১৮৮৮ সালের আগস্ট মাস। মোগল ইতিহাস থেকে পায়ে হেঁটে স্বামী বিবেকানন্দ এসেছেন রাধাভূমিতে। স্নিগ্ধ ব্রজবাতাসে ভক্ত চরণের শব্দ সর্বত্র। জীবন এখানে মৃদু ধারার আবর্ত। স্বামীজি খুঁজে পেলেন সর্বগ্রাসী ভক্তি। রাধার কৃষ্ণের লীলা কীর্তন ভূমিতে এসে তার হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার হঠাৎ করেই খুলে গেল। দক্ষিণেশ্বরে জ্ঞানমার্গী নরেন্দ্রনাথকে ভক্তিপথে আনার জন্য ঠাকুরের কত চেষ্টা। ঠাকুর বলতেন — তুই শুষ্ক জ্ঞানী কেন হবি? তর্ক বিতর্কের আসর থেকে ভগবান পালিয়ে যান। ভক্তির রসভান্ডে টাপুর টুপুর থাক। আনন্দ পাবি।
সেই নরেন্দ্রনাথই বৃন্দাবনে এসে রাধা কৃষ্ণের প্রেমান্বিত ধারায় ভেসে গেলেন। গদগদ ভাব উথলে উঠলো।
বৃন্দাবন, মথুরা, গোকুল, বর্ষানা, শ্যামকুণ্ড, রাধাকুণ্ড, গিরি গোবর্ধন — এসব নিয়েই ব্রজধাম। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, “গঙ্গাজল জলের মধ্যে নয়, শ্রীবৃন্দাবনের রজঃ ধূলার মধ্যে নয়, আর শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের মহাপ্রসাদ অন্নের মধ্যে নয়। এই তিন ব্রহ্মের স্বরূপ।”

বর্ষনা, রাধার জন্মস্থান।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছেই বৃন্দাবন তাদের নিজস্ব ধর্মীয় কারণে পুণ্যভূমি হয়ে উঠেছে। এখানে ব্রজের নিয়মে প্রথমেই দর্শন করতে হবে গোপেশ্বর শিব ও কালী। তারপর একে একে গোবিন্দজী, গোপীনাথ, শেঠের মন্দির, রাধাবল্লভ, মদনমোহন, সাহজীর মন্দির, অষ্টসখী, বাঁকাবিহারি, কালীয়দমন। স্বামীজি ঠাকুরের নির্দেশ পথেই চলেছেন। এরপর যাবেন গিরি গোবর্ধন।
গোবর্ধন পরিক্রমা করে স্বামীজি রাধাকুণ্ডে গেলেন স্নান করবেন বলে। সেই সময় তাঁর পরিধানে কৌপিন ছাড়া আর কিছু নেই। কৌপিনখানি ধুয়ে রাধাকুন্ডের পাড়ে শুকোতে দিয়ে জলে নামলেন স্বামীজি, স্নান সেরে উঠে দেখলেন কৌপিনটি নেই। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা উঁচু ডালে তার কৌপিনখানি ঝুলছে। পাশে বসে আছে একটি বানর। অনেক অনুনয় বিনয় করলেন, কিন্তু বানর কোনমতেই মানুষ হতে চাইলো না। স্বামীজি কৌপিনের আশা ত্যাগ করলেন। সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় কি করে তিনি লোকালয়ে ভ্রমণ করবেন, সে ভেবে আকুল হয়ে পড়লেন। এই অবস্থায় শ্রীশ্রীরাধা রানীর ওপর তার অত্যন্ত রাগ আর অভিমান হল। কারণ রাধাকুন্ড ও সমগ্র বৃন্দাবন রাধারানীর এলাকা। সেখানে তিনি যা করেন বা করান, তাই হয়।
এই বিশ্বাসে স্বামীজি অভিমানভরে প্রতিজ্ঞা করলেন, পরিধান বস্ত্র না পাওয়া পর্যন্ত গভীর জঙ্গলে গিয়ে প্রয়োপবেশন করে থাকবেন এবং কোনরূপে বিলম্ব না করেই তিনি তখনই নিকটবর্তী এক নিবিড় অরণ্যে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ করেই একটি লোক একটি নতুন গেরুয়া বস্ত্র ও কিছু খাবার নিয়ে দ্রুতভাবে স্বামীজির নিকট এসে উপস্থিত হলেন এবং তার অনুরোধে স্বামীজি ঐসব দ্রব্য গ্রহণ করলেন। আবার কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘন বনের মধ্যে সেই ব্যক্তি অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

