ছয়.
জীবনীর সংক্ষিপ্ত রূপরেখা থেকে আমরা দেখতে পেয়েছি রবীন্দ্রনাথকে অনেক বেদনা বহন করতে হয়েছে; মৃত্যুশোক ও দুঃখের পীড়নে পীড়িত হতে হয়েছে। নিদারুণ শোকাঘাতে তিনি স্তব্ধ হয়েছেন। শোকাঘাতের কষ্ট দূর করার জন্য শান্তিনিকেতনের মন্দির-তোরণে ভোরের আলো-অন্ধকারে কবি ধ্যানে বসতেন। তবে শোকাঘাতে উজ্জ্বল হয়েছে কবির পরিপূর্ণ আধ্যাত্মিক জীবন। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “নৈবেদ্যের দেবতা দূরে থাকিয়া পূজার্ঘ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন, ‘খেয়ার নেয়ে’ আলোছায়ার রহস্যলোকে অস্পষ্টভাবে ক্ষণে ক্ষণে দেখা দিয়াছেন, আর গীতাঞ্জলির দেবতা ভক্তের সম্মুখে আসীন। শান্তিনিকেতনের ধ্যানলব্ধ সাধনার মধ্যে গীতাঞ্জলির রসানুভূতির প্রতিষ্ঠা। কবির এই রসের ধর্ম গীতাঞ্জলি গীতিমাল্য ও গীতালিতে স্তরে স্তরে গভীর হইতে গভীরে গিয়া পূর্ণতা লাভ করিয়াছে।” (রবীন্দ্রজীবনী ২য় খণ্ড, পৃ. ২৪৫)
স্মরণীয়, কবির আধ্যাত্মিক আকুতি কেবল প্রবন্ধ ও গীতধারায় নতুনরূপ পরিগ্রহ করেনি তা ‘শারদোৎসব, অচলায়তন, রাজা, ডাকঘর’ নাটকে রূপায়িত। প্রতীকী নাটকে কবির আধ্যাত্মিক সংগ্রামের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। কবির আধ্যাত্মিক সাধনা সম্পর্কে রবীন্দ্রজীবনীকার বলেছেন, ‘তাঁহার আধ্যাত্মিক সাধনা বেদ ও ব্রাত্যকে লইয়া পরিপূর্ণ। তিনি সংস্কৃতির দুই চরম কোটিকে জ্ঞান ও প্রেমের দ্বারা আপনার মধ্যে অর্থপূর্ণ করিয়া নবীন ধারায় নূতন দর্শনতত্ত্বের বুনিয়াদ করিয়াছেন।’ (পৃ. ৪৬৫) কবির অধ্যাত্মচেতনা ও তার সার্বজনীন রূপ সম্পর্কে আলোচনায় কয়েকটি প্রসঙ্গ এখানে তুলে ধরা হলো।
ক) আত্মা : আধ্যাত্মিকতা বিবেচনায় ‘আত্মা’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান থেকে বিরত থেকেছেন। তাঁর মতে ‘আত্মা’ অমর। মরণধর্মী অহং বা আমিত্বের মধ্য দিয়ে আত্মার প্রবাহ ও প্রকাশ হয়। ‘আত্মার পরাজয় নাই, ক্ষয় নাই, বিনাশ নাই, মৃত্যু নাই’ মানুষের ধর্ম গ্রন্থের এই বাক্য ভারতীয় অধ্যাত্মসাধনার মহান বাণী। অন্যদিকে ‘আত্মার দৃষ্টি’ রচনায় কবি বলেছেন, ‘আমাদের চেতনা আমাদের আত্মা যখন সর্বত্র প্রসারিত হয় তখন জগতের সমস্ত সত্তাকে আমাদের সত্তার দ্বারাই অনুভব করি, ইন্দ্রিয়ের দ্বারা নয়, বুদ্ধির দ্বারা নয়, বৈজ্ঞানিক যুক্তির দ্বারা নয়। সেই পরিপূর্ণ অনুভূতি একটি আশ্চর্য ব্যাপার।’
এখানে তিনি চেতনা ও আত্মাকে এক করে দেখেছেন। তবে আধ্যাত্মিকতায় সর্বত্রই আত্মা প্রসারিত হওয়ার অন্তরায় আছে। অন্তরের পাপ, বাইরের অভ্যাস ও অতীতের সংস্কার মুক্ত না হলে সর্বত্রই আত্মার সঙ্গে যুক্ত হতে ব্যর্থ হবেন যে কেউ। আত্মাকে সর্বত্র উপলব্ধি হচ্ছে মনের জাগ্রত অবস্থা। আত্মাকে বিশ্বকর্মা বা বিরাটপুরুষের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কবির মতে আত্মা পরমাত্মা পরম মিলনে বিশ্বজগৎ সম্মিলিত। তখন স্বার্থবিহীন করুণা, ঔদ্ধত্যবিহীন ক্ষমা, অহংকারবিহীন প্রেম- তখন জ্ঞানভক্তিকর্মে বিচ্ছেদবিহীন পরিপূর্ণতা। এই ব্যক্তিগত ইচ্ছা বিশ্বমানবের ইচ্ছার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে একধর্মী হওয়ার অবস্থাকে বলা যেতে পারে ধর্মসাধনার সাত্ত্বিক অবস্থা বা আধ্যাত্মিকতা।
আত্মার ধারণার সঙ্গে ‘সোহহম তত্ত্ব’ জড়িত। নিখিলের সঙ্গে মানুষের মনের বা আত্মার যে যোগ বা বিশ্বানুভূতি তাই ‘সোহহম তত্ত্ব’। কবির ‘সোহহমবাদ’ জীবনমরণের সীমানা ছাড়িয়ে পরিব্যাপ্ত। তাঁর মতে ‘সোহহম’ সমস্ত মানুষের সম্মিলিত অভিপ্রায় মন্ত্র। এই বোধ তখনই সার্থক যখন তা সর্বমানবের ভাবনায় ও ধ্যানে সিদ্ধ। পাপের বাধাকে অতিক্রম করে, দুঃখ ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের আত্মার সাধনাকে অগ্রসর করাতে হবে। তা ছাড়া ‘আত্মাতে পরমাত্মাকে দর্শন’ — উপনিষদের এই ভাব রবীন্দ্রনাথের চেতনায় সক্রিয় ছিল।
মৃত্যুতে আত্মার যথার্থ মূর্তি প্রকাশিত হয় সে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৯১০ সালে শান্তিনিকেতন বিদ্যায়তনের ছাত্র সরোজচন্দ্রের মৃত্যুর পরে স্মরণ সভার ভাষণে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুতে তাঁহার আত্মাকে কত বিরাট বিপুলভাবে দেখিতেছ, তাই মৃত্যু আলোকময়।’ মৃত্যুকে তিনি কবিতায় বলেছেন, ‘ওরে মৃত্যু জানি তুই যুগে যুগে উড়াইয়া আপনার/ দৃঢ় পক্ষভাব।’ (মৃত্যু) গতিশীল মৃত্যু আমাদের অধ্যাত্ম ভাবনাকে তীব্র করে তোলে। আমরা আরও সমর্পিত হই ঈশ্বরের চরণে।
খ) ব্রহ্ম : উপনিষদের ব্রহ্মই কবির ব্রহ্ম। তিনি ‘ধর্মের সরল আদর্শে’ লিখেছেন, ‘তিনি অন্তরে বাইরে সর্বত্র; তিনি অন্তরতম, তিনি সুদূরতম। তাঁহার সত্যে আমরা সত্য, তাঁহার আনন্দে আমরা ব্যক্ত।’ মূলত আমরা সর্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে জগৎকে পাই। বিশ্বজোড়া বিচিত্র শব্দ ও সুরের মধ্য দিয়ে সর্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে বিশ্বের সর্ব উপাদানকে উপভোগ করা কবির ধর্ম। বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে যোগযুক্ত থেকে ঐক্যানুভূতি করতে হয়। ‘দ্রষ্টা’ প্রবন্ধে কবি বলেছেন, ‘এই বিশ্বসংসারে এমন কিছুই নেই, একটি কণাও নেই, যার মধ্যে পরমাত্মা ওতপ্রোত হয়ে না রয়েছেন।’ এই ব্রহ্মময় সর্বজগতের কথা তাঁর আধ্যাত্মিকতার বিশিষ্ট রূপ। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতিতে শক্তির দ্বারা পরমাত্মা নিজেকে প্রচার করছেন আর প্রেমের দ্বারা জীবাত্মায় তিনি নিজেকে দান করছেন।’ (প্রকৃতি) প্রাকৃতিক ক্ষেত্রে যা শক্তি ও নিয়ম, আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তা ভক্তি ও লীলা বা আনন্দ। এই প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিকতার সামঞ্জস্য চেয়েছেন কবি। উপরন্তু প্রকৃতির পরমাশ্চর্য রহস্যকেও মেনে নিতে হবে। বিশ্বপ্রকৃতি ও অন্তরপ্রকৃতির নিয়মের মিলন হলে শান্তি জন্মে মানব হৃদয়ে। আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে সজাগ থাকতে হবে এভাবে, ‘আমাদের