আজ রাধাষ্টমী। জন্মাষ্টমীর ঠিক ১৫ দিন পর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রাধাষ্টমী বা রাধাজয়ন্তী পালন করা হয়। বলা হয়, দেবতা হয়ে দেবতার পুজো করতে হয়। অর্থাৎ দেবতার ভাব নিয়ে পূজার্চনা করা বিধেয়। তেমনি রাধাভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে রাধারানীর আরাধনা করতে হয়।
রাধাভাব কি? সত্যম, শিবম, সুন্দরম-এর মহাভাব হলো রাধাভাব। কৃষ্ণ প্রেমের সর্বশ্রেষ্ট সাধিকা হলেন মহাভাবময়ী শ্রীরাধিকা। রাধার প্রেম নিষ্কাম, নিঃস্বার্থ, বিশুদ্ধ নিকষিত হেম ও একান্তরূপে সমর্পিত। রাধা কখনো কৃষ্ণের কাছে কামনা বা প্রার্থনা করেননি। তিনি সর্বদা কৃষ্ণকে আনন্দদান করতে উদগ্রীব।
ঠিক এমনিভাবে যখন কোন ভক্ত সর্বস্ব সমর্পণের ভাব নিয়ে কৃষ্ণ প্রেমে লীন হয়ে যান, তখন তিনি রাধাভাব লাভ করেন। কৃষ্ণ কৃপা পেতে হলে অবশ্যই রাধারানীর শরণাগতি নিতে হবে। তাই রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে ভক্তগণ শ্রীরাধিকার আরাধনায় মগ্ন হন। হিন্দুরা মনে করেন, শত শত একাদশী ব্রত পালনে যে পুণ্যফল অর্জন হয়, একটি রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার থেকেও বেশি পুণ্যলাভ হয়ে থাকে।

সারাদেশে বিশেষ করে ব্রজধামে ও বৃন্দাবনে কৃষ্ণ, রাধার নামাঙ্কিত বহু মন্দির আছে। আজ রাধারানীর জন্মস্থলী বর্ষানায় রাধাষ্টমী উৎসবের কথা বলবো।
বারসানা হল ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মথুরা জেলার একটি ঐতিহাসিক শহর এবং নগর পঞ্চায়েত। এটি ব্রজ অঞ্চলে অবস্থিত।
বর্ষানায় রাধিকার বাল্যকাল অতিবাহিত হয়েছে। রাধা কৃষ্ণের নানা লীলার সাক্ষী এই গ্রাম বৈষ্ণব গণের পুণ্যতীর্থ। ভক্তগণ রাধারাণীকে শক্তির প্রতিমূর্তি মনে করে পূজা করেন। তাঁরা শ্রীরাধিকাকে ‘লাডলী জী’ বলে শ্রদ্ধা করেন। তাই এই মন্দির শ্রীজি মন্দির বা শ্রী লাডলি লাল মন্দির বা রাধারানীর মন্দির নামেও পরিচিত। বর্ষানায় ভানুগড় পাহাড়ের ওপর এই দিব্য মন্দিরটি আছে। সিঁড়ি ভেঙে উঠে মন্দির দর্শন করতে হয়। এই পাহাড়গুলির উচ্চতা প্রায় ৮২০ ফুট।

রাধারানী মন্দির সারা বিশ্ব থেকে প্রচুর সংখ্যক উপাসক এবং পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এখানে পালিত প্রধান উৎসব রাধাষ্টমী এবং লাঠমার হোলি। উৎসবে মন্দিরগুলিকে নানা ধরণের ফুল, মালা, রঙিন কাগজ, পতাকা, অসংখ্য আকর্ষণীয় জিনিষ দিয়ে সাজানো হয়। মঙ্গলারতি, বেদমন্ত্র উচ্চারণ, নাম সংকীর্তন, পুজাপাঠ, নৃত্য, গীত, রাধাকৃষ্ণের লীলা অভিনয় নানান অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে রাধাষ্টমী পালিত হয়। সকালে মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে বেশ কয়েক মণ দুধ, দই, ঘি, চিনি দিয়ে বানানো পঞ্চামৃত দিয়ে রাধারানী ও শ্যামরায়ের মহাভিষেক করা হয়। মধ্যাহ্নে পূজার্চনা ও আরতির পরে রাধা কৃষ্ণকে ৫৬টি বিভিন্ন ধরণের ভোগ দেওয়া হয়, যা “চাপন ভোগ” নামেও পরিচিত। তারপর এটি “মহাপ্রসাদ” হিসাবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এ বছর রাধারাণীর জন্মাভিষেকের লাইভ দর্শন বার্ষানায় ৪ঠা সেপ্টেম্বর ভোর ৪টায় একটি এলইডি স্ক্রিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বারসানা শ্রী জি মন্দির-সহ চারটি জায়গায় এই পর্দা বসানো হয়েছে।
শ্রী রাধারানী মন্দিরের ইতিহাস :
কিংবদন্তি অনুসারে রাধা রানী মন্দিরটি প্রায় ৫০০০ বছরের পুরানো। রাজা বজ্রনাভ (কৃষ্ণের প্রপৌত্র) এটি নির্মাণ করার আগে, মন্দিরটি ধ্বংসস্তূপে পড়ে ছিল। রাজা বীর সিং ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে নারায়ণ ভট্ট (যিনি চৈতন্য মহাপ্রভুর ছাত্র ছিলেন) আকবরের অন্যতম গভর্নর রাজা টোডরমলের সহায়তায় বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
মজার ব্যাপার হল, মন্দিরটিও জনপ্রিয় পুরাণের সাথে বাঁধা। কাহিনী অনুসারে, কৃষ্ণের পিতা নন্দ এবং রাধার পিতা বৃষভানু ছিলেন ভালো বন্ধু। নন্দ গোকুলের দায়িত্বে ছিলেন এবং রাওয়ালের দায়িত্বে ছিলেন বৃষভানু। যাইহোক, মথুরার রাজা কংসের অত্যাচারে বিরক্ত হয়ে তারা এবং তাদের লোকেরা উভয়েই নন্দগাঁও এবং বরর্ষানায় স্থানান্তরিত হন।

