সারা জীবন যে তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখে যাবেন, চিকিৎসাবিদ্যায় যাতে বাঙালি শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারেন, সেই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবেন তা কিন্তু গোড়াতে ভাবা যায়নি। সহপাঠীদের অসুবিধের কথা ভেবে ডাক্তারি পাশ করার আগেই বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই লেখার কাজে হাত দেন। একাধিক বইও লেখেন। এসব কিন্তু শুরুতে একেবারেই বোঝা যায় নি।
হাসপাতাল তৈরির টাকা জোগাড় করার জন্য তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়িতে, বড়লোকদের বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেন, দু’হাত পেতে সাহায্য চাইতেন। অনেক সময়ে বহু লোকই তাঁকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, অপমান করেছেন। সেই অপমান গায়ে না মেখে তিনি আবার হাত পেতেছেন হাসপাতাল তৈরির স্বপ্ন সফল করার জন্য। শুধু তাই নয়, চিকিৎসক হিসেবে নিজের রোজগারের সমস্তটাই দান করে গিয়েছেন মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতাল তৈরির জন্য।
মারা যাওয়ার আগে দেখা গেল নিজের বলতে আর কিছুই নেই। শুধু ছিল বেলগাছিয়ায় গড়ে তোলা একটি বাড়ি। সেই বাড়িটিও উইল করে দান করে দিয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজকে। তবে উইলের শর্ত ছিল, তাঁর মৃত্যুর পরে জীবিতাবস্থায় বাড়িটির মালিকানা ভোগ করবেন তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী। তার পরে বাবা দুর্গাদাসের নামে স্থাপিত হবে ‘দুর্গাদাস আরোগ্য নিকেতন’।
ডাক্তারের ছেলে যে ডাক্তার হবে, সেটাও কি প্রথমে বোঝা গিয়েছিল? হেয়ার স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর রাধাগোবিন্দ বাবার কথামতো ডাক্তারি পড়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার অন্তরে ছিল থিয়েটারের নেশা। আসলে খুব ছেলেবেলায় পেয়েছিলেন বাবার বন্ধু দীনবন্ধু মিত্রকে। তখন থেকেই রাধাগোবিন্দের নাটকের নেশা।
থিয়েটার মানে যে সে থিয়েটার তো নয়, গিরিশ ঘোষ, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি প্রমুখ তাঁর থিয়েটারের সঙ্গী। এঁদের সঙ্গে রাধাগোবিন্দ বাগবাজারে অ্যামেচার থিয়েটারে মেতে ওঠেন। অভিনয়ও করেন। ১৮৭২ সালে দীনবন্ধু মিত্রের ‘লীলাবতী’তে ক্ষীরোদবাসিনীর ভূমিকায় অভিনয় করে খ্যাতি লাভ করেন রাধাগোবিন্দ। এরপর বহু নাটকের স্ত্রী চরিত্রেও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেন।
এদিকে থিয়েটারের নেশা আর অভিনয়ের কারণে রাধাগোবিন্দের ডাক্তারি পড়ার যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছিল। এই সময় রাধাগোবিন্দের জীবনে এমন দুটি ঘটনা ঘটল, যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল সম্পূর্ণ অন্যদিকে। একবার সম্পূর্ণ বিনাদোষে পুলিশের খপ্পরে পড়েন রাধাগোবিন্দ কর। কয়েকদিন হাজতবাসও করতে হয় তাঁকে। সেই সময় নিঃসন্তান অবস্থায় তাঁর স্ত্রী মারা যান। এই ঘটনা তাঁর মনে ঝড় তুলে সব লণ্ডভণ্ড করে দিল। তিনি বুঝলেন জীবন এ পথে নয়, চলতে হবে অন্য পথে। আবার নতুন করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন। বিদেশে গিয়ে বিশেষ ডিগ্রি লাভ করলেন। দেশে ফিরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন মানুষের কাজে।
সেই সময়ে উত্তর কলকাতায় ঘুরে ঘুরে রোগীদের সেবা করে চলেছেন এক আইরিশ মহিলা। জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিক পদে নিয়োজিত ডাক্তার হিসেবে তিনিও উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে ঘুরে রোগী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। রোগ থেকে বাঁচার পরামর্শ দিচ্ছেন। পথ্য কিনতে রোগীকে নিজেই টাকা দিচ্ছেন। এর পর সেই বিদেশিনি পরবর্তীতে সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে আলাপ। কলকাতায় প্লেগের সংক্রমণ রুখতে ও মৃত্যুর হার কমাতে দু’জনে একজোট হয়ে কাজ করেন।
এশিয়ার প্রথম বেসরকারি মেডিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা হয় তারই উদ্যোগে। ভাল সংস্কৃত জানাটা কাজে লেগেছিল দেশীয় প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি পাঠে। কাজে লেগেছিল বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালসের হয়ে ওষুধ তৈরিতেও।
ডা. রাধাগোবিন্দ কর বুঝেছিলেন, দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অভাব মেটানো শুধু হাসপাতাল তৈরি, মেডিক্যাল স্কুল স্থাপন ও বই লিখে সম্ভব নয়। রোগীকে চড়া দাম দিয়ে বিদেশি ওষুধ কিনতে হয়, তাই দেশীয় পদ্ধতিতে ওষুধ তৈরি করাটা জরুরি।
ডাক্তারি পাশ করার আগেই রাধাগোবিন্দ বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই লিখতে শুরু করেছিলেন। প্রথম বই ‘ভিষগবন্ধু’ প্রকাশিত হয় ১৮৭১ সালে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি একাধিক বই লেখেন- ‘সংক্ষিপ্ত শারীরতত্ত্ব’, ‘রোগী পরিচর্য্যা’, ‘ভিষক সুহৃদ’, ‘প্লেগ’, ‘স্ত্রীরোগের চিত্রাবলী ও সংক্ষিপ্ত তত্ত্ব’, ‘সংক্ষিপ্ত শিশু ও বাল চিকিৎসা’, ‘সংক্ষিপ্ত ভৈষজতত্ত্ব’, ‘কর সংহিতা’ ও ‘কবিরাজ ডাক্তার সংবাদ’। তিনি সব বই লিখেছিলেন বাংলায় সাধারণ মানুষের পড়ার উপযোগী করে। তবে ইংরেজি জানা ডাক্তারি ক্লাসের ছাত্ররাও তাঁর বই পড়তেন।