প্রত্যয়ের সোপানে প্রত্যাশার আগমন ঘটে। সেই আগমনই আভিজাত্যবোধে আবির্ভাবে স্বপ্নরঙিন হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে বাংলার সংগীতের আসরে রবীন্দ্রনাথের আগমনকে কোনোভাবেই আবির্ভাব বলা সমীচীন নয়। কেননা তাঁর সংগীতের স্বতন্ত্র আবেদনের পরিসর আকস্মিকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেনি, তেমনই তার প্রতি সর্বজনীনতার অভাববোধ সুদীর্ঘকাল সক্রিয় ছিল এবং এখনও বর্তমান। অর্থাৎ রবীন্দ্রসংগীতের আগমনে আবির্ভাবের দীপ্তি ছিল না, ছিল না তার আবেদনে বিস্ময়কর নবদিগন্তের মুগ্ধতাবোধ। অথচ রবীন্দ্রনাথ স্বরচিত গানের বিষয়ে যেভাবে তার স্থায়িত্বে আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন (‘সবচেয়ে স্থায়ী আমার গান’), আপাতভাবে তা তাঁর স্বভাব্বিরুদ্ধ মনে হবে। ‘বিচিত্রের দূত’ হিসাবে বহুমুখী প্রতিভার অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের আধারে তাঁর পরিচয় ক্রমশ বিস্ময়কর হিসাবেই মান্যতা লাভ করেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রায় (মহাকাব্য বা সাহিত্যজীবনের ঊষালগ্ন ব্যতীত গাথা ও আখ্যানকাব্য প্রভৃতিতে তিনি সচেতনভাবেই বিরত ছিলেন।) সব শাখাতেই তাঁর অবাধ বিস্তার এবং উৎকর্ষমুখর আবেদনে তিনি অগ্রদূতের ভূমিকায় সফলকামও হয়েছেন। অথচ তারপরেও তাঁর আত্মিক পরিচয়ে কবির বিনয়ী অভিব্যক্তিই প্রকট হয়ে উঠেছে। জীবনের উপান্তে এসে তাঁর সেই বিনয়ী প্রকৃতি সবুজ সজীবতা লাভ করে। সপ্ততিতম জন্মদিবসে প্রদত্ত ভাষণে রবীন্দ্রনাথ সেকথাই স্মরণ করিয়ে দেন। ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত (জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮) তাঁর বক্তব্যে সেই আত্মিক পরিচয়টি প্রকট করে তুলেছেন।
তিনি জানিয়েছেন : ‘জীবনের এই দীর্ঘপথ প্রদক্ষিণ করতে করতে বিদায়কালে আজ সেই চক্রকে সমগ্ররূপে যখন দেখতে পেলাম তখন একটা কথা বুঝতে পেরেছি যে, একটিমাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছুই নয়, আমি কবি মাত্র। আমার চিত্ত নানা কর্মের উপলক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নানা জনের গোচর হয়েছে। তাতে আমার পরিচয়ের সমগ্রতা নেই।’ সেক্ষেত্রে আনন্দমুখর সৃষ্টির বৈচিত্র্যে ‘বিচিত্রের দূত’ হলেও কবি-পরিচিতিতেই তাঁর আত্মিকতা স্পষ্টতা লাভ করেছে। বক্তব্যের শেষে তারই নিবিড় অভিব্যক্তি : ‘যারা মাটির কোলের কাছে আছে, যারা মাটির হাতে মানুষ, যারা মাটিতেই হাঁটতে আরম্ভ করে শেষকালে মাটিতেই বিশ্রাম করে, আমি তাদের সকলের বন্ধু, আমি কবি।’ সেই সার্বভৌমিক কবি-পরিচিতি নিয়েও কবির প্রত্যয় যেমন প্রত্যাশার আধারে প্রকট না হয়ে বরং কবি-কল্পনায় বিস্তার ঘটেছে মাত্র, তা নিয়ে তাঁর কোনো চিরন্ততার আস্ফালন নেই। অন্যদিকে তাঁর কবিসত্তার বিস্তারের অভাববোধ কবিকে অকপট করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবিতকালের শেষ কাব্য ‘জন্মদিনে’র ১০ নং কবিতায় (২১ জানুয়ারি ১৯৪১) সেকথা সবিনয়ে নিবেদন করেছেন। কবির ভাষায় : ‘আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি / আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি, / এই স্বরসাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক– / রয়ে গেছে ফাঁক।’ সেই ‘ফাঁক’টি আরও স্পষ্ট করেছেন কবি : ‘আমার কবিতা, জানি আমি, / গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।’ এজন্য কবির প্রতীক্ষাও ব্যক্ত হয়েছে : ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি, / সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।’ সেদিক থেকে তাঁর স্বরচিত গানের আবেদনে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠার কথায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন, তা শুধু ব্যতিক্রমই নয়, অভাবনীয়ও বটে। সেই গানের কথাও এসেছে ১০নং কবিতাটিতে এবং তাতেও রয়েছে অপূর্ণতাবোধ। কবির ভাষায় : ‘জীবনে জীবন যোগ করা / না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা। / তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা / আমার সুরের অপূর্ণতা।’ অথচ তাতেও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা বর্ণহীন হয়ে পড়ে না, ব্রাত্যতায় প্রান্তিক মনে হয় না। কেননা তাঁর আত্মবিশ্বাসের বহুধা ব্যাপ্তিই সেকথাই প্রত্যয়সিদ্ধ করে তোলে। এজন্য এবার সেই প্রত্যাশার সোপানটি ফিরে দেখা প্রয়োজন।
২
উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরিত পরিসরে বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পালাবদলে সক্রিয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরপরিবারের শিক্ষাশোভনসাংগীতিক পরিবেশে রবীন্দ্রনাথ বেড়ে উঠেছেন। সেখানে তাঁর সংগীতচর্চা সাহিত্যচর্চার মতোই স্বতঃস্ফূর্ত সহজাত প্রতিভায় বিকশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতের প্রতি তাঁর সমান আগ্রহ প্রথমাবধি সচল ছিল। সেখানে তাঁর কাব্যভাষার মতো গানের ভাষায় নিজেকে মেলেধরা সদিচ্ছা স্বাভাবিকতা লাভ করে। প্রায় একই সময়ে দুটি ধারায় নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিক থেকে কাব্যচর্চার পাশাপাশি সঙ্গীতে স্বতন্ত্র আভিজাত্য বজায় রেখে তার বিপুল আয়োজনে স্বনামেই বাংলা গানের ভাঁড়ারটি শুধুমাত্র সমৃদ্ধ করেননি, দিয়েছেন বনেদি আভিজাত্য। সুদীর্ঘ সত্তর বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন, স্বরলিপি প্রস্তুতিতে সক্রিয় থেকেছেন এবং প্রথমাবধি গান নিয়ে ভেবেছেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার বিলেত যাওয়ার (১৮৮১) উদ্যোগের পূর্বে মেডিকেল কলেজের হলের সভায় প্রথম যে প্রবন্ধটি পড়েছিলেন, সেটির বিষয় ছিল সংগীত (‘সংগীত ও ভাব’, ‘ভারতী’, জ্যৈষ্ঠ ১২৮৮)। সেদিক থেকে তাঁর সংগীত নিয়ে চিন্তাভাবনার সূচনা কাব্যচর্চার কালেই। শুধু তাই নয়, তাঁর আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রেও কাব্য ও সংগীতের মেলবন্ধনের পরিচয় প্রথম দিকের কাব্যপ্রবাহেই প্রতীয়মান। ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ (১৮৮২), ‘প্রভাতসঙ্গীত’ (১৮৮৩), ‘ছবি ও গান’ (১৮৮৪) সবেতেই সংগীতের অনুষঙ্গ বর্তমান।

অন্যদিকে কাব্যচর্চার প্রায় সমান তালে সংগীতচর্চার ফসলও প্রকাশিত হয়েছে। ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ (১২৯১), ‘রবিচ্ছায়া’ (১২৯২), ‘গানের বহি ও বাল্মীকিপ্রতিভা’ (১৩০০) প্রভৃতি। সেইসঙ্গে তাঁর কাব্যগ্রন্থেও স্বরচিত গানের অন্তর্ভুক্তিও লক্ষণীয়। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে গানে তাঁর স্বকীয়তার পরিচয় শুধু আত্মিকতায় পূর্ণ নয়, সহজাত প্রতিভায় প্রকাশমুখর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একসময় (‘গীতাঞ্জলি’ পর্বে ) তাঁর গানের প্রাচুর্যে কাব্যরসের অভাববোধের সমালোচনাও কবিকে শুনতে হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁর সংগীতচর্চা কাব্যচর্চাকেও ছাপিয়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছিল। দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় (শান্তিনিকেতন, ৩১ ডিসেম্বর ১৯২৬) রবীন্দ্রনাথ সেকথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায় : ‘একদিন