৭
রবীন্দ্রনাথের সেই সাধনা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছিল, তার পরিচয় তাঁর অভিমতের মধ্যেই প্রতীয়মান। বিভিন্ন পরিসরে তাঁর সখেদ আবেদনে ও আত্মতৃপ্তির আড়ম্বরের মধ্যে তার পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে। তাঁর মতো আত্মপ্রচারবিমুখ মানুষও সেক্ষেত্রে প্রকাশমুখর মনে হয়। ১৯৪০-এর জুনের ‘গীতালি’-তে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যে স্বকীয় আবেদন প্রকট হয়ে উঠেছে। তাঁর কথায় : ‘আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটা তোমরা কোরো।আরো হাজারো গান হয়তো আছে — তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি— তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কি না বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সব-কিছু সইতে হয়, এও যেন আমার পক্ষে সেই রকম।’ সেই ‘অপাত্র’-এর অসন্তোষের কথা রবীন্দ্রনাথ কত ভাবেই না ব্যক্ত করেছেন, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। তাঁর মতো স্থিতধী মানুষও সেক্ষেত্রে ‘সানুনয় অনুরোধ’ জানাতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর সেই মরীয়া আবেদন ‘গীতালি’র শেষেও নিবিড়তা লাভ করেছে।
তাঁর কথায় : ‘—এঁদের একটু দরদ দিয়ে, একটু রস দিয়ে গান শিখিয়ো—এইটেই আমার গানের বিশেষত্ব। তার উপরে তোমরা যদি স্টিম রোলার চালিয়ে দাও, আমার গান চেপটা হয়ে যাবে। আমার গানে যাতে একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে, তার চেষ্টা তুমি কোরো।’ অন্যদিকে তাঁর গানে যে ‘স্টিম রোলার’ চালানো যাবে না, তাও রবীন্দ্রনাথ জানতেন। কেননা তাঁর গানের গঠন রেলগাড়ির মতো মজবুত ও স্বপথগামী। লোহার গাড়ি, লোহার চাকা, লোহা দিয়েই তৈরি তার পথ। সেই রেলগাড়ির মত সুদৃঢ় গঠনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে সচল করতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, রেলের মতোই তার বহনের বিস্তৃতি, চলনের বিস্তার। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের পোষণের ভয় রবীন্দ্রনাথের ছিল না, তা সহজে অনুমেয়। তিনি নিজেই সেই গানের স্বরলিপিতে বাঁধা পথ সচল করে গিয়েছেন। সেদিক থেকে তাঁর গানের গঠনে নয়, চলনে ভয়। কেননা তাঁর গান যাতে স্বপথে চলে, তা নিয়েই তাঁর ভাবনা অস্থির করে তুলেছিল। এজন্য তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন অভাববোধে সরব হয়েছিলেন, তেমনি তার ন্যূনতম পরিচয়ে তাঁর মুগ্ধতাবোধে তৃপ্তির উল্লাস উঠে এসেছে । সাহানাদেবীর কণ্ঠে নিজের গান শোনার তৃপ্তিবোধের কথায় তাঁর উচ্ছ্বাসে তার পরিচয় মেলে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ১৯৩৮-এর ৪ এপ্রিলে লেখা চিঠিতে সাহানাদেবীকে জানিয়েছেন : ‘তুমি যখন আমার গান করো শুনলে মনে হয় আমার গান রচনা সার্থক হয়েছে— যে গানে যতখানি আমি আছি ততখানি ঝুনুও (সাহানাদেবী) আছে— এই মিলনের দ্বারা যে পূর্ণতা ঘটে সেটার জন্যে রচয়িতার সাগ্রহ প্রতীক্ষা আছে। আমি যদি সেকালের সম্রাট হতুম তাহলে তোমাকে বন্দিনী করে আনতুম লড়াই করে কেননা তোমার কণ্ঠের জন্যে আমার গানের একান্ত প্রয়োজন আছে।’ সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের শূন্যতাবোধেই তাঁর গানের প্রত্যাশিত সাফল্যের বিষয়টি প্রশ্নাতুর করে তোলে। অথচ তিনি যে তাতে ব্যর্থ, তাও বলা অসমীচীন।
৮
আসলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে বাংলা গানের নবদিগন্ত উনমোচন করতে চেয়েছিলেন । সেক্ষেত্রে বাঙালিমানসে তাঁর গানের গ্রহণের মাত্রায় তাঁর প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টির সক্রিয়তা নির্ভর করে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা যে সেভাবে গতি লাভ করেনি, তা তাঁর কথাতেই প্রতীয়মান। প্রসঙ্গত উল্লেখয, ১৯৩৮-এর ২১ মার্চ রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন : ‘অথচ গানের ভিতর দিয়ে আমি যে জিনিসটি ফুটিয়ে তুলতে চাই সেটা আমি কারো গলায় মূর্ত হয়ে ফুটে উঠতে দেখলুম না। আমার যদি গলা থাকত তা হলে হয়তো বা বোঝাতে পারতুম কী জিনিস আমার মনে আছে। আমার গান অনেকেই গায়, কিন্তু নিরাশ হই শুনে। একটিমাত্র মেয়েকে জানতুম যে আমার গানের মূল সুরটিকে ধরতে পেরেছিল— সে হচ্ছে ঝুনু, সাহানা।’ অন্যদিকে পরিবর্তনকামী আধুনিক বাংলা গানে কথা ও সুরের অপূর্ব যুগলবন্দি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যয়ী মনোভাব বারবারই ধ্বনিত হয়েছে। সেখানে তাঁর গানের আবেদনে যে ছকভাঙা প্রকৃতি বর্তমান, তা শুধু অভিনব নয়, অভাবিতও বটে। সুরধুনীমুখর শাস্ত্রীয় সংগীতই শুধু নয়, তানমুখর কীর্তনও সেক্ষেত্রে আপন গরিমায় ব্রাত্য হয়ে পড়ে। ১৯৩৭-এর ৪ নভেম্বরে লেখা ‘কথা ও সুর’ প্রবন্ধের শেষে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন : ‘আধুনিক বাংলাগানও একটি স্বাভাবিক বিশেষত্ব নিয়েছে। এই সংগীতে কথাশিল্প ও সুরশিল্পের মিলনে একটি অপরূপ সৃষ্টিশক্তি রূপ নিতে চাচ্ছে। এই সৃষ্টিতে হিন্দুস্থানী কায়দা আপন পুরো সেলামি পাবে না, যেমন পায় নি বাংলার কীর্তন-গানে। তৎসত্ত্বেও বাংলাগানের নূতন ঠাট বাংলার বাহিরের শ্রোতাদের মনে বিশেষ একটি আনন্দ দিয়ে এ আমাদের পরীক্ষিত। দেয় না তাঁদেরই, সংগীত-ব্যবসায়িকতার বাঁধা বেড়ার মধ্যে যাঁদের মন সঞ্চরণ অভ্যস্ত।’ তার ফলে রবীন্দ্রনাথের গানের আবেদন যেমন অশাস্ত্রীয় পরিসরে সমাজের অভিজাতদের কাছে বিরূপ হয়ে উঠেছে, তেমনি সাধারণ্যে তার বিমুখতা স্বাভাবিকতা লাভ করেছে। অন্যদিকে পেশাদারী মানসে তাঁর গান যে আনুকূল্য লাভ করবে না, সেকথা রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত স্মরণীয়, গানের আধুনিক অভিমুখে পেশাদারিত্বের প্রভাব সম্পর্কে তাঁর তীব্র সচেতনতা বর্তমান। সেখানে সংগীতের বিনোদনীর প্রাধান্যে তাঁর ‘অপরূপ’ গানের আবেদন যে ব্যাহত হবে, সে বিষয়েও রবীন্দ্রনাথ সুনিশ্চিত ছিলেন। আসলে তাঁর গান সম্পর্কে যে উচ্চ ধারণা ছিল, তার মধ্যে শুধু বিনোদন নেই, আছে শিক্ষার বনেদি পাঠও। এজন্য তিনি সংগীতকে শিক্ষার অঙ্গ মনে করতেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীতশিক্ষা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলেও রবীন্দ্রনাথ তা থেকে বিরত হননি, বরং তার মাধ্যমে শিক্ষার পরিসর আরও পূর্ণতা লাভ করুক, এই ছিল তাঁর একান্ত সদিচ্ছা। ১৩৪২-এর ফাল্গুনে লেখা ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগীতের দান’ প্রবন্ধের শেষে তিনি সবিনয়ে জানিয়েছেন, ‘দেশের সুখ দুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষা অমৃত-অভিষিক্ত গীতলোকে অমরত্ব লাভ করুক।’ সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনা শুধু তার কথা ও সুরের অপূর্ব সম্মিলনে আবদ্ধ থাকেনি, মননের ব্যাপ্তির সঙ্গেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ভোগবাদী আধুনিক বাঙালিমানসে তাঁর গানের আবেদনে পেশাদারি প্রভাবের কথা বিশেষ ভাবে স্মরণ করিয়েছেন। কেননা সেখানে বিনোদনী প্রাধান্যে সংগীতের চেতনালোক উদ্দীপ্ত হতে পারে না। সেক্ষেত্রে তাঁর মননদীপ্ত অভিনব গানের চর্চাও যে সেখানে ব্যাহত হবে, তা সহজেই অনুমেয়। রবীন্দ্রনাথ সেই অবস্থানগত পরিবর্তনের প্রতি পূর্বোক্ত প্রবন্ধেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর কথায় : ‘সরস্বতী তখন লক্ষ্মীর দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তি করতে এসে মাথা হেঁট করতেন না, লক্ষ্মী স্বয়ং যেতেন ভারতীর দ্বারে অর্ঘ্য নিয়ে নম্রশিরে। এমনি সহজেই আত্মগৌরবের প্রবর্তনায় ধনীরা দেশে সংগীতের গৌরব রক্ষা করেছেন; সে ছিল তাঁদের সামাজিক কর্তব্য। এর থেকে বোঝা যাবে সংগীতকে তখনকার দিনে সম্মানজনক বিদ্যা বলেই গ্রহণ করেছে।’ সেই সম্মানবোধ যে সময়ান্তরে পেশাদারি মনোভাবের প্রবল প্রতাপে ব্রাত্য হতে শুরু করেছে, তা ক্রান্তদর্শী কবি গভীর ভাবে অনুধাবন করেছিলেন। অবশ্য তাঁর গান প্রান্তিক হয়ে পড়েনি, বরং বনেদি আভিজাত্য লাভ করেছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান অত্যন্ত বেশি রকমের সফলকাম হয়ে উঠেছে। এজন্য বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
৯
রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে তাঁর গানের চর্চা মূলত ব্রাহ্মসমাজ ও তাঁর অনুরাগীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শাস্ত্রীয় সংগীতের উচ্চতর পরিসর থেকে বহু শাখায়িত জনসংগীতের আমদরবার কোনো ক্ষেত্রেই তাঁর গানের আবেদন মুখর না হওয়াই দস্তুর। রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তাঁর গানকে অভিনব ধারায় সক্রিয় করতে চেয়েছিলেন, তা সমকালের প্রচলিত পথে আপনাতেই বিমুখ হয়ে পড়েছিল। এজন্য তাঁর মতো ক্রমশ সার্বভৌমিক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বও স্বকীয় সংগীতের ধারাকে সমাদৃত করতে অসফল হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর সংগীতভাবনা সেক্ষেত্রে শুধু বিতর্ককে আমন্ত্রণ জানায়নি, প্রকারান্তরে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতায় তার প্রতি বিমুখতা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। এজন্য রবীন্দ্রনাথকে অনুরাগী ঘনিষ্ঠজনদের কাছে নানা ভাবে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর সংগীতভাবনা নিয়ে তাঁকে শেষ জীবনে এসেও সরব হতে হয়েছে এবং তাতে যেমন একই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, তেমনই তা নিয়ে তাঁর অস্বস্তিবোধও সংগুপ্ত থাকেনি। অথচ তারপরও রবীন্দ্রনাথ স্বল্প পরিসরের মধ্যে যেভাবে গানের প্রতিকূলতাতেও আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন, তা তাঁর অনন্য সৃষ্টিচেতনারই ফলশ্রুতি। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের জনপ্রিয় প্রকৃতির অন্তরায় যে অত্যন্ত স্বাভাবিক, সেবিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অত্যন্ত স্বচ্ছ। তাঁর গান তাঁর অনন্য সৃজনশীলতারই ফসল। শুধু তাই নয়, অনেকের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আর তাঁর সৃষ্টির বিশেষত্বই হল তার আবেদন জনের কাছে নয়, মননের দরবারে। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের লক্ষ্যে ছিল ভাবানো, ভাসানো নয়। এজন্য তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নিজগুণে, মনোপ্রিয় হয় তার স্বভাববিশেষত্বে।
প্রসঙ্গত স্মরণীয়, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবিভাগবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের পরিসরে দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে সর্বপ্রথম জনপ্রিয়তা লাভ করেন। অন্যদিকে স্বাধীন ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রূপে তাঁর গানের জনপ্রিয় অভিমুখ সম্প্রসারিত হয়েছে। সেদিক থেকে তাঁর মৃত্যুর পর জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে জনমানসে তাঁর গানের বিস্তার ঘটেছে দেশজ দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে বিতর্কের মধ্য দিয়েও যেভাবে তাঁর গানের আবেদন দুই দেশের মধ্যে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, তা তাঁর প্রত্যাশাকে একভাবে স্বীকৃতি জানায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের সক্রিয়তা কোনো রকম বাধ্যবাধকতায় নয়, আন্তরিকতার পরশে আবেদনক্ষম হওয়ার কথা বলেছেন। সেদিক থেকে তাঁর প্রাপ্তির পরিসরটি যে সংকীর্ণ হবে, তাও সহজে অনুমেয়। কেননা রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগীতে যেভাবে স্বকীয় বিশেষত্বকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করায় সক্রিয় হয়েছিলেন, তাতে তার শৈল্পিক নৈপুণ্যে জনবিচ্ছিন্ন প্রকৃতি আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের আবেদন তাঁর ব্যক্তিত্বের আলোতে যেভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার অবকাশ ছিল, তাও হতে পারেনি। এমনকি, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও তাঁর সর্বব্যাপী অকল্পনীয় প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তিত্বের পরিচয়েও সেই গানের পরিসর জনসংযোগে নিবিড় হয়ে ওঠেনি। অথচ তাঁর গানের অস্তিত্ব ক্রমশ শুধু নিবিড়তা লাভ করেনি, বাংলা সংগীতের ধারায় বনেদি আভিজাত্যে স্বতন্ত্র পরিসরে মহিমান্বিত হয়েছে। অন্যদিকে যে শৈল্পিক নৈপুণ্যে তাঁর গানের পরিচয়, তার আয়ত্তে শিল্পীর আত্মিক প্রতিষ্ঠাও উৎকর্ষমুখর। সেক্ষেত্রে তাঁর সংগীতের মাধ্যমে শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রাধান্যের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা অনেকটাই ফলপ্রসূ হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেখানে পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রেও তাঁর সংগীতের সাফল্যও বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। যে পেশাদারি মনোভাবের প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিরূপতা ছিল, তাতেই তাঁর রচিত আভিজাত্য লাভ করেছে। বাংলার আধুনিক সংগীতশিক্ষার ধারাটি মূলত তাঁর প্রভাবে বিস্তার লাভ করেছে। সেখানে তাঁর গানের শিক্ষানির্ভর পরিসরে বিশ্বভারতীর গণ্ডি অতিক্রম করে ক্রমশ দুই বাংলায় অসংখ্য সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সেই সূত্রে রবীন্দ্রসংগীতের গায়ক-শিক্ষকের পেশাদারিত্বেই শুধু নয়, শিল্পী হিসেবেও উচ্চতর সমাদর লাভের হাতছানি অত্যন্ত তীব্র । সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা অনেক বেশি মান্যতা লাভ করেছে। অথচ সেই মান্যতাবোধেও রবীন্দ্রনাথের গান সাধারণ্যে আবেদনক্ষম হয়ে ওঠেনি।
লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।