‘আধ্যাত্মিক সাধনা কখনোই রূপের সাধনা হইতে পারে না। তাহা সমস্ত রূপের ভিতর দিয়া চঞ্চল রূপের বন্ধন অতিক্রম করিয়া ধ্রুব সত্যের দিকে চলিতে চেষ্টা করে। ইন্দ্রিয়গোচর যে কোনো বস্তু আপনাকেই চরম বলিয়া স্বতন্ত্র বলিয়া ভান করিতেছে, সাধক তাহার সেই ভানের আবরণ ভেদ করিয়া পরম পদার্থকে দেখিতে চায়।’ (রূপ ও অরূপ)
‘আধ্যাত্মিকতায় আমাদের আর কিছু দেয় না, আমাদের ঔদাসীন্য আমাদের অসাড়তা ঘুচিয়ে দেয়। অর্থাৎ তখনই আমরা চেতনার দ্বারা চেতনাকে, আত্মার দ্বারা আত্মাকে পাই। সেই রকম করে যখন পাই তখন আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে সমস্তই তাঁর আনন্দরূপ।’ (শান্তিনিকেতন)
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ‘আধ্যাত্মিক সাধনা’ অরূপের সাধনা; সাধকরা বস্তু পৃথিবীর বাইরে অতীন্দ্রিয় জগতের অনুসন্ধান করেন সেই সাধনায়। ‘আধ্যাত্মিকতা’ আমাদের চেতনাকে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এর মাধ্যমে তাঁর আনন্দরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসী কিংবা সাধক ছিলেন না। তিনি সুফিধারাসহ অন্য মরমিয়াদের মতো অধ্যাত্মসাধনায় নিমগ্নও হননি। তিনি ছিলেন কবি। তবে তাঁর সমগ্র চেতনার মধ্যে একটা নিগূঢ় অধ্যাত্ম-অনুভূতি ছিল— সেই অনুভূতিই তাঁর শিল্পচেতনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কাব্যরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁর খেয়া-গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য-গীতালি কাব্য এবং অন্যান্য রচনায় অধ্যাত্মচেতনা প্রকাশিত হয়েছে। কবির অধ্যাত্মসাধনা নিঃসন্দেহে সার্বজনীনচেতনা দ্বারা পরিশুদ্ধ। তাঁর বিশ্বাসগুলো পৃথিবীর মানুষের জন্য কতটুকু জরুরি? তাঁর আধ্যাত্মিকতায় মানবতার জন্য যে কাতরতা তা সর্বযুগের সর্ব মানুষের হয়ে উঠেছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ করলে কবির আধ্যাত্মিক চেতনার সর্বজনীন রূপ আবিষ্কার করা সম্ভব। তার আগে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের জীবনীর কিছু দিক সম্পর্কে বলে নেওয়া দরকার।
দুই.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ মে ১৮৬১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রয়াত হন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট একই শহরে। দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনে পরিচিত হয়েছেন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যাত্মবাদী, দার্শনিক, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাগ্মী, গীতিকার-সুরকার, সংগীতশিল্পী, সমাজ সংস্কারক, পল্লী উন্নয়ন কর্মী হিসেবে। তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে নবজন্ম দান করেছেন। কলকাতার পিরালি ব্রাহ্মণের সন্তান কিন্তু ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অনুকূলে।
জীবিত তেরো সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন ‘রবি’। পিতামাতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) ও সারদা দেবী (১৮৩০-১৮৭৫)। ঠাকুর পরিবার ছিল উনিশ শতকে কলকাতার ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বাল্যে মাকে হারানোর পর রবিকে বাড়ির গৃহকর্মীদের কাছে মানুষ হতে হয়। তাঁর পিতা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে বেড়াতেন। পিতার মতোই ক্লাসরুমের বাঁধাধরা পড়ার পরিবর্তে তিনি ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন। বোলপুর, পানিহাটি এবং অন্যান্য জায়গায় তাঁর বিচরণ ছিল। এগারো বছর বয়সে উপনয়নের পরে তাঁর পিতার সঙ্গে কয়েক মাসের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ থেকে ভারত ভ্রমণে বের হন। এ সময় তিনি পিতার শান্তিনিকেতন এস্টেট পরিদর্শন করেন।
