| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা ও সর্বজনীন চেতনা (দ্বিতীয় পর্ব) : মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৮১৭ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০২৪

তিন.

প্রবন্ধের সূচনায় উদ্ধৃত রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ রেখেই বলতে হয়, আধ্যাত্মিকতা বলতে সেই বাস্তবতাকে বোঝানো হয় যা আমাদের প্রতিদিনের স্থূলতা থেকে অনেক দূরের। এটি হচ্ছে সেই গহিন পথ যার দ্বারা একজন ব্যক্তির বেঁচে থাকা কিংবা তার অস্তিত্ব আবিষ্কারের প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়। ধ্যান, প্রার্থনা, প্রত্যাশা দিয়ে একজনের অন্তরজীবনের উন্নতি হতে পারে। আধ্যাত্মিকতার বাস্তবতা হতে পারে ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ এবং এই সংযোগ ব্যক্তি থেকে প্রসারিত হতে পারে মানব সমাজ, প্রকৃতি, বিশ্বলোক ও ঈশ্বরের সিংহাসন পর্যন্ত। জীবনে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাও হতে পারে পরমার্থসাধনা। যে বিশ্বাস ধারণ করে ঈশ্বর সম্পর্কে অন্তর্নিহিত ভাবনা কিংবা বিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের জন্য কাতরতা তারই নাম কি আধ্যাত্মিকতা?

প্রচলিত ধারণায় আধ্যাত্মিকতা বা পরমার্থসাধনাকে ধর্মীয় জীবনেরই অংশ বলা হয়। অবশ্য ইউরোপ-আমেরিকায় এ শব্দটি দ্বারা বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচর্চার বাইরের অনেক কিছুকে বোঝানো হয়ে থাকে। যেমন, ‘ধ্যান’ অধ্যাত্মসাধনার অংশ হলেও এর দ্বারা শরীরের সুস্থতার ধারণা যুক্ত হয়েছে। ঈশ্বর বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী যেকোনো ব্যক্তি ধ্যানের মাধ্যমে শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে পারেন। এ ধরনের দৃষ্টিকোণে আধ্যাত্মিকতা বিশ্লেষণে গুরুত্ব পায় মানবতাবাদ, প্রেম, সমবেদনা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, পরিতৃপ্তি, দায়িত্ব, সংগতি, অপরের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি দৃষ্টি রাখা প্রভৃতি। অনেকে মনে করেন এসব বিবেচনা কোনো ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং পৃথিবীর প্রতিদিনকার বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে; তার জন্য প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে প্রার্থনা ও ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে স্মরণ করছি আমরা। যে বিশ্বে আমরা বাস করি তার আশ্চর্য ক্রিয়াকাণ্ড দেখে অভিভূত হই। আমরা কেন এখানে কিংবা আমাদের মৃত্যুর পরে কী হবে, এসব ভাবনাই অধ্যাত্মতত্ত্বের অংশ। আমরা তখনই আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে পরিচিত হই যখন সুন্দর, প্রেম অথবা সৃষ্টিশীলতায় নিজেকে খুঁজে পাই।

বাস্তব পৃথিবীতে জীবন পরিচালনায় আমাদের প্রত্যাশা প্রকাশিত হয় সূক্ষ্ম সম্পর্কের সুতোয়। সেই সম্পর্কের মধ্যে পরমার্থ-জীবন আমাদের প্রশান্তি দান করে। আধ্যাত্মিক জীবনের পথ বিচিত্র। ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নিজেকে তৈরি করা, নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি জগতের সঙ্গে মিলতে চাওয়ার জন্য সুশৃঙ্খলভাবে ধ্যান, প্রার্থনা, নৈতিকতার উন্নতি সাধন, ধর্মীয় গ্রন্থে নিমগ্ন হওয়াকে চিহ্নিত করা হয় এর অন্যতম পথ হিসেবে। এসবই অনেক সময় একজন ধর্মতাত্ত্বিকের মাধ্যমেও সম্পন্ন হতে পারে। আধ্যাত্মিকতার লক্ষ্য হচ্ছে ভেতরের জীবন ও বাইরের জীবনের উন্নতি। প্রেম ও করুণা ধারায় সিক্ত হলে আধ্যাত্মিক জীবনের উন্নতি ঘটে।

ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার যোগাযোগটা কী রকমের? পরমের সন্ধানে নিয়োজিত আধ্যাত্মিকতার উদ্দেশ্য পরমের সন্ধান আর ঈশ্বরের অন্বেষণ ধর্মের মূল কাজ। তবে ধর্মের থাকে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের কেন্দ্র। যার সঙ্গে অলৌকিক ও পরমলোকের যোগাযোগ। অন্যদিকে আধ্যাত্মিকতার জন্য নির্দিষ্টভাবে ধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস না থাকলেও চলে। তবে আমাদের মতে আধ্যাত্মিকতা ধর্মেরই একটি অংশ। ধর্মের বাইরে একজন ব্যক্তি তার আধ্যাত্মিক জীবন খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু যিশু খ্রিস্টের জীবনের প্রসঙ্গ আলোচনা করলে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা একই জিনিস মনে হওয়াই স্বাভাবিক। অপরের জন্য নিজেকে আত্মোৎসর্গ করা, নিজের শান্তি, নিজের তৃপ্তি, সুখী হওয়ার প্রচেষ্টায় দান-ধ্যান-প্রার্থনায় নিয়োজিত থাকা এসবই আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বিজড়িত। এর সঙ্গে বিশ্বাস এবং অলৈাকিকতার সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিজের অন্তরের উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ। আধ্যাত্মিকতা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। আধ্যাত্মিকতাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘পবিত্রতার স্মারক’। পূজা ও নৈবেদ্যের মধ্যে সেই স্মারক লুকিয়ে থাকতে পারে।

অন্যদিকে সার্বজনীন চেতনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মিত্রতার বিষয়টি। খ্রিস্ট ধর্মের দৃষ্টিতে সমগ্র মানব সমাজ এবং সৃষ্টির সব কিছু ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঈশ্বর সকল মানুষের প্রতিপালক। তিনি সকলকে ভালোবাসেন। মানবতার দিশারি হিসেবে যিশু খ্রিস্ট আমাদের পরিত্রাণকর্তা। মানবাত্মা সম্পর্কে ধারণা একটি সার্বজনীন ধারণা। বিশ্বজুড়ে মানুষে মানুষে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আধ্যাত্মিক সত্যকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব থেকে মুক্তির জন্য সার্বজনীন চেতনার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষে মানুষে মৈত্রী, সাম্য, ঐক্য ও পারস্পরিক বিশ্বাস এই চেতনার প্রধান দিক।

চার.

‘শান্তিনিকেতন’ (১৯০৮-৯), ‘ধর্ম’ (১৩১৫) এবং ‘মানুষের ধর্ম’ (১৯৩৩) রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার দলিল। অন্যদিকে ‘গীতাঞ্জলি’সহ অনেক কাব্যের মৌল অনুষঙ্গ অধ্যাত্মবাদ। প্রথম তিনটি গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো কবির ধর্মোপদেশের সংগ্রহ কিংবা শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপনের পরে রচিত। তিনি সাধারণের কাছে ধর্মতত্ত্বের কথা বলেছেন সহজ অনুভবের প্রান্ত থেকে।

অন্যদিকে কবির যথার্থ আধ্যাত্মিক সংগীতের পালা শুরু হয় ‘গীতাঞ্জলি’ পর্বে। তাঁর ধর্মদেশনায় শাস্ত্রজ্ঞ ও জ্ঞানী মানুষের ধর্মকথা প্রকাশিত হয়নি বরং সাধারণ ব্রাত্য মানুষের কথা বলেছেন তিনি। প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক সাধনার আদর্শ কবির নিজের জীবনের পূর্ণতার জন্য কেবল নয়, বৃহত্তর হিন্দুসমাজের জীবনযাত্রার জন্য আবশ্যক মনে করেছিলেন। এ জন্য ব্যক্তিগত অধ্যাত্মসাধনার চেয়ে সমাজগত ধর্মসাধনার দিকেই তাঁর দৃষ্টি বেশি পরিমাণে আকৃষ্ট হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জন্মভূমি হিসেবে যথাক্রমে তিনটি স্থান, অর্থাৎ পৃথিবী, স্মৃতিলোক এবং আত্মিকলোককে নির্দিষ্ট করেছেন তাঁর ‘মানবসত্য’ (মানুষের ধর্ম) প্রবন্ধে। ‘আত্মিকলোক’কে তিনি বলেছেন, ‘সর্বমানবচিত্তের মহাদেশ’। অন্তরে অন্তরে সকল মানুষের যোগের ক্ষেত্র এই চিত্তলোক। উপরন্তু এই চিত্তলোক বিশ্বগত হলেই মানুষ সত্যের জন্য প্রাণ দিতে উৎসুক হয়ে ওঠে। সর্বমানবের চিত্তের উপস্থিতির কারণে মানুষ মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে। অন্যের প্রাণ রক্ষায় নিজের প্রাণ বিপন্ন করে। সর্বমানবসত্তা পরস্পর যোগযুক্ত এই ভাবনা মানুষের পরমার্থ চিন্তার অংশ। অর্থাৎ সমস্ত জীবজগতের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগ, করুণা, নিঃস্বার্থপরতা, পরহিতব্রত কাজ এবং নিজের জীবনের প্রশান্তিকে অধ্যাত্মবাদের বৈশিষ্ট্য বলা যায়। অশান্তি, অসন্তোষ এবং বাস্তব জীবনের বিড়ম্বনা মানুষকে আধ্যাত্মিকতায় উৎসাহী করে। দেহ ও আত্মার শান্তি পাওয়ার জন্য মানুষের অদম্য চেষ্টা অতীতকাল থেকে। বর্তমান বিশ্বে আধ্যাত্মিকতার অনুধ্যান ও অনুশীলন এবং পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মভাবনা তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষকে হতাশা থেকে মুক্তি দিচ্ছে আধ্যাত্মিকতা, তার বিষণ্ণতা দূর হচ্ছে, শরীর ঠিক থাকচ্ছে। ধূমপান, মদ্যপানের মতো খারাপ অভ্যাস থেকে মানুষ মুক্ত থাকতে পারছে। ঈশ্বর ও মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা তথা ঈশ্বর বিশ্বাস, আচরণ এবং চর্চা প্রশান্তির সূত্র। বিশ্বাস, আশা, ক্ষমা, অন্যের জন্য চিন্তা করা, প্রার্থনা এর সবই সুস্বাস্থ্যের জন্য অনিবার্য।

