ড) দেবতাভাবনা : কবির দেবতাভাবনায় মর্ত্যজীবন অঙ্গীভূত হয়েছে। বলাকার ২৪ সংখ্যক কবিতায় কবি জীবনবাদী। বলেছেন, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়।’ কিংবা ‘ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করি যোগাসন সে নহে আমার।’ তবে কবি সংসার বিমুখ নন। মায়াবাদী, মুক্তিবাদীও নন। মর্ত্যপ্রীতি তাঁর মজ্জাগত। জীবনের ধ্যানমন্ত্রই তাঁর আরাধ্য দেবতা। ‘কবির আরাধ্য দেবতা তত্ত্বোপলব্ধির দিক থেকে তিনি হচ্ছেন ‘সর্বজনীন সর্বকালীন মহামানব,’ আর অনুভূতির দিক থেকে তার প্রকাশ বিচিত্র, কবি তাই বিচিত্র নামে তাকে অভিহিত করেছেন। কখনো তিনি ‘মানসী’, ‘মানস-সুন্দরী’, ‘লীলাসঙ্গিনী’, আবার কখনো বা ‘প্রভু’, ‘প্রিয়’, ‘অন্তর্যামী’, ‘জীবননাথ’ ইত্যাদি। এককথায় বলা যেতে পারে তিনি কবির ‘জীবনদেবতা’। এই জীবনদেবতার সঙ্গেই তার সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা মিলন-বিরহের বিচিত্র সম্পর্ক বা রসের সম্পর্ক। তিনি কবির প্রেমিকও বটেন, আবার তাঁর জীবনের অধীশ্বরও বটেন।’(মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথের ধর্ম, পৃ. ২১৬)
ঢ) সংগীত ও আধ্যাত্মিকতা : রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা বিবেচনায় সংগীতের গুরুত্ব সকলেই স্বীকার করেছেন। তাঁর অনেক গান আমাদের(খ্রিস্টীয়) উপাসনালয়ে গীত হয়। ‘গীতবিতানে’র পূজাপর্যায় গানের সংখ্যা ৬১৭। এসব গানে অভিব্যক্ত হয়েছে কবির ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, সৌন্দর্য চেতনা ও আত্মনিবেদনের আকুতি। যেমন একটি গান, ‘তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি/ গানের সুরে।’ অথবা ‘গানের ভেতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি/ তখন তারে চিনি আমি তখন তারে জানি।’ গানের ভেতর আছে হৃদয়ের সকল দৈন্য ঢেলে দেবার প্রেরণা, ঈশ্বরকে ভালোবাসার জোয়ারে আবগাহন করার আর্তি, অন্তর্যামীর অপ্রত্যাশিত দানের জন্য তাঁর চরণ স্পর্শ করে থাকার আকাঙ্ক্ষা। সরল, মর্মস্পর্শী অন্তর্যামীর প্রতি নিবেদিত এরকম পঙ্ক্তিমালা হলো :
‘সংসার যবে মন কেড়ে লয় জাগেনা যখন প্রাণ
তখন হে নাথ প্রণমি তোমায় গাহি বসে তব গান।
অন্তরযামী ক্ষমো সে আমার শূন্য প্রাণের বৃথা উপহার
পুষ্পবিহীন পূজার আয়োজন ভক্তিবিহীন তান।
ডাকি তব নাম শুষ্ক কণ্ঠে আশা করি প্রাণপণে
নিবিড় প্রেমের সরস বরষা যদি নেমে আসে মনে
সহসা একদা আপনা হইতে ভার দিবে তুমি তোমার অমৃতে
এই ভরসায় করি পদতলে শুষ্ক হৃদয় দান।’
শান্তিনিকেতনের মন্দিরে প্রত্যুষ ও সান্ধ্য উপাসনায় অনেকগুলো গান গাওয়া হতো। এমনকি পৌষোৎসবের উদ্বোধনের সময় কবির উপাসনার পর আশ্রম বিদ্যালয়ের বালকরা কবির গান গাইত। একটি বর্ণনা, ‘প্রথম সংগীতের পর এবং স্বাধ্যায়ের সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁহার ব্রহ্মসংগীতাবলী হইতে একটি গান গাহিলেন। সংগীতটি যেন উৎসব-উৎসকে একেবারে খুলিয়া দিল। ইহার পর আশ্রমের বালকবৃন্দ কয়েকটি মনোরম সংগীত গান করিলেন। সেগুলি সমস্তই ঐ ভক্ত কবির নব-রচিত।’ (রবিজীবনী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৮৬-৮৭) এর ভেতর ‘গীতাঞ্জলি’র অনেকগুলো গান ছিল। ‘গীতাঞ্জলি’র ভুবন প্রভুময় ভুবন, ঐশ্বরিক বোধ তার আদ্যন্ত ছড়ানো। মূলত ভারতবর্ষে মধ্যযুগে কবীর, দাদু, মীরাবাই গানের মধ্য দিয়ে অধ্যাত্মসাধনার গভীর তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারার শ্রেষ্ঠ শিল্পী।
এ ছাড়া ‘সামাজিক সম্পর্ক’ অধ্যাত্মচেতনার গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরিবার ও বন্ধুত্ব একজন ব্যক্তির নিজের আবেগকে সকলের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়। অসুস্থ মুহূর্তে অপরের ভালোবাসা চিন্তামুক্ত রাখতে সহায়তা করে। এটিও আধ্যাত্মিকতার সোপান। রবীন্দ্রনাথ কখনো নেতিবাচক বা হতাশাগ্রস্ত মানুষের প্রতিমূর্তি ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, মানুষের ইতিবাচক জীবনাচরণের জন্য ‘আশা’ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আলো ও আশার প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা বারবার বলেছেন। এ ক্ষেত্রে ‘ক্ষমা’ ছিল তাঁর মুখ্য অবলম্বন। ক্ষমা নিজেকে শত্রুমুক্ত রাখতে সহায়তা করে। অতীত আঘাতের অপমানবোধ বা অসন্তুষ্টি থেকে মুক্ত রাখে। ক্ষমা করলে নিজের রাগ কমে আসে, মানসিক চাপ কমে। তাই কবি ক্ষমাকে তাঁর জীবনের সঙ্গে একাত্ম করে নিয়েছিলেন। অবশ্য আধ্যাত্মিক জীবনের দুটি বাধার কথাও বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বাসের অভাব অর্থাৎ চিত্তের অবিচলিত ভরসার অভাব। আর সাধনার অনভ্যাস বা নিষ্ঠার অভাব। এ দুটি থেকে মুক্ত হলে প্রকৃত অধ্যাত্ম জীবন সম্ভব।
আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে মানুষের চাওয়া কী? এর ফলে মানুষ কি শুচি হয়ে ওঠে? তার অভীষ্ট দেবতা কিংবা ঈশ্বর প্রাপ্তি ঘটে কি? আসলে যিনি ব্রহ্ম, যিনি সকলের বড় তাকেই মানুষের সামনে লক্ষরূপে স্থাপন করলে মানুষের মন তাতে সায় দিতে পারে। দুঃখনিবৃত্তি অধ্যাত্মজীবনের পরম লক্ষ নয়। বরং বড় হওয়ার ইচ্ছা, মহৎ হওয়ার ইচ্ছাই আধ্যাত্মিকতা সম্ভব করতে পারে। ধর্মসাধনা করলে হৃদয় কোমল হয়, চারিত্রিক তীব্রতা মাধুর্যে পরিণত হয়। ধর্মসাধনার অন্তরালে সুন্দর লুকিয়ে থাকে। তাকে আবিষ্কার করতে হলে ধ্যান, উপাসনা, প্রার্থনা দরকার। এসবই রবীন্দ্রনাথের চেতনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
কবির আধ্যাত্মিক সাধনা সর্বজনীন হয়ে উঠেছে হিন্দু সমাজের লোকাচার ও ধর্মসংস্কার ত্যাগের মধ্যে দিয়ে। ১৮৯১ সালের ২২ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে মন্দির বা মঠের প্রতিষ্ঠা হয়। নতুন মন্দির তথা ব্রহ্মমন্দিরের দ্বার জাতি ধর্ম অবস্থা নির্বিশেষ সকল শ্রেণির ও সকল সম্প্রদায়ের মানুষের ব্রহ্মোপাসনার জন্য উন্মুক্ত হয়। নিরাকার এক ব্রহ্মের উপাসনা করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলো। সেখানে কোনো বিশেষ প্রতিমা ছিল না; কোনো দেবতার চিত্রও নয়। সেখানে অন্যের ধর্ম বা অন্যের দেবতার নিন্দা নিষিদ্ধ হয়। ফলে ঈশ্বরের পূজা ও নীতিধর্ম এবং সার্বজনীন ভ্রাতৃভাব বর্ধিত হতে থাকে শান্তিনিকেতন থেকে। এই শান্তিনিকেতনই কবির ধর্মসাধনা ও কর্মজীবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
সাত.
মানবিক সত্য ও আস্তিক্যবাদ রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মবাদের সারকথা। জগৎ ও জীবন তাঁর কাছে রূপাতীত, লোকাতীত, অনন্ত দেশকালব্যাপী এক মহান আনন্দশক্তির প্রকাশ। সুন্দর, মহনীয়, অপরূপ ও অনির্বচনীয় সবকিছু কবির আরাধ্য। তিনি সবকিছুর ভেতর ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করেছেন। এটিই তাঁর বড় আধ্যাত্মিকতা।
জাতি, বর্ণ, বংশ, ভাষা জনতার মধ্যে বিভেদকে মানেননি রবীন্দ্রনাথ। সমস্ত বিশ্বকে এক পরিবার মনে করা, দেবতাজ্ঞানে পূজা করা সার্বজনীনতা। সব ধর্মই সত্য। অন্যের ধর্ম আমার নিজের ধর্মের মতোই প্রিয়। মানুষে ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীর সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ থাকবে না। তবেই না সার্বজনীন চেতনার প্রসার ঘটবে। হৃদয়ের শুদ্ধতা, সহিষ্ণুতা, করুণা ও দয়ার মাধ্যমে জীবনকে দেখতে হবে। আধ্যাত্মিকতার ভেতরে যে সত্য আছে তা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিপোষক নয়। সকলেই ঈশ্বরের সন্তান। ঈশ্বর পরম। একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়।
পূর্বেই বলা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজভুক্ত হলেও তাঁর আধ্যাত্মিকতার উপলব্ধি সেই গণ্ডির বাইরে ছিল। ১৩১৫ সালে শান্তিনিকেতনে মাঘোৎসবের ভাষণে তিনি ‘ব্রাহ্মোৎসব’কে ‘ব্রহ্মোৎসব’ আখ্যা দান করেন। কোনো সম্প্রদায়ের উৎসব না হয়ে মানবসমাজের উৎসব হয়ে ওঠে তা। বিশেষ ধর্মের মধ্যে সীমায়িত ছিল না তাঁর আধ্যাত্মিকতা। ধর্মসমন্বয় ও জাতিসমন্বয়ের কথাই বারবার উচ্চারিত হয়েছে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে।
শান্তিনিকেতনের মন্দিরে কবি যিশু খ্রিস্ট, চৈতন্য সম্পর্কে ভাষণ দিয়েছিলেন। গৌতম বুদ্ধ ও হজরত মুহম্মদের (সা.) স্মরণদিন পালন করা শুরু করেছিলেন। ধর্মসম্পর্কে কবির উপনিষদের জ্ঞান পূর্ণতা পায় মধ্যযুগীয় সাধু-সন্তদের জীবনীর আলোকে। ভারতের ধর্মসাধনার ধারা বহন করেছেন তিনি। রবীন্দ্রজীবনী রচয়িতা প্রভাতকুমার বলেছেন, ‘তাঁর ধর্ম মানবতার ধর্ম-কর্মে কঠোর, জ্ঞানে উজ্জ্বল, ভক্তিতে রসাপ্লুত, সৌন্দর্যে সমন্বিত।’(পৃ. ২৬৭) প্রবোধচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা সম্পর্কে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সেই ধর্মকেই চেয়েছিলেন যাতে জ্ঞান প্রেম ও কর্ম মিলিত হয়েছে, যাতে উপনিষদের সত্যসাধনা, বৌদ্ধধর্মের মৈত্রী-করুণা এবং বৈষ্ণব ও খ্রিস্টধর্মের প্রেমভক্তি একত্র সমন্বিত হয়েছে, অথচ যা সর্বতোভাবেই আধুনিক শিক্ষিত মনের উপযোগী। সে মন একান্তভাবেই সাম্প্রদায়িক ভেদবিভেদ, আচারপদ্ধতি ও আনুষ্ঠানিকতার বিরোধী।’
মূলত মানুষের ইন্দ্রিয় মন ও আত্মার পরিপূর্ণবিকাশ ধর্মজীবনের আদর্শ। রবীন্দ্রনাথের ধর্মজীবন বা আধ্যাত্মিকতা ছিল সেই আদর্শের চূড়ান্ত নিদর্শন। ‘গীতালি’র প্রথম গানটি স্মরণ করুন : —
‘এতদিনে জানলেম
যে কাঁদন কাঁদলেম
সে কাহার জন্য।
ধন্য এ জাগরণ,
ধন্য এ ক্রন্দন,
ধন্য রে ধন্য।’
কবির এই উপলব্ধিরই অন্য নাম আধ্যাত্মিকতা।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com