ব্যারিস্টার হওয়ার আশায় রবীন্দ্রনাথ লন্ডনের ব্রাইটনে অধ্যয়ন শুরু করেন ১৮৭৮ সালে। কিন্তু ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আইন শাস্ত্র অধ্যয়ন অসমাপ্ত রেখে বরং শেক্সপিয়রসহ ইংরেজ কবিদের সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করে ফিরে আসেন ১৮৮০ সালে। ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতির জ্ঞান তাঁকে বাংলা সংগীতে নিজস্ব ধারা সৃজনে উৎসাহিত করেছিল। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি মৃণালিনী দেবীকে (১৮৭৩-১৯০২) বিবাহ করেন। কবির পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুজন শৈশবে মৃত্যুবরণ করে। ১৮৯০ সালে পূর্ব বাংলার শিলাইদহে পৈতৃক জমিদারি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে স্ত্রী-সন্তানসহ সেখানে পারিবারিক জীবন সূচিত হয়।
এরপর শুরু হয় কবির শান্তিনিকেতন পর্ব। শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯০১ সালে শিলাইদহ থেকে সেখানে উপস্থিত হন। বৃক্ষরাজির শান্ত পরিবেশে ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার ও বাগান গড়ে তোলেন তিনি। এখানে তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের অকাল মৃত্যু ঘটে। তাঁর পিতৃবিয়োগ হয় ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। পৈতৃক সূত্রে কিছু অর্থ পেলেও আশ্রম পরিচালনায় তাঁকে পরবর্তীকালে অর্থ সংকটে পড়তে হয়। তবে ‘গীতাঞ্জলি’ ইংরেজিতে অনুবাদের পর তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। মূলত ১৯১২ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ বিশ্বব্যাপি তাঁর সুনাম বয়ে আনে। তারপরই তিনি ব্রিটিশ রাজ দ্বারা সম্মানিত হন। ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের কাছে শ্রীনিকেতন নামে একটি ‘পল্লি উন্নয়ন ইন্সটিটিউট’ গড়ে তোলেন। গান্ধীর স্বরাজ ও চরকা আন্দোলনের মতোই রবীন্দ্রনাথের এই পরিকল্পনা কার্যকর হয়েছিল। যদিও তিনি চরকা কাটার পক্ষে ছিলেন না। তিনি ১৯৩০ সালে অস্পৃশ্যদের অধিকার নিয়ে তাঁর মতামত ও অবস্থান স্পষ্ট করেন। কবিতা ও নাটকে নিম্নবর্গের মানুষকে নায়ক করে তোলেন। দলিতের জন্য মন্দির দ্বারও উদ্ঘাটন করেন তিনি।
১৯৩০-১৯৪১ সালকে কবির আলোকিত বৈশ্বিক জীবন বলা হয়ে থাকে। এ সময়ের আগে থেকেই মানবতার পক্ষে কথা বলেছেন তিনি। তিনি গোড়া ধর্মান্ধ ছিলেন না। এ জন্য ১৫ জানুয়ারি ১৯৩৪ সালে বিহারে ভূমিকম্প হলে গান্ধী সেই পরিস্থিতিকে দলিত দমনের অভিশাপের ফল বললে তিনি তার প্রতিবাদ জানান। দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গা নিয়ে বারবার বিচলিত হয়েছেন কবি। সাহিত্যে যেমন নিম্নবর্গের মানুষকে শেষপর্বের কাব্যে তুলে ধরেছেন তেমনি গদ্যের বিচিত্র প্রসঙ্গে তিনি নিরন্তর নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন। বিজ্ঞানে আগ্রহী রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) লিখে দেখিয়েছেন তাঁর অধ্যয়ন ও কৌতূহলের সীমা কতদূর প্রসারিত। তাঁর শেষ জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রনিক পেইন ও অসুস্থতা শুরু হয়। ১৯৩৭ সালে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। মৃত্যুকে উপলব্ধি করেন তিনি। ১৯৪০ সালে একই অবস্থা হয়। ১৯৪১ সালে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। শয্যাশায়ী হয়ে মুখে বলে গেছেন, অন্যে লিখে নিয়েছেন। তাঁর অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথায় মৃত্যু প্রসঙ্গ বারবার পঙ্ক্তিবদ্ধ ও আলোচিত হয়েছে।
স্মরণীয় রবীন্দ্রনাথকে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনে নিকটজন হারানোর বেদনাকে অন্তরে লালন করে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে হয়েছে মানুষের মাঝে। শৈশবে মাতৃবিয়োগের পর ১৮৮৪ সালে তাঁর প্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা; ১৯০২ সালে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু, ছয় মাস পরে কন্যা রেনুকার অকালপ্রয়াণ এবং ১৯০৫ সালে পিতৃবিয়োগ পর্যায়ক্রমে ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথের মারা যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সমাপ্ত হয়। তবে ১৯১৮ সালে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতাও প্রয়াত হন। নিজের মৃত্যুর আগে এভাবে আপনজনদের লোকান্তরিত অধ্যায়গুলো তাঁর কবিমনের অতলান্তিক সঞ্চয় হয়ে কাব্যরূপ ধারণ করেছে।
মৃত্যুচিন্তা তাঁর পরমার্থসাধনার একটি অন্যতম বিষয়।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা কখনো মর্ত্যচেতনা, আত্মচেতনা, কখনো ব্যঙ্গ কৌতুক, আবার কখনো প্রেম ও সৌন্দর্য চেতনার সঙ্গে বিশ্বচেতনায় সমকালসংলগ্ন হয়ে উঠেছে। তিনি এক অর্থে মরমি কবিও। কারণ উপনিষদের ঋষিসুলভ প্রত্যয় তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে। সুফিবাদের ধারা, কবির ও রামপ্রসাদ সেনের আলিঙ্গন তাঁকে ঋদ্ধ করেছে। তাঁর কবিতা গ্রাম বাংলার বাউল ফকিরদের দ্বারাও সমৃদ্ধ হয়েছে। বাউলের ‘মনের মানুষে’র মতোই তিনি ‘জীবনদেবতা’ সৃষ্টি করেছেন। শিলাইদহে থাকার সময় তিনি দেখেছেন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও রক্ষণশীল সমাজের বাইরে বৈষ্ণব-বাউলদের অধ্যাত্ম সাধনা। তাঁর ১৭ বছর বয়সের রচনা ‘ভানুসিংহের পদাবলীতে’ও ছিল রাধা-কৃষ্ণের অনুষঙ্গ।
সমগ্র জীবনের সাহিত্যকর্মে রবীন্দ্রনাথ অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। যিশু খ্রিস্ট, গৌতম বুদ্ধ ও হজরত মুহম্মদকে (সা.) নিয়ে লিখেছেন প্রবন্ধ। বাংলা সাহিত্য তাঁর প্রচেষ্টার পথ ধরেই এখন পর্যন্ত উদার মানবতার কথা ব্যক্ত করে চলেছে। তিনি উপনিষদের ধর্মীয় আরাধনার পথ বেয়ে মানুষের ধর্মে উপনীত হয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে। বর্তমান প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথ চর্চার মাধ্যমে সেই ‘মানুষের ধর্ম’ জীবন ও সাহিত্যে প্রকটিত করে তুলতে পারেন।
এই সংক্ষিপ্ত জীবনীর রূপরেখার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা ও সার্বজনীন চেতনাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে পারি। তবে তার আগে আধ্যাত্মিকতা ও সার্বজনীনতা সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে পারে। [ক্রমশ]
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-writermiltonbiswas@gmail.com
স্যারের লেখাটা বরাবরই গবেষণাধর্মী।আরো কয়েক পর্বে লিখলে রবীন্দ্রনাথ ; মানবতাবাদচর্চা
ও সাহিত্যে আধ্যাত্মচেতনা বিষয়ক গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা যায়।