রবীন্দ্র-আধ্যাত্মিকতার মূলে আছে বিশ্ব নিয়ন্ততার প্রতি বিশ্বাস। বিশ্বাস মানুষকে অনেক বাস্তব চাপ থেকে মুক্ত করে। তিনি বলেছেন, তাঁর পরিবারের কর্মসাধনা ছিল ভাবসাধনার নামান্তর। উপনিষদ এবং পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অভিজ্ঞতা, ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা রামমোহন রায় এবং আরও অনেকের সাধনা ছিল তাঁর পরিবারের সাধনা। পিতার কনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে জাতকর্ম থেকে আরম্ভ করে তাঁর সব সংস্কারই ব্রাহ্মমতের সঙ্গে মিলিয়ে বৈদিক মন্ত্রের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাল্যকালে স্কুল পালিয়েছেন। বলেছেন যে অভ্যাস বাইরে থেকে চাপানো তা তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর পিতা কখনো এ নিয়ে ভর্ৎসনা করেননি। কারণ দেবেন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর পিতার সংস্কার ত্যাগ করেছিলেন। পিতার মতো বিলাস-ব্যসনে লিপ্ত হননি। এ জন্য রবীন্দ্রনাথের গভীরতর জীবনতত্ত্ব সম্বন্ধে চিন্তা করার স্বাধীনতা ছিল। বাল্যকালে তিনি উপনিষদের অনেক অংশ বারবার আবৃত্তি করে কণ্ঠস্থ করেছেন কিন্তু সবকিছু গ্রহণ করতে পারেননি। উপনয়নের (পইতে ধারণের অনুষ্ঠান) সময় থেকে গায়ত্রী মন্ত্র আবৃত্তি ও আত্মস্থ করেছেন। তিনি পিতার কাছে গায়ত্রীমন্ত্রের ধ্যানের অর্থ পেয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায় বিশ্বাস ও উপলব্ধির সত্য নিুরূপ। চৈতন্য ও বিশ্বকে একীভূত করে দেখা এবং জগৎ ও মানুষ উভয় উভয়ের পরিপূরক এই ভাবনা রয়েছে এখানে।

‘তখন আমার বয়স বারো বছর হবে। এই মন্ত্র চিন্তা করতে করতে মনে হত, বিশ্বভুবনের অস্তিত্ব আর আমার অস্তিত্ব একাত্মক। ভূর্ভুবঃ স্বঃ- এই ভূলোক, অন্তরীক্ষ, আমি তারই সঙ্গে অখণ্ড। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি-অন্তে যিনি আছেন তিনিই আমাদের মনে চৈতন্য প্রেরণ করছেন। চৈতন্য ও বিশ্ব; বাহির ও অন্তরে সৃষ্টির এই দুই ধারা এক ধারায় মিলছে।

এমনি করে ধ্যানের দ্বারা যাঁকে উপলব্ধি করছি, তিনি বিশ্বাত্মাতে আমার আত্মাতে চৈতন্যের যোগে যুক্ত। এইরকম চিন্তার আনন্দে আমার মনের মধ্যে একটা জ্যোতি এনে দিলে। এ আমার সুস্পষ্ট মনে আছে।’ (মানবসত্য)

