সেই সময় সাইমন কমিশনকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে বর্জন করতে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ঘটনাকাল ১৯২৮ সালের কোনও এক সময়। সেই বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ল শহর কলকাতাতেও। সেদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সাইমন কমিশনের প্রতিবাদে পড়ুয়ারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। বাধ্য হয়ে উপাচার্য পুলিশ ডাকলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের জব্দ করতে পুলিশ ডাকা হচ্ছে শুনে এক শিক্ষক স্পষ্ট জানালেন, পুলিশ ডাকা খুব ভুল কাজ হয়েছে। সেদিনের সেই শিক্ষকের নাম সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন। এই ঘটনার পরেই চ্যান্সেলর ছাত্রদের সরকারি অনুদান বন্ধ করার হুমকি দেন। ফের প্রতিবাদে আরও সোচ্চার হলেন সেই শিক্ষক। আমাদের শিক্ষক দিবস সেই শিক্ষক ও দার্শনিকের জন্মদিনেই নির্দিষ্ট। যদিও ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে অক্টোবরের পাঁচ তারিখকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু ১৯৬২ সাল থেকে আমাদের দেশে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের জন্মদিনে এই শিক্ষক দিবস উদযাপন করা শুরু হয়। আর সে বছরই সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপ্রধান হন। এই উপলক্ষটিকে সম্মান জানাতে চেয়েই পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর ছাত্রেরা। যেটা ছিল তাঁদের ব্যক্তিগত গুরুদক্ষিণা সেটাই হয়ে দাঁড়ায় গোটা দেশের। তবে আমাদের দেশে গুরুপ্রণামের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দিন হল গুরুপূর্ণিমার দিন, সেটি পুরোপুরি বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়নি। কিন্তু নিজের জন্মদিনকে নিজের জীবদ্দশাতেই অমর করতে পেরেছিলেন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান। তিনি নিজেই চেয়েছিলেন, “Instead of celebrating my birthday, it would be my proud privilege if September 5th is observed as Teachers’ Day.”
কেবলমাত্র এই নয়, যার জন্মদিন গোটা দেশে বিশেষভাবে উদযাপিত হয়, তিনি স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি; ভারতরত্নও বটে। এমন একজন শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানকে প্লেজিয়ারিজমের দায়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। রাধাকৃষ্ণানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ “ইন্ডিয়ান ফিলজফি”। যে গ্রন্থের কারণে রাধাকৃষ্ণান অজস্র সাম্মানিক ডক্টরেট, বক্তৃতার সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন, বৃটিশ রাজদরবার তাঁকে নাইটহুড সম্মানও দিয়েছিল। এমন এক মানুষের বিরুদ্ধে ছাপার অক্ষরে প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ তুলেছিলেন ১৯১৫ সালে ফিলিপ স্যাম্যুয়েল স্মিথ পুরস্কার এবং ক্লিন্ট স্মৃতি পুরস্কার পেয়ে দর্শনে স্নাতক, তারপর ১৯১৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। ইতিমধ্যে তাঁর বিদ্যাবত্তার খ্যাতির কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তরের ফল প্রকাশের আগেই রিপন কলেজে সহকারী অধ্যাপকের পদে যোগদানের আমন্ত্রণ পান, পরবর্তীতে রাজশাহী সরকারি কলেজ এবং ঢাকা জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা, সবশেষে মিরাটে বিভাগীয় প্রধানের পদে ১৯৫৩ পর্যন্ত বহাল ছিলেন যিনি। এছাড়াও বেদান্ত, যোগ, শক্তিসাধনা, বৈষ্ণব তত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র, মনস্তত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ে চল্লিশটিরও বেশি বই এবং অসংখ্য নিবন্ধের রচয়িতা, যার সারস্বত কৃত্যের গুরুত্ব পণ্ডিতসমাজে সমাদৃত কেবল এ দেশে নয়, বিদেশের নানা জায়গা থেকেও তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, সেই যদুনাথ সিংহ।

যদুনাথ সিংহ “ইন্ডিয়ান সাইকোলজি অব পারসেপশন” নামে একটি বৃহৎ গবেষণা প্রকল্পের পরিকল্পনায় প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য প্রথম খণ্ড ১৯২২ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর এই গবেষণার জন্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল এবং সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানকে পরীক্ষক নিযুক্ত করেছিল। যদিও ১৯২২ সালে যদুনাথ বৃত্তিটি লাভ করেছিলেন। এরপর তিনি পুরো গবেষণাটি ১৯২৫ সালে শেষ করে বাকি খণ্ডগুলিও জমা দিয়েছিলেন। তখন রাধাকৃষ্ণানের সঙ্গে পরীক্ষক ছিলেন অধ্যাপক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। প্রসঙ্গত, ১৯২৭ সালে রাধাকৃষ্ণানের “ইন্ডিয়ান ফিলজফি”র দ্বিতীয় খণ্ড এবং ১৯২৮ সালে “দ্য বেদান্ত অ্যাকর্ডিং টু শংকর অ্যান্ড রামানুজ” প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বইটি আসলে “ইন্ডিয়ান ফিলজফি” দ্বিতীয় খণ্ডের অষ্টম এবং নবম অধ্যায়ের একটি স্বতন্ত্র পুনর্মুদ্রণ। যদুনাথ এই বইটি পড়েই আবিষ্কার করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম জর্জ অধ্যাপক ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান “ইন্ডিয়ান সাইকোলজি অব পারসেপশন”-এর প্রথম দুটি অধ্যায় থেকে অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ নিজের বইতে টুকেছেন। উল্লেখ্য, যদুনাথের “ইন্ডিয়ান সাইকোলজি অব পারসেপশন”-এর যে দুটি অধ্যায় রাধাকৃষ্ণান টুকেছিলেন সেই বিষয় নিয়ে যদুনাথের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ রাধাকৃষ্ণানের বই প্রকাশিত হওয়ার আগেই মিরাট কলেজের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
যদুনাথ মর্ডার্ন রিভিয়্যুতে নিজের লেখা এবং রাধাকৃষ্ণানের লেখা উদ্ধৃত করে রাধাকৃষ্ণানের টুকলি বৃত্তান্ত ফাঁস করতে পর পর চিঠি লেখেন। মর্ডার্ন রিভিয়্যুতে সেগুলি প্রকাশিত হতে থাকলে চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়। চুপ করে থাকাটা ঠিক নয় ভেবে রাধাকৃষ্ণান আত্মপক্ষ সমর্থন করে পালটা দু-একটি চিঠি মর্ডার্ন রিভিয়্যুতে লিখলেন বটে কিন্তু সেগুলি ধোপে টেকেনি। আসলে তিনি যদুনাথের মুখ বন্ধ করতে চাইলেন কালি ছিটিয়ে। এরপর রাধাকৃষ্ণান নীরবতার পথ অবলম্বন করেন। রাধাকৃষ্ণান ভেবেছিলেন যদুনাথ তাঁর খ্যাতির জোরের কাছে ভয় পেয়ে থেমে যাবে। কিন্তু সবাই কি একরকম হন, ব্যতিক্রমও হন কেউ। যদুনাথ ১৯২৯ সালে কলকাতার উচ্চ আদালতে রাধাকৃষ্ণানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে ক্ষতিপূরণ বাবদ কুড়ি হাজার টাকা দাবী করেন। “বসুমতী”, “বঙ্গবাণী”,”দ্য পাইয়নিয়র”,”দ্য হিন্দুস্থান টাইমস”,”ইস্ট বেঙ্গল টাইমস”,”দ্য লিডার”,”দ্য লিবার্টি” থেকে জানা যায় যে যদুনাথ রাধাকৃষ্ণানের অভিযুক্ত বইগুলির সমস্ত অবিক্রিত কপি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া এবং চুরি করে লেখা অংশগুলি বাদ দিয়ে নতুন করে বই ছাপার দাবি জানিয়েছিলেন।
কিন্তু এ দেশে সত্যের সুবিচার হয়না। তাই যদুনাথ পণ্ডিতসমাজকে আসল সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও ন্যায় বিচার পাননি। শিক্ষাজগতের প্রবীণেরা যদুনাথের অভিযোগের সত্যতা মেনে নিলেও রাধাকৃষ্ণানের খ্যাতি-প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক মহলে তাঁর প্রতাপের কারণে কেউ সেদিন আদালতে সাক্ষ্য দিতে হাজির হননি। রাধাকৃষ্ণান থেকে শুরু করে অনেকেই এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ যদুনাথ সিংহের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন আদালতকক্ষের বাইরে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। যদুনাথ মামলা প্রত্যাহারের মানুষ ছিলেন না, আর্থিক কারণেই মামলার বিপুল খরচ তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত মামলার নিষ্পত্তি হয় আদালতের বাইরে।
এটা খুব ভালো লেখা। আমার প্রশ্ন হল আদালতের বাইরে যে সমাধান হয়েছিল সেটা কি হয়েছিল?
আর সেই সময় আদালতের হলফনামাটাই বা কি ছিল সেটা যদি কেউ প্রকাশ করেন তাহলে খুব ভালো হয়।
এটা খুব ভালো লেখা। আমার প্রশ্ন হল আদালতের বাইরে কিভাবে নিষ্পত্তি হয়ছিল?
আর সেই সময় আদালতের মামলার কপি যদি কেউ প্রকাশ করেন তাহলে খুব ভালো হয়।