স্তব্ধ ও বিস্মিত স্বামীজি ওই নতুন গৈরিক বস্ত্র পরিধান করে রাধাকুণ্ডের পাড়ে আসলেন। সেখানেও আশ্চর্য হয়ে দেখলেন তার অপহৃত কৌপিন তিনি যেখানে শুকোতে দিয়েছিলেন ঠিক সেখানেই রয়েছে। তখন বুঝলেন এই ক্ষুদ্র ঘটনাটির দ্বারা স্বয়ং রাধারানী তাকে তার মাহাত্ম্য দর্শন করিয়েছেন। (মানদাশঙ্কর)
আসলে নরেন্দ্রনাথ যে এসেছেন, শ্রীমতি তা জেনেছেন। ছেলেটির সঙ্গে একটু খেলা করবেন না রাধারানী! কেন করবেন? যাতে তার পরাশক্তিতে (অলৌকিক নয়, সুপার পাওয়ার) বিশ্বাস দৃঢ় হয়। তাকে লড়তে হবে মেটিরিয়াল ওয়ার্ল্ডের সাথে। ভীষণ লড়াই Mind, Matter, Spirit — এই তিন বস্তু সমন্বয়ে গঠিত বহুরূপী জগতের প্রকৃত রূপটি খুঁজে পেতে হবে।
স্বামীজীর জীবনে একটি মস্ত বড় দিক হলো গ্রহণ। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী, ভীষণ বৈরাগ্য, জগত আর জীবনের দিকে তাকাবার কি প্রয়োজন! হিমালয়ের শীতল গুহায় ‘চক্ষু কর্ণ মুদিয়া’ বসে পড়তে পারেন ধ্যানে, তা কিন্তু তিনি করেননি। গুরুদেব বলেছিলেন স্পষ্ট চোখে মানবলীলা দেখো, জীবন থেকে জীবনের পাঠ নাও। মানুষই ভগবান, মানুষই শাস্ত্র। তাই সব ক্ষেত্রেই স্বামীজি ছিলেন প্রথম একজন ছাত্র।

রাধাকুন্ড বর্ষানা
স্বামী বিবেকানন্দর অনেক আগে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণ মথুরা ও বৃন্দাবন দর্শনে গেছিলেন। বৃন্দাবনে মথুরবাবুর সঙ্গে এসে কামারপুকুরের রাখাল শ্রীরামকৃষ্ণ আবেগে আত্মহারা হয়েছিলেন। সদা সর্বদা ভাবস্থ থাকতেন। বিভিন্ন সময়ে কথামৃতে শ্রীশ্রীঠাকুর তার মথুরা ও বৃন্দাবন দর্শনের কথা ভক্তদের কাছে বলতেন। গোবিন্দজীর মন্দির দর্শন করার পর তিনি গিরিগোবর্ধন দর্শনে যান। গোবর্ধন দেখামাত্রই তার উপর ছুটে গিয়ে বিহ্বল ও বাহ্যশূন্য হন। পান্ডারা ধীরে ধীরে তাকে নামিয়ে আনেন।
হৃদয় সঙ্গে পালকি করে ‘শ্যামকুন্ডু’ ও ‘রাধাকুন্ডু’ দর্শনে গেছিলেন ঠাকুর। পালকিতে ভাবাবেগে বিভোর হয়ে অনেক সময় পালকী হতে লাফিয়ে পড়তে চাইতেন। হৃদয় পাল্কি বাহকদের সঙ্গে সঙ্গে যেতেন এবং তাদের খুব সাবধান করে দিয়েছিলেন। এসব লীলাস্থলের পথে কৃষ্ণের বিরহে শ্রীশ্রী ঠাকুর চোখের জলে কাপড় ভিজিয়ে ফেলতেন আর কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, “সেইসব আছে, কৃষ্ণ রে তুই কোথায়?”
কৃষ্ণপ্রেমে আকুলতাই রাধাভাব। আর রাধাভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে রাধারানীর আরাধনা করতে হয়।
আজ রাধাষ্টমী। জন্মাষ্টমীর ঠিক ১৫ দিন পর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রাধাষ্টমী বা রাধাজয়ন্তী পালন করা হয়। রাধা অষ্টমীর দিন সকাল থেকেই বার্ষানা, মথুরা ও বৃন্দাবনে রাধা অষ্টমী নিয়ে উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো।

বৃন্দাবনের নিধুবনে রাধা বাঁশী বাজাচ্ছে।
সারাদিন ধরে ভক্তরা উপবাস রেখে শ্রীমতি রাধারানীর পূজা করেন, সঙ্গে অবশ্যই কৃষ্ণের পূজা হয়। সারাদিন ধরে পাঠ ও ভজন কীর্তন চলে। লোকে বলে শ্রীমতি রাধারানীর পূজার্চনা ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের পূজা হয়না। দুপুরে পঞ্চামৃত দিয়ে শ্রীমতি রাধারানীকে স্নান করানো হয় তারপর নতুন বস্ত্র ও নানাবিধ সুগন্ধি, ফুলমালা দিয়ে তাকে সাজানো হয়। বর্ষানায় যে রাধাকুণ্ড আছে, সেখানে সারা বছর কেউ স্নান করতে পারে না। রাধা অষ্টমীর দিন মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ওই সময় স্নান করা যায়। বিশ্বাস করা হয় রাধাকুণ্ড স্নান করে মানুষ শ্রীমতি রাধারানী কৃপা ধন্য হয়। রাধা মানে প্রেম রাধা মানেই সাধনা। প্রেম ও সাধনাকে একাকার করেছে রাধা নাম। জয় রাধে।
“বাণী তব ধায় অনন্ত গগনে লোকে লোকে,
তব বাণী গ্রহ চন্দ্র দীপ্ত তপন তারা ॥
সুখ দুখ তব বাণী, জনম মরণ বাণী তোমার,
নিভৃত গভীর তব বাণী ভক্তহৃদয়ে শান্তিধারা॥” — (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, স্বামী বিবেকানন্দ এক অনন্ত জীবনের জীবনী — সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য উল্লিখিত।