এই যে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া এবং এই অভিজ্ঞতা থেকে কাব্য সৃষ্টি তাকেও রবীন্দ্রনাথ আধ্যাত্মিকতা বলেছেন। ‘সেই সময়ে এই আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা যাকে আধ্যাত্মিকতা নাম দেওয়া যেতে পারে। ঠিক সেই সময়ে বা তার অব্যবহিত পরে, যে ভাবে আমাকে আবিষ্ট করেছিল তার স্পষ্ট ছবি দেখা যায় আমার সেই সময়কার কবিতাতে— প্রভাত সংগীতের মধ্যে।’ প্রত্যুষের উদিত সূর্যের আলোকধারায় ব্যাকুল করা মনের আবেগ কবিকে দিয়ে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ লিখিয়ে নিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্যের প্রকাশে ও মানবের বিচিত্র লীলা-আনন্দ কবিকে অনির্বচনীয় আস্বাদ এনে দিয়েছিল। এই আত্মদর্শন কিংবা বিশ্বের আনন্দরূপকে দেখা কবির উপনিষদীয় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত।

রবীন্দ্রনাথ আপন সত্তার মধ্যে প্রাত্যহিক উপলব্ধির বাইরে আরও একটি অনুধ্যান খুঁজে পেয়েছিলেন। ‘পরমপুরুষ’ সেই আপন সত্তার উপলব্ধির অন্য দিক; যা জীবনদেবতা শ্রেণির কাব্যের মূল উপজীব্য। আপন অহং ভুলে সত্যকে আবিষ্কার করার প্রত্যয় এখানে মুখ্য। একদিকে বিশ্বদেবতা যাঁর আসন লোকে লোকে, গ্রহচন্দ্র-তারায়; অন্যদিকে জীবনদেবতা যাঁর পীঠস্থান জীবনের আসনে, সকল অনুভূতির সকল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। বাউল তাঁকেই বলেছে ‘মনের মানুষ’। মহানপুরুষ বা নিখিল মানুষের আত্মা কিংবা জীবনদেবতাকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করতে হবে। নিজেকে ত্যাগ না করে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করার মধ্যে পরমার্থ জ্ঞান প্রকাশিত হয়। এ জন্য তিনি বলেছেন :

‘এক সময় বসে বসে প্রাচীন মন্ত্রগুলিকে নিয়ে ঐ আত্মবিলয়ের ভাবেই ধ্যান করেছিলুম। পালাবার ইচ্ছে করেছি, শান্তি পাইনি তা নয়। বিক্ষোভের থেকে সহজেই নিষ্কৃতি পাওয়া যেত। এভাবে দুঃখের সময় সান্ত্বনা পেয়েছি। প্রলোভনের হাত থেকে এমনিভাবে উদ্ধার পেয়েছি। আবার এমন একদিন এল যেদিন সমস্তকে স্বীকার করলুম, সবকে গ্রহণ করলুম। দেখলুম, মানব নাট্যমঞ্চের মাঝখানে যে লীলা তার অংশের অংশ আমি। সব জড়িয়ে দেখলুম সকলকে। এই- যে দেখা এ’কে ছোট বলব না। এও সত্য। জীবনদেবতার সঙ্গে জীবনকে পৃথক করে দেখলেই দুঃখ, মিলিয়ে দেখলেই মুক্তি।’ (মানবসত্য)

রবীন্দ্রনাথের মতে আমাদের বিষয়বুদ্ধির ঘেরাটোপের জীবন হচ্ছে বৈষয়িকতার জীবন। এর বাইরে আরেকটি জীবন আছে যা সাধনার, ত্যাগের ও তপস্যার। সেই জীবন প্রণালিতে ক্ষতির হিসাবকে আমরা লাভ বলি; মৃত্যুকে অমরতা। সেখানে বর্তমানকালের বস্তু সংগ্রহের চেয়ে অনিশ্চিত কালের উদ্দেশে আত্মত্যাগ করার মূল্য বেশি। সেখানে জ্ঞান উপস্থিত প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে যায়, কর্ম স্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপন স্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে যে বড় জীবন সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়। কবির মতে একে মানুষের ধর্ম বা মনুষ্যত্ব বলা হয়। আমাদের মতে, এই জীবন আধ্যাত্মিক জীবন। এই জীবনের অন্বেষণ হলো এক সর্বজনীন সর্বকালীন মানুষের অন্বেষণ। সেই পরম পুরুষের আকর্ষণে মানুষের চিন্তায়, ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব। তাঁকে অনুভব করা, তাঁর প্রেমে সহজে জীবন উৎসর্গ করা এবং সেই উপলব্ধিতে আপন জীবসীমা অতিক্রম করে মানবসীমায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা।[ক্রমশ]

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev