ, বিএ পরীক্ষায় ফেল করার সময় মহীন্দ্রর বয়স একুশ।
কলেজের বইয়ের পাঠ্যবিষয়ের লেখকদের নাম বদলাননি। শেকসপিয়ার, হ্যামিল্টন, কার্লাইল, শেলী, গ্যেটে-র নাম অবিকৃত রেখেছেন। গ্যেটে লিখিত ‘টাসো’ নাটকের নামও (টরকোয়াটো টাসো) অবিকৃত। জার্মান-দার্শনিকের নাম নেননি, কিন্তু শোপেনহাওয়ার, কান্ট, হেগেল প্রমুখ চরিত্র হতেই পারে।
তবে সবচেয়ে অবাক করে ‘টনিসাহেব’-এর উল্লেখ। মহীন্দ্রের নিন্দুক কঠোর সমালোচক অধ্যাপক বামাচরণবাবু যে এমএ পরীক্ষায় কেবলমাত্র পাস করেননি, টনি সাহেবের প্রশংসাও যে অর্জন করেছিলেন (সম্ভবত গোল্ড মেডাল জাতীয় কিছু), তারও উল্লেখ করেছেন। এই টনি সাহেব চরিত্রটিও বাস্তব থেকে নেওয়া। তিনি হলেন প্রেসিডেন্সী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তথা ইতিহাস ও ইংরেজির অধ্যাপক চার্লস হেনরি টনি। তিনি মূলত বিলেত থেকে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে এদেশে পড়াতে এসেছিলেন।
এই চার্লস হেনরি টনির জন্ম ইংল্যান্ডে। কেম্ব্রিজ ট্রিনিটি কলেজ থেকে ফেলো টিউটরের পদ ছেড়ে দিয়ে ১৮৬৫-কে ভারতে তথা বাংলায় আসেন। তাঁর ঠান্ডা লাগার ধাত ছিল। তাই কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ট্রপিক্যাল কান্ট্রি ইন্ডিয়ায় আসা সাব্যস্ত করেন। ১৮৬৫ তে প্রেসিডেন্সী কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপকের পদ খালি ছিল। সদ্য অবসর নিয়েছেন অধ্যাপক ই বাইলস কাউয়েল। সেই পদেই যোগ দিলেন টনি। তাঁর পদবি কেউ কেউ টাউনি উচ্চারণও করতেন।
১৮৬৬ থেকে ১৮৭২ পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের অধ্যাপকের পদে বহাল ছিলেন। ১৮৭৩ থেকে তিনি ইংরেজির অধ্যাপক হন। ১৮৭৫-এ প্রেসিডেন্সীর অধ্যক্ষ জেমস সাটক্লিফের মৃত্যু হলে তিনি অধ্যক্ষের পদে যোগ দিলেন। ১৮৭৬ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত একটানা তিনি অধ্যক্ষ ছিলেন। মাঝে কিছুদিনের জন্যে ছুটিতে বিলেতে পরিবারের কাছে আর কিছুদিনের জন্যে ডিরেক্টর অফ পাবলিক ইন্সসট্রাকশনের কার্যনির্বাহী পদে ছিলেন।
শুধু অধ্যক্ষই নয়, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও সামলেছেন একসঙ্গে। ১৮৭৭ থেকে ১৮৮১, ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত তিনি রেজিস্ট্রার ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। পরে ১৮৮৬ ও ১৮৮৯-এও তাঁকে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তিনি CIE উপাধি পান ১৮৯২য়ে।
সাহিত্যমনস্ক চার্লস হেনরি টনি ১৮৭৫য়ে ইংরেজি অনুবাদে বার করেন জার্মান সাহেব লোথের লেখা বই। টনিসাহেবের বইটির নাম ‘English people and their language’। তিনি ছিলেন এক বিদগ্ধ শেকসপিয়ার বিশেষজ্ঞ। তবে Richard (III)-র সম্পাদনার কাজ ছাড়া তাঁর শেকসপিয়ার-সত্তার কোনও লিখিত দলিল নেই। এটাই আপসোসের। প্রফুল্লকুমার ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শেকসপিয়ার-বিশেষজ্ঞ ছিলেন বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। তাঁর কিছু কাজে আছে চার্লস হেনরি টনির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার। সংস্কৃত কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ তাঁর জীবনের সেরা কীর্তি।