আধ্যাত্মিক জীবন লাভের প্রধান অন্তরায় হইতেছে যে আমরা প্রতিদিনের তুচ্ছ ব্যবহারকে অগ্রাহ্য করি; কিন্তু ছোটখাটো বিষয়ও ধর্মসাধনায় তাচ্ছিল্যের ব্যাপার নহে; প্রকৃতির সঙ্গে এবং মানুষের ব্যবহারে প্রত্যহ ছোটখাটো কত অসত্য অন্যায়ই আমরা করি, সেদিকে দৃষ্টি না গেলে সত্যসাধনা সম্পূর্ণ হয় না। যে ব্যক্তি নির্বিশেষের ধ্যানে অধ্যাত্মজীবন লাভের প্রয়াসী তাহাকে দৃশ্যমান শব্দায়মান বিশ্বচরাচরের বৈশিষ্ট্য ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সম্ভোগ করিতেই হইবে নতুবা তাহার সাধনা অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে।’ (রবীন্দ্রজীবনী, পৃ. ২৫২)
গ) ঈশ্বরভাবনা : রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ব্রাহ্মসমাজের নন, কোনো বিশেষ ধর্মগোষ্ঠীর নন, তিনি উপনিষদের উদার আকাশে স্বমহিমায় প্রকাশমান। তিনি ঈশ্বরকে প্রেম সম্পর্কের মধ্যে দেখেছেন। ঈশ্বরকে পিতার মূর্তিতে দেখাও ব্রাহ্মধর্মের ওপর খ্রিস্টধর্মের প্রভাবের কারণ। আবার ঈশ্বরকে পিতৃকল্পনার মূলে বৈদিক মন্ত্রের প্রভাবও আছে, ‘পিতা নোহসি, পিতা নো বোধি নমস্তেহস্ত’। তবে তিনি ঈশ্বরকে ‘মা’ বলেও ডাকতে চেয়েছেন। কারণ পিতা-মাতার স্নেহ সন্তানকে জীবনক্ষেত্রে বিচরণে উপযোগী করে তোলে। ‘বিশ্বপিতা’র ভাবনা থেকেই কবির এই বিশ্বাস জাগ্রত হয়েছে।
ঈশ্বর ও প্রকৃতিকে তিনি একাত্ম করেছেন। কবির ঈশ্বর মানুষের চোখ দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতির চিত্ররাশি দেখে নিয়েছেন। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই অমৃতের পাত্র পূর্ণ করে দিয়ে ঈশ্বর পান করেন নিজেরই সৃষ্টির আনন্দ। কারণ তাঁর সৃষ্ট এই মানুষের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় ঈশ্বরের সব বিচিত্রবাণী। ঈশ্বর মানুষের মধ্যে নিজেকে দান করে নিজেকেই মধুর আনন্দে অবলোকন করে চলেছেন অনন্তকাল। কবির ভাষায় : —
হে মোর দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ
কী অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান।
আমার চিত্তে তোমার সৃষ্টিখানি
রচিয়া তুলিছে বিচিত্র এক বাণী।
তারি সাথে প্রভু মিলিয়া তোমার প্রীতি
জাগায়ে তুলিছে আমার সকল গীতি,
আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে
আমার মাঝারে নিজেরে করিয়া দান।
ঈশ্বর, ভগবান, জীবননাথ একাকার রবীন্দ্র রচনায়। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও আনন্দ উপলব্ধির মধ্যে আছে ভগবানের অমৃতরসের আস্বাদন। কবির ভাষায় : —
‘জীবনে আমার যতো আনন্দ
পেয়েছি দিবসরাত
সবার মাঝারে তোমারে আজিকে
স্মরিব জীবননাথ।…
বার বার তুমি আপনার হাতে
স্বাদে গন্ধে ও গানে
বাহির হইতে পরশ করেছ
অন্তর মাঝখানে।
পিতামাতা ভ্রাতা প্রিয় পরিবার
মিত্র আমার পুত্র আমার
সকলের সাথে হৃদয়ে প্রবেশি
তুমি আছ মোর সাথ।
সব অনন্দ-মাঝারে তোমারে
স্মরিব জীবননাথ।’ (নৈবেদ্য,৭)
[ক্রমশ]
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com