নন্দ নন্দীশ্বর পাহাড়কে তার স্থায়ী আবাস হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে বৃষভানু বেছে নিয়েছিলেন ভানুগড় পাহাড়, যা পরে রাধার বাসস্থান হয়ে ওঠে। বার্ষানা এবং নন্দগাঁও দুটি যমজ শহর নন্দীশ্বর এবং ভানুগড় পাহাড়ের চূড়ায় রাধা ও কৃষ্ণকে উৎসর্গ করা মধ্যযুগীয় মন্দির রয়েছে। ভক্তরা নন্দগাঁও মন্দিরকে নন্দ ভবন বলে আর বার্ষানা মন্দিরকে রাধা রানী মন্দির এবং শ্রীজি মন্দির বলে।
শ্রী রাধা রানী মন্দিরের স্থাপত্য :
শ্রীজি মন্দিরের খিলান, স্তম্ভ এবং লাল বেলেপাথর সহ কারুকার্য মুঘল যুগের নির্মাণের উজ্জ্বলতা চিত্রিত করে। এই সুন্দর মন্দিরটির একটি স্থাপত্য শৈলী রয়েছে যা সেই সময়ের স্থাপত্য শৈলীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মন্দিরটি দেখতে একটি মহৎ প্রাসাদের মতো যা লাল বেলেপাথর দিয়ে তৈরি এবং এর অভ্যন্তরীণ দেয়াল ও ছাদে জটিল হাতের খোদাই, সুন্দর খিলান, গম্বুজ এবং সূক্ষ্ম চিত্রকর্ম দ্বারা সজ্জিত। মন্দির নির্মাণে লাল এবং সাদা পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এখানে ২০০টিরও বেশি সিঁড়ি রয়েছে যা মাটি থেকে মূল মন্দিরে যায়। এই মন্দিরের দিকে যে ধাপগুলি উঠে যায় তার পাদদেশে রয়েছে বৃষভানু মহারাজের প্রাসাদ যেখানে বৃষভানু মহারাজ, কীর্তিদা, শ্রীদামা (রাধার ভাই) এবং শ্রী রাধিকার মূর্তি রয়েছে। এই প্রাসাদের কাছেই ব্রহ্মার মন্দির। এছাড়াও, কাছাকাছি, অষ্টসখী মন্দির রয়েছে যেখানে রাধা এবং তার প্রধান সখীদের পূজা করা হয়। মন্দিরটি পাহাড়ের চূড়ায় থাকায় মন্দিরের চত্বর থেকে পুরো বারসানা দেখা যায়।

বর্ষানায় রাধাষ্টমীর দিন কোনো ভক্তকেই রাধাকুন্ড তে স্নান করতে দেওয়া হয় না। তবে উৎসব শেষ হলে মধ্যরাত্রির পর ভক্তগণ রাধাকুন্ড-এ অবগাহন করেন এবং রাধাশ্যমের আশির্বাদ লাভ করেন।
বর্ষানা থেকে নন্দগ্রাম যাওয়ার পথে সঙ্কেত নামে একটি জায়গা আছে। কথিত আছে, এখানে রাধাকৃষ্ণের প্রথম মিলন হয় এখানে রাধাষ্টমী উপলক্ষ্যে অষ্টমী থেকে চতুর্দশী পর্য্যন্ত একটি জমজমাট মেলা বসে।
রাধারানী মন্দির দর্শন নিঃসন্দেহে আপনাকে নিজের সাথে শান্তি স্থাপন করতে সহায়তা করবে । আপনি যদি উত্তর প্রদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাহলে অবশ্যই এই মন্দিরে ঘুরে আসবেন। বারসানার অন্যতম সেরা মন্দির হিসাবে রাধারানী মন্দিরটি বিখ্যাত। শাস্ত্র বলে, রাধাষ্টমীতে “রাধা, ‘রাধা’ বলে যে ভক্ত তাঁকে স্মরণ করেন তিনি সর্বতীর্থের ফললাভ করেন ও ভববন্ধন থেকে মুক্তি পান।
রাধে রাধে।।
just awesome. খুব ভালো লাগলো।
Thank you Mama????