রবীন্দ্রনাথ অধ্যাপক গল্পটির পটভূমিকায় কলকাতার একটি কলেজের অবতারণা করলেও (অবশ্যই প্রেসিডেন্সী কলেজ, কারণ টনিসাহেবের উল্লেখ), দ্বিতীয় ভাগে মূল ঘটনার ঘনঘটা দেখা যায় হুগলির ফরাসডাঙ্গায়। মানে আজকের চন্দননগরে। এটাও কিন্তু তাঁর জীবনেই ঘটেছে। মোরান সাহেবের বাংলোয় দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবীর কাছে ছুটিতে বেড়াতে আসতেন তিনি। সেখানকার মনোরম অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেছেন জীবনস্মৃতি বইটিতে। গঙ্গার বুকে সেই মায়াময় সূর্যাস্ত, পাখিদের কলকাকলির কথা এই গল্পটিতেও পাওয়া যায়। রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য মোরান সাহেবের বাংলো বলে কথিত বাড়িটিকে এখন চন্দননগর পুরসভা পাতালবাড়ি বলে চিহ্নিত করেছে। যদিও গোন্দলপাড়া জুটমিলের কাছে সেটি ছিল বলে জানা গেছে। তবে বাংলোর উল্টোদিকে ছিল অ্যান্টনি বাগান। আমাদের আলোচ্য অধ্যাপক গল্পটিতেও একটি সুরম্য বাগানের উল্লেখ আছে। যেখানে কিরণবালাকে দেখে মহীন্দ্রনাথ তার প্রেমে পড়েন। তার বাবা ভবনাথবাবুকে দেখে মহর্ষি কন্বের কথা মনে হয় তাঁর। কিরণবালার সঙ্গে মহীন্দ্রের প্রেমপর্ব যেন কাদম্বরী দেবীর প্রতি তাঁর চোরা টানের কথা মনে পড়ায়। সেখানকার উদ্যানের পল্লবে পল্লবে গুঞ্জরিত হয়েছিল সেই অনুচ্চার প্রেমের কাহিনী। মহীন্দ্রবাবু কিরণের বেগুনের খেত, পাকা আমের ডালে হাত বাড়ালে কী হয়, ক্লাইম্যাক্স কিন্তু বিয়োগান্তক। যে বামাচরণবাবু ছিলেন তাঁর লেখা কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-প্রহসনের সুতীব্র সমালোচক, তিনিই আবির্ভূত হন কিরণবালার আসল গোপন প্রেমিক হিসেবে। প্রথমবিভাগে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিরণবালার পাণিপ্রার্থী হিসেবে টনিসাহেবের সার্টিফিকেট পাওয়া বামাচরণবাবুকেই যেন মানায়, বিএ-ফেল মহীন্দ্রবাবুকে নয়! তাই দেশে ফিরে একটি আটপৌরে বিবাহিত জীবন যাপন করাই যেন মহীন্দ্রের ভবিতব্য ছিল।
এই গল্পটি রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন থেকেই নেওয়া। গল্পের খাতিরে স্থান-কাল-পাত্র কিঞ্চিৎ এদিকওদিক করা হয়েছে। বামাচরণবাবু এমএ পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করে টনিসাহেবের শংসাপত্র পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও পেয়েছিলেন তাঁর প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়ার ছাপ্পা। না হলে যে তাঁর আইসিএস পরীক্ষায় বসার জন্যে প্রয়োজনীয় বয়সের সার্টিফিকেট পাওয়ার আবেদনই তিনি করতে পারতেন না! তাই অধ্যাপক গল্পটি তাঁর ‘জীবন থেকে নেওয়া’ অভিজ্ঞতার নির্যাস। হয়তো প্রেসিডেন্সী কলেজে একদিন ক্লাস করার স্মৃতিই গল্পটির মধ্যে নিহিত আছে।