১০
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের আবেদনে প্রতিকূল প্রকৃতির মধ্যেও আত্মপ্রত্যয়ে কীভাবে সুনিশ্চিত ছিলেন, তা নিয়ে ভেবে দেখার অবকাশ বর্তমান। কেননা তাঁর সমকালে সেই গানের প্রতি শুধু সাধারণ্যেই নয়, বাংলার চর্চাতেও সংযোগের অন্তরায় অত্যন্ত প্রকট। অথচ তাতে মাটির যোগ অনুভূত হয়নি, তাও নয়। রবীন্দ্রানুরাগী সংগীত-বিশেষজ্ঞ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ প্রবন্ধে সেই মাটির যোগকে নিবিড় করে তুলেছেন। মৃত্যুশয্যায় শায়িত ভীষ্মের তৃষ্ণা নিবারণে অর্জুনের ভূগর্ভে তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে উৎসারিত জলধারার সঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিতুলনা করেছেন। তাঁর কথায় : ‘জলপান করে ভীষ্ম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। জীবনের জলধারাও তেমনি উৎসারিত হবে মাটি থেকে। রবীন্দ্রনাথও লোকায়ত থেকেই এনেছেন নবজীবন ধারা।’ সেক্ষেত্রে মাটির যোগ থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের গান সাধারণ্যে নিবিড় ওঠেনি। আসলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে যে শৈল্পিক প্রকাশ তুলে ধরেছেন, তা শুধু অভিনবই নয়, মননশীল শিক্ষানির্ভর। তার ফলে তার ক্ষেত্রপ্রস্তুতে সময়ের প্রয়োজন ছিল। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরবর্তী পরিসরে তাঁর মনীষার অতুলনীয় আলো বাঙালিমানসে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ার অবকাশে সেই সময়ের সক্রিয়তা সচল হতে থাকে। সিনেমা-রেডিও-টিভি-টেপ রেকর্ডার প্রভৃতির মাধ্যমে তার আবেদন মুখর হয়ে ওঠে । শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের সরব উপস্থিতি তাঁর গানের মধ্যেই নিবিড়তা লাভ করেছে। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা গানের আধুনিক বহু শাখাপ্রশাখার বিস্তারের মধ্যেও তাঁর গানের পরিসর ব্যাহত হয়নি। বরং আপন আভিজাত্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও তার সৌরভ উৎকর্ষমুখর বনেদিয়ানা লাভ করেছে। অথচ তার পরেও সাধারণ্যে তাঁর গানের বিস্তার ঘটেনি।
রাবীন্দ্রিক বৃত্তে রবীন্দ্রসংগীতের সক্রিয়তায় তার আবেদন স্বাভাবিক ভাবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে শিক্ষাশোভন বাঙালিমানসে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার ভূমি লাভের আধারে তাঁর সংগীতের চর্চা বিস্তার লাভ করে। সেখানে তাঁর গানের মধ্যে তাঁর পরশই সুরভিত হয়ে ওঠে। অবশ্য তাতেই যে তাঁর গান জনমানসে নিবিড় হয়ে উঠেছে, তাও না। রবীন্দ্রনাথের রচিত গান বলেই তাঁর মাহাত্ম্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে সমীহ জেগে উঠলেও তার অসাধারণত্বে উদাসীনতাও নেমে আসে। অন্যদিকে সাধারণ্যে তাই আবার রবি ঠাকুরের গান বলে ‘আমাদের নয়’-এ উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। এজন্য শুধু রবীন্দ্রসংগীতের শৈল্পিক প্রকৃতিকে দায়ী করা সমীচীন নয়। সাধারণ জনমানসে তাঁর গানের সুরের শৈল্পিক পরিসরে যেমন বিনোদনের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের অভাব অত্যন্ত তীব্র, তার কথার ব্যঞ্জনাও তেমনই সুদূরপ্রসারী। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষা করে আপন করে যাপন করাও দুরূহ হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের গানের স্বকীয় বিশেষত্বই তার অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। সেদিক থেকে তাঁর গানের সংযোগের ফাঁকেও ব্যবধান থেকে যায়। সাধারণ্যে এই ব্যবধান নানা ভাবে সচল রয়েছে। সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
১১
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের কথাকে লোকায়ত পরিসর থেকে রচনা করলেও তার ব্যঞ্জনা লোকাতীতে প্রসারিত হয়েছে। সেখানে তাঁর গানের অভিব্যক্তি যেভাবে জনমানসে উঠে আসে, তার মধ্যে বিস্তর ফাঁক ও সবিশেষ ফাঁকি থেকে যায়। সুপরিচিত নৃত্যের গানের মধ্যে মৃত্যুর মুখর প্রকৃতি সংগোপনে থেকে যায়। তাঁর বহুল প্রচারিত ‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে’তে তার পরিচয় নিবিড় ওঠে। আবার সাধারণের ধারণায় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে দেখার পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশেনী’ গানটি। অথচ তা ‘বহু- বাল্যকালে’ শোনা ‘তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে?’ গানের একটিমাত্র পদ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ উক্ত গানটি রচনা করেন। ‘জীবনস্মৃতি’তেই সেই গানের কথাকে তিনি নিবিড় করে তুলেছেন। সেই ‘বিদেশিনী’ কোনো মানবী নয়, অচেনা আত্মিক সত্তা। প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন : ‘সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশ্বমোহিনী বিদেশিনী দ্বারে আমার গানের সুর আমাকে আনিয়া উপস্থিত করিল এবং আমি কহিলাম—
ভুবন ভ্রমিয়া শেষে/ এসেছি তোমারি দেশে, / আমি অতিথি তোমারি দ্বারে, ওগো বিদেশেনী।
ইহার অনেকদিন পরে একদিন বোলপুরের রাস্তা দিয়া কে গাহিয়া যাইতেছিল—
খাঁচার মাঝে অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।
দেখিলাম বাউলের গানও ঠিক ঐ একই কথা বলিতেছে। মাঝে মাঝে বদ্ধ খাঁচার মধ্যে আসিয়া অচিন পাখি বন্ধনহীন অচেনার কথা বলিয়া যায়— মন তাহাকে চিরন্তন করিয়া ধরিয়া রাখিতে চায় কিন্তু পারে না। এই অচিন পাখির নিঃশব্দ যাওয়া-আসার খবর গানের সুর ছাড়া আর কে দিতে পারে।’ আবার উক্ত আধ্যাত্মিক গানটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’র আত্মিক যোগ বর্তমান। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের অনির্বচনীয় ব্যঞ্জনা সাধারণ্যে অধরা থাকায় তার প্রত্যাশিত প্রাণের যোগ নিবিড় হতে পারে না। তার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ নানা ভাবেই বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি করে। এই যেমন ‘এ মণিহার আমায় না সাজে’র মধ্যে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বাঙালি বিদ্বৎসমাজের সংবর্ধনার প্রত্যুত্তরে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটার কথা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অথচ গানটি ১৯১৩-তে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা (১৩ নভেম্বর )-র পূর্বেই (২৪ আগস্ট) লন্ডনে রচিত যখন নোবেলপ্রাপ্তির সংবাদই ছিল না।

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর ব্যক্তিজীবনের আধারে সম্পৃক্ততাবোধে তার ভাবের পরিসরটিও তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ায় সেই বিভ্রান্তির অবকাশ রয়ে গেছে। সম্প্রতিতেও তার পরিচয় লক্ষণীয়। ১৩ আগস্ট (২০১৮) আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘কলকাতার কড়চা’য় ‘দুই ধারা’ শিরোনামে নামে প্রকাশিত কড়চায় জানানো হয়, ‘কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর’ পর ‘রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন “আমার প্রাণের ‘পরে চলে গেল কে/ বসন্তের বাতাসটুকুর মতো।” অথচ গানটি কাদম্বরীর মৃত্যুর (১২৯১-এর বৈশাখ) বছরখানেক পূর্বেই ১২৯০-এ ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে পরের দিনই (১৪ আগস্ট) ‘সম্পাদক সমীপেষু’-তে পাঠকের সংশোধনী চিঠি প্রকাশিত হয়। আসলে শিক্ষাশোভন বাঙালিমানসেও রবীন্দ্রসংগীতে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের ছায়া কায়া হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে তাঁর গানের মধ্যে তাঁকে খুঁজে পাওয়া বা দেখার ঝোঁক বর্তমান। সেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশায় ফাঁক ও ফাঁকি দুটোই অত্যন্ত সজীব। একে উপলব্ধির অক্ষমতা, তার উপরে তাঁকে মিলিয়ে নেওয়ার বাতিকের সক্রিয়তা, উভয়ই তাঁর গানের আবেদনকে সর্বজনীনতায় প্রশস্ত করতে পারেনি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথই আবার তাঁর গানের বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের আলোয় যেমন তাঁর গানের সম্প্রসারণ ঘটেছে, তেমনই তাঁর স্বকীয় আদর্শের মোড়া সংস্কৃতিচেতনায় সেই গানের জনবিচ্ছিন্ন প্রকৃতি সজীবতা লাভ করেছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সংস্কৃতির মাধ্যমে যেভাবে তাঁর গানের পরিসর বনেদি আভিজাত্য লাভ করেছে, তার আধারেই আবার জনপরিসর অপ্রশস্ত হয়ে উঠেছে। শৈল্পিক শুদ্ধতার পরিসরে তাঁর গানের জনসংযোগ আপনাতেই ব্রাত্য হয়ে পড়েছে। সেদিক থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’ই রবীন্দ্রসংগীতের জনসংযোগে প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে। যে বাঁধন শৈল্পিক রূপের অপরূপ হয়ে ওঠার মূলধন, তাই যদি বাধার বেষ্টনী হয়ে যায়, স্বাভাবিক ভাবেই তার বিমুখ প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে সেই রুদ্ধ পরিসর আপনাতেই প্রকাশমুখর। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রসংস্কৃতির আধারে যেভাবে সেই গানের প্রকাশকে শুদ্ধতায় আবদ্ধ রাখার প্রয়াস বর্তমান, তার মধ্যেও সেই রুদ্ধ প্রকৃতি পল্লবিত হয়ে ওঠে। কোন পোশাক-পরিচ্ছেদে শিল্পী রবীন্দ্রগাইবেন, তাও সেখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একালের শিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরীর জিন্স পরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া নিয়ে বিতর্ক হয়েছে (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ মে ২০১৩)। সেই বিতর্ক নানাভাবে সজীবতা লাভ করে। অন্যদিকে কলকাতার ট্রাফিক মোড়ে রবীন্দ্রসংগীত বাজানো নিয়েও বিতর্ক বর্তমান। আসলে রবীন্দ্রনাথের মহত্তর ও বৃহত্তর ব্যক্তিত্ব যে তাঁকে শুধু অমানবিক অস্তিত্বে সামিল করেনি, তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের আভিজাত্যে উগ্র রক্ষণশীলতা নেমে এসেছে। সেখানে রবীন্দ্রনাথের পরিবর্তনকামী মানসিকতাও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তাঁর গানের ক্ষেত্রে সেই পরিচয় অত্যন্ত প্রকট মনে হয়।
১২
সাধারণ্যে শিল্পের বিস্তারে তার রূপের বিকৃতি ঘটলেও, শুদ্ধতার অবনমন অনিবার্য হলেও তা জনমানসে নতুন ভাষা প্রদান করে। শিল্পের এই ভাষিক প্রকাশ তার শিল্পত্বের মহিমাব্যঞ্জক। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গান শিল্পরূপে সার্থকতা লাভ করলেও তা সাধারণের ভাষা হয়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে সংরক্ষণী শুদ্ধতায় তাঁর প্রত্যাশা পূরণ স্বাভাবিক ভাবেই অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের গানের অধিকার সেখানে সীমিত মনে হয়। এ বিষয়ে শান্তিদেব ঘোষ তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন : ‘সম্প্রতি দু-একজন রবীন্দ্রসংগীত বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্রসংগীতের এইরূপ ব্যাপক চর্চা ও প্রচারের বৃদ্ধিতে যেভাবে ভীত হয়ে পড়েছেন তা লক্ষ্য করার মত। তাঁরা বোধহয় চাইছেন, রবীন্দ্রসংগীতকে তাঁদের গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে। ʼ সেখানে গণশিক্ষার মতো রবীন্দ্রশিক্ষার প্রসারে তার সদগুণের অভাববোধের অজুহাতে তাকে সংরক্ষণের পরিসরে আবদ্ধ করা যে সমীচীন নয়, তাও শান্তিদেব ঘোষ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। গণশিক্ষার মতো তার বিস্তারের ‘সুযোগʼকে কাজে লাগানোর পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। সেদিক থেকে শিক্ষানির্ভর রবীন্দ্রসংগীতের আবেদন শিক্ষাশোভন বাঙালিমানসের কাছেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সেকথা শান্তিদেব ঘোষের বক্তব্যের মধ্যেও উঠে এসেছে। অথচ সেখানেও রবীন্দ্রনাথের গানের সংযোগ নিবিড় হয়ে ওঠেনি। রবীন্দ্রনাথের অ-মানুষিক ভাবমূর্তিতে সহজতার অভাববোধ সক্রিয়তা লাভ করে। তার নেপথ্যে রয়েছে রবীন্দ্রানুরাগীদের তীব্র শ্রদ্ধাজাত রক্ষণশীল মানসিকতার অনুশাসিত পরিসর। সেখানে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাড়পত্র মেলে না। কপিরাইট উঠে যাওয়ার পরেও তার পরিসর একই রকম থেকে যায়। তার ফলে তাঁর গানের বিচিত্র পথে সহজতার অভিমুখ সম্প্রসারিত হতে পারেনি। তিরিশের দশক থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার-প্রসার শুরু হয়েছিল। অথচ সেই ধারাতেও তার বিস্তার অভ্যাসবশে বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। সেখানে চলচ্চিত্রের গান তার সময়োপযোগী নিত্য নতুনত্বের হাতছানিতে সাধারণ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে, আমজনতার মুখে মুখে ফেরে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের গান সেই মুখর মুখকেই মূক করে রেখেছে। অথচ রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে বাঙালির মুখেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে আলাপকালে তিনি অকপটে জানিয়েছেন (‘সাহিত্য, গান, ছবিʼ) : ‘আমি নিশ্চিত জানি যে আমার কবিতা গল্প নাটকের ভাগ্যে ভবিষ্যতের দরবারে যা-ই জুটুক, আমার গান বাঙালি জাতিকে নিতেই হবে, আমার গান গাইতেই হবে সকলকে, বাংলার ঘরে ঘরে, প্রান্তরে প্রান্তরে, নদী তীরে।ʼ সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশায় তাঁর গানের ‘সবচেয়ে স্থায়ীʼ বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ না থাকলেও তার বিস্তার নিয়ে তার সক্রিয়তা আজও বিদ্যমান। সেখানে তাঁর গান তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
রবীন্দ্রনাথ যেভাবে গানকে তাঁর ভাবের ভাষা করে তুলেছেন, সেই গান সেভাবে জনমানসের ভাষা হয়ে ওঠেনি। সেখানে শিক্ষিত বাঙালিমানসে ভাবের ঘরে চুরি করার সম্ভাবনা থেকে গেছে। আপাত ভাবে বোলপুরের অনতিদূরে ট্রেনের কামরায় যখন জনৈক গায়কের রবীন্দ্রসংগীতের শোনানোর পর অর্থের জন্য দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত হয়, তখন রবীন্দ্রনাথের বিস্তারে আমরা পরমার্থ বোধকরি। অথচ রবীন্দ্রনাথই তার কৃত্রিমতায় ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। গানকে তিনি কৃত্রিম পণ্যে পরিণত করতে চাননি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সহজপাঠʼ- এর ‘হাটʼ কবিতায় সেই পণ্যে বিস্ময়বোধ করেছেন। তাঁর ভাষায় : ‘অন্ধ কানাই পথের ‘পরে / গান শুনিয়ে ভিক্ষে করে !ʼ সেই পণ্যসংস্কৃতিতেও বিপন্ন রবীন্দ্রনাথের গান। সেখানে গানের শিল্পরূপের প্রাধান্যে তার ভাষিক সংযোগ আপনাতেই গৌণ হয়ে পড়ে। সুধীর চক্রবর্তীর কথায় রবীন্দ্রনাথের দু- তিন শো গান জনপ্রিয়। সেদিক থেকেও তাঁর গানের সিংহভাগ এখনো অন্তরালে থেকে গেছে। অন্যদিকে কানাইদের কণ্ঠে কিন্তু জনমানসের চাহিদাই প্রতিফলিত হয়। সেখানে বোলপুর স্টেশন ছাড়ার পর সেই কণ্ঠের নীরবতাই বলে দেয় তার পরিসর কত সীমিত, কতটা কৃত্রিম। আর তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের গানের ট্রেনটি ধনে-মানে ক্রমশ উচ্চতর আসন লাভ করলেও তার বিস্তার যে জনগণের মনে এসে ঠেকেনি। কেননা ট্রেনের চলন যে নিজের পথেই সীমাবদ্ধ। গানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেকে সঁপে দিলেও বাঙালি তাঁর গানে রবি ঠাকুরকেই দেখে থাকে। সেদিক থেকে তাঁর প্রত্যাশা শিল্পরূপে মুখর হলেও জনমানসের ভাষায় এখনও মূক হয়ে রয়েছে। আমুদে বাঙালি পূজাকে উৎসবে মিলিয়ে নিলেও রবীন্দ্রনাথের প্রাণের গান সেখানে নীরবতা পালন করে, ভাবা যায়।
লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।