৪
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বনেদি সাংগীতিক পরিসর লাভের কথায় মুখর হয়েছেন। অথচ তাতে গান না শেখার কথাই প্রাধান্য পেয়েছে। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘গীতচর্চা’য় তিনি জানিয়েছেন : ‘আমাদের পরিবারে শিশুকাল হইতে গানচর্চার মধ্যেই বাড়িয়া উঠিয়াছি। আমার পক্ষে তাহার সুবিধা এই হইয়াছিল, অতি সহজেই গান আমার সমস্ত প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল। তাহার অসুবিধাও ছিল। চেষ্টা করিয়া গান আয়ত্ত করিবার উপযুক্ত অভ্যাস না হওয়াতে, শিক্ষা পাকা হয় নাই। সংগীতবিদ্যা বলিতে যাহা বোঝায় তাহার মধ্যে কোনো অধিকার লাভ করিতে পারি নাই।’ শিক্ষানবিশির কথায় শুধু তাই নয়, গানের সঙ্গে বেড়ে ওঠার কথাতেও তাঁর শ্লাঘাবোধও বর্তমান। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘গীতচর্চা’র পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে, ‘কবে যে গান গাহিতে পারিতাম না তাহা মনে পড়ে না।’ অথচ সেই গানের চর্চায় নিবিড়ভাবে আত্মনিয়োগ করতে না পারার জন্য তাঁর কোনো আফশোস নেই। বরং না শেখাই যে তাঁর পক্ষে ভালো হয়েছে, সে-কথায় আত্মতৃপ্তিবোধের পরশকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে জীবনের উপান্তেও সক্রিয় মনে হয়।
১৯৪০-এর ৩০ জুন ‘গীতালি’ নামে রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্বোদনী ভাষণে রবীন্দ্রনাথ সেকথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায় : ‘বাল্যকালে আমাদের ঘরে ওস্তাদের অভাব ছিল না ; সুদূর থেকে, অযোধ্যা গোয়ালিয়র ও মোরাদাবাদ থেকে, ওস্তাদ আসত। তাছাড়া বড়ো বড়ো ওস্তাদ ঘরেও বাধাঁ ছিল। কিন্তু আমার একটা গুণ আছে—তখনো কিছু শিখি নি, মাস্টারির ভঙ্গি দেখলেই দৌড় দিতাম। …আমি অত্যন্ত ‘পলাতকা’ ছিলুম বলে কিছু শিখি নি, নইলে কি তোমাদের কাছে আজকে খাতির কম হত? এ ভুল যদি না করতুম, পালিয়ে না বেড়াতুম, তা হলে আজকে তোমাদের মহলে কি নাম হত না? সেটা হয়ে উঠল না, তাই আমি এক কৌশল করেছি —কবিতার-কাছঘেঁষা সুর লাগিয়ে দিয়েছি। লোকের মনে ধাঁধা লাগে; কেউ বলে সুর ভালো, কেউ বলে কথা ভালো, সুরের সঙ্গে কথা, কবি কি না। কবির তৈরি গান, এতে ওস্তাদি নেই।’ এই ‘ওস্তাদি’ না-থাকার মধ্যেই যে তাঁর গানের অভিনবত্ব বর্তমান, তা রবীন্দ্রনাথের কথাতেই প্রতীয়মান। সেক্ষেত্রে তাঁর অভিনব প্রয়াসই যে বিতর্ক্কে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং তার অগ্রহণীয় প্রকৃতিকে সবুজ করে তুলেছে, তাও স্পষ্ট করে তুলেছেন তিনি। উক্ত বক্তব্যের অব্যবহিত পরেই তাঁর সখেদ অভিমান ব্যক্ত হয়েছে : ‘ভারতীয় ব’লে যে-একটা প্রকাণ্ড ব্যাপার আছে, আমার জন্মের পর তার নাকি ক্ষতি হয়েছে—অপমান নাকি হয়েছে। তার কারণ আমার অক্ষমতা। বাল্যকালে আমি গান শিখি নি—এত সহজে শেখা শেখা যায় না, শিখতে কষ্ট হয়, সেই কষ্ট আমি নেই নি।’ সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে গান না শেখার অজুহাতে কবির গানের বিনয়ের আধারে ‘ওস্তাদি’হীনতার পরিচয়ে তাঁর স্বতন্ত্র ভূমিকা রচনা করেছেন, তাতে অশিক্ষার অভাব নয়, বরং স্বকীয় সুশিক্ষার চেতনার আলোয় সৃষ্টির প্রয়াস বর্তমান। ভারতীয় হিন্দুস্থানী সংগীতের প্রতি তাঁর আবাল্য আকর্ষণ ছিল এবং তার বনেদি আবেদনে তিনিও ছিলেন রসিক। শুধু তাই নয়, তার শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর শ্রদ্ধাও ছিল অটুট। তার রাগ-রাগিনীর ওজস্বিতা সম্পর্কে তাঁর যে পুরোদস্তুর ধারণা ছিল, সেবিষয়ে তাঁকে বিতর্কের সূত্রে আরও বেশি সক্রিয় হতে হয়েছে। তিনি যে স্বেচ্ছায় সক্রিয় উদ্যোগে সামিল হয়ে হিন্দুস্থানী সংগীতের ধারাকে অস্বীকার করেছেন, তা বোঝানোর জন্য তাঁকে রীতিমতো তাঁর অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁকে স্বকীয় সংগীতসাধনায় হিন্দুস্থানী সংগীতের প্রতি বিমুখতা নিয়ে প্রায় জবাবদিহির শিকার হতে হয়েছিল। অথচ তাঁর স্পষ্ট অবস্থানে যে দেশজ সংগীতের প্রতি হীন বা হেয় ধারণা ছিল না, সেকথা শুধু জানাননি, মান্যতার কথাও বারবার শুনিয়েছেন।
১৯৩৮-এর ২৮ মার্চ বরানগরে দিলীপকুমার রায়কে রবীন্দ্রনাথ আলাপচারিতায় সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায় : ‘…হিন্দুস্থানী আমি সর্বান্তকরণে ভালোবাসি—আজ ব’লে নয়, বাল্যকাল থেকেই। মনে করি ভালোবাসা উচিত। প্রতি সুন্দর সৃষ্টি পুরানো হলেও রসিকের মনে আনন্দের সাড়া তুলবে এই তো হওয়া উচিত।’ কিন্তু সেই ভালোবাসার অভাব না থাকলেও তার স্বভাবে অভাববোধ তো মহৎ প্রতিভাবানেরই পরিচায়ক। রবীন্দ্রনাথ সেই পরিচয়কেই আত্মপরিচয়ের সোপান তৈরি করেছিলেন। এজন্য তিনি দিলীপকুমারকে ঐ অনুষঙ্গেই স্মরণ করিয়েছেন : ‘উৎকৃষ্ট হিন্দুস্থানী আমি ভালোবাসি বলেছি বহুবারই। কেবল আমি বলি যে, ভালো জিনিসকেও ভালোবাসতে হবে কিন্তু মোহমুক্ত হয়ে। সব রকমের মোহ সর্বনেশে। …হিন্দুস্থানী ভালোলাগে ব’লেই যে ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি করতে হবে এ একটা কথাই নয়।’ রবীন্দ্রনাথের মতো মহৎ প্রতিভাবানের কাছে তাই ‘পুনরাবৃত্তি’র নয়, নবসৃষ্টিই প্রাধান্য পেয়েছে।

৫
আসলে মহৎ প্রতিভাশালীর উৎকর্ষবোধে দাসত্বের চেয়ে রাজত্বের নবদিগন্ত আপনাতেই হাতছানি দেয়। আর সেই রাজত্বের জন্য দাসত্ব মুক্ত হওয়া প্রয়োজন। সেজন্যে রবীন্দ্রনাথ দেশজ সংগীতকে তার মৃতপ্রায় বদ্ধ পরিসরকে থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে সামিল হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে দেশের ঐতিহ্যপ্রাচীন সংগীতের ধারাকে ভাঙাগড়া করে যেভাবে তিনি স্বকীয় প্রতিভায় অভিনব সংগীতের প্রয়োজনকে আয়োজনে সামিল করেছিলেন, তা তাঁর সংগীতচিন্তার মধ্যেই প্রতীয়মান। সেদিক থেকে দেশজ সংগীতের দাসত্বমোচনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর উদ্যোগ যে বৈপ্লবিক ছিল, তা সহজেই অনুমেয়। যে-কারণে তাঁকে শেখার কষ্টের চেয়ে প্রতিষ্ঠার সাধনায় আজীবন সক্রিয় থাকতে হয়েছে। তাঁর গানের আবেদনে বিমুখতার পাশাপাশি বিতর্কের মুখরতা উভয়ই তাঁকে আজীবন অস্বস্তি প্রদান করেছে। সেই গানে যখনই একটু স্বস্তি পেয়েছেন, আত্মতুষ্টিতে পঞ্চমুখ হয়েছেন। আসলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বকীয় সংগীতচিন্তায় যেভাবে বাংলা গানের নবদিগন্ত উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন, তা শুধু প্রচলিত দাসত্বমোচনের প্রয়াসই নয়, সেইসঙ্গে সময়ের দাবিতে রাজত্বের হাতছানিও বটে। তাঁর সেই বৈপ্লবিক উদ্যোগের পরিচয় প্রথমাবধি লক্ষণীয়। এজন্য প্রয়োজনে তিনি নিজেকেও ভেঙে গড়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ যে প্রবন্ধটি প্রথম সভায় পাঠ করেছিলেন, সেই ‘সঙ্গীত ও ভাব’-এর বক্তব্য থেকেও তিনি সরে এসেছিলেন। ‘জীবনস্মতি’তে তিনি সেকথা তুলেধরেছেন। ‘গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’-এ তিনি প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন : ‘কিন্তু যে মতটিকে তখন এত স্পর্ধার সঙ্গে ব্যক্ত করেছিলাম সে মতটি যে সত্য নয়, সে কথা আজ স্বীকার করিব। গীতিকলার নিজেরই একটি বিশেষ প্রকৃতি ও বিশেষ কাজ আছে। গানে যখন কথা থাকে তখন কথার উচিত হয় না সেই সুযোগে গানকে ছাড়াইয়া যাওয়া, সেখানে সে গানেরই বাহনমাত্র। গান নিজের ঐশ্বর্যেই বড়ো—বাক্যের দাসত্ব সে কেন করিতে যাইবে। বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে সেইখানেই গানের আরম্ভ। যেখানে অনির্বচনীয় সেইখানেই গানের প্রভাব। বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে। এইজন্য গানের কথাগুলিতে কথার উপদ্রব যতই কম থাকে ততই ভালো।’ সেদিক থেকে গানে কথার প্রাধান্যকে অস্বীকার করলেও রবীন্দ্রনাথ তাতে সুরের আধিপত্যকে স্বীকার করেননি। উক্ত অভিমতের অব্যবহিত পরের বাক্যেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হিন্দুস্থানি গানের কথা সাধারণত এতই অকিঞ্চিৎকর যে তাহাদিগকে অতিক্রম করিয়া সুর আপনার আবেদন অনায়াসেই প্রচার করিতে পারে।’ আর সেখানেই রবীন্দ্রনাথের আপত্তি। অন্যদিকে বাংলাদেশে কথার আধিপত্যে সংগীতের বিশুদ্ধতা স্বাধীনভাবে বিস্তার করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ দেশজ সংগীতের বিস্তারের সঙ্কীর্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রথম থেকেই তাঁর বৈপ্লবিক চেতনা লক্ষণীয়। ‘সংগীত ও ভাব’-এর মধ্যেও তার পরিচয় বর্তমান। সেখানে মৃতপ্রায় সংগীতকে প্রাণিত করার আবেদন মূর্ত হয়ে উঠেছে।
৬
সংগীতের উদ্দেশ্যই যেখানে ভাব প্রকাশ করা, সেখানে রবীন্দ্রনাথ তার অভাববোধে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ‘ও ভাব’-এ দেশের সেই সুদিন ফিরে আসার কথায় তাঁর সেই আবেদনমুখর নিবেদনই পরবর্তীতে পরিবর্তনকামী আহ্বানে প্রকট হয়ে উঠেছে। সেখানে সংগীতের অচলায়তনের প্রাচীরকে ভেঙে ফেলে তার আবেদনকে সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তা ক্রমশ মুখর হয়ে উঠেছে। প্রৌঢ়ত্বের দ্বার অতিক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সংগীতের মুক্তি’ (‘সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪) প্রবন্ধে সেকথাই নিবিড় করে তুলেছেন। প্রকাশের সঙ্কীর্ণতায় দরবারি সংগীতের রুদ্ধগতিকে মুক্ত করার স্বার্থেই তার বিস্তার প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের কথায় : ‘…গান যদি কেবল বৈঠকখানার ভোগবিলাস হয়, তবে তাহাতে নির্জীবতা প্রমাণ করে। প্রকাশের যত রকম ভাষা আছে সমস্তই মানুষের হাতে দিতে হইবে। কেননা, যে পরিমাণে মানুষ বোবা সেই পরিমাণে সে দুর্বল, সে অসম্পূর্ণ। এইজন্য ওস্তাদের গড়খাই-করা গানকে আমাদের সকলের করা চাই। তাহা হইলে জীবনের ক্ষেত্রে গানও বড়ো হইবে, সেই গানের সম্পদে জীবনও বড়ো হইবে।’ লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে সাধারণ্যে আবেদনক্ষম করার লক্ষ্যে প্রথম থেকেই সক্রিয় হয়েছিলেন, তার পরিচয় পূর্বোক্ত অভিমতেই স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে সমাজমানসে গানের রক্ষণশীলতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রগতিশীল বৈপ্লবিক আহ্বান ছিল প্রত্যাশিত। সেজন্য তাঁর আহ্বানে সংগীতের মুক্তি তীব্রতা লাভ করেছে। তাঁর কথায় : ‘দেশের সকল শক্তিই আজ জরাসন্ধের কারাগারে বাঁধা পড়িয়াছে। তারা আছে মাত্র, তারা চলে না—দস্তুরের বেড়িতে তারা বাঁধা। সেই জরার দুর্গ ভাঙিয়া আমাদের সমস্ত বন্দী শক্তিকে বিশ্বে ছাড়া দিতে হইবে—তা সে কী গানে, কী সাহিত্যে, কী চিন্তায়, কী কর্মে, কী রাষ্ট্র কী সমাজে।’
অন্যদিকে বাংলা গানের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন যে কতটা প্রয়োজনীয় ছিল, তার হদিশও দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। আসলে তাঁকে তাঁর সংগীতকে সুধীজনের কাছে প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে কতটা উদ্যোগী হতে হয়েছিল, তার পরিচয় বক্তৃতা ও প্রবন্ধাদির মধ্যে নানাভাবে উঠে এসেছে। সেখানে দেশজ সংগীতের হালহকিকত সবই তাঁকে যেভাবে বিশ্লেষণের আলোয় তুলেধরার সক্রিয় হতে হয়েছে, তাতেই তাঁর আত্মপ্রতিষ্ঠার তীব্রতা নিবিড় হয়ে আসে। এভাবে আর কোনো শিল্প-সাহিত্যের শাখায় আমরা তাঁকে সক্রিয় হতে দেখি না। তাঁর ১৯২১-এর জুলাই-এ পাশ্চাত্য দেশ থেকে বিপুল সমাদর লাভের পর স্বদেশে ফিরে ‘সংগীত-সংঘের বার্ষিক উৎসব’-এ প্রদত্ত বক্তৃতা ‘আমাদের সংগীত’ (‘সবুজ পত্র’, ভাদ্র ১৩২৮)-এও তার পরিচয় বর্তমান। বাংলা দেশে সাহিত্যের স্বাভাবিকতা সঙ্গীতে নেই। সেখানে ‘বাণীর প্রতিই বাঙালির অন্তরের টান ; এইজন্যেই ভারতের মধ্যে এই প্রদেশেই বাণীর সাধনা সবচেয়ে বেশি হয়েছে।’ অন্যদিকে ‘বাংলা দেশে সংগীতের স্বতন্ত্র পঙ্ক্তি নয়, বাণীর পাশেই তার আসন।’ সে কীর্তনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। কেননা ‘পদের সঙ্গে মিলন হয়ে তবেই এর সার্থকতা।’ তাছাড়া ‘বাংলার আপন কোনো যন্ত্র নেই, এবং প্রাচীনকালেই হোক আর আধুনিক কালেই হোক, যন্ত্রে যাঁরা ওস্তাদ তাঁরা বাংলার নন।’ বাংলার উক্ত প্রতিকূলতাতেই ‘কাব্যের সহযোগে সংগীতের’ ‘বিকাশে’ ‘অপরূপ জিনিস’-এর কল্পনা রবীন্দ্রমানসে নিবিড়তা লাভ করেছিল। অবশ্য সেখানে বাণী ও সুরের পারস্পারিক সমন্বয়ের প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় : ‘…উভয় পক্ষেরই নিজের জিদ কিছু-কিছু না ছাড়লে মিলন সুন্দর হয় না। এইজন্যে গানে বাণীকেও সুরের খাতিরে কিছু আপস করতে হয়, তাকে সুরের উপযোগী হতে হয়।’ শুধু তাই নয়, তার অব্যবহিত পরেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সদিচ্ছাকে প্রকট করে তুলেছেন : ‘যাই হোক, বাংলা দেশে এই এক জাতের কাব্যকলা ক্রমশ ব্যাপক হয়ে উঠবে বলে আমি মনে করি। অন্তত আমার নিজের কবিত্বের ইতিহাসে দেখতে পাই—গান-রচনা, অর্থাৎ সংগীতের সঙ্গে বাণীর মিলন-সাধনই এখন আমার প্রধান সাধনা হয়ে উঠেছে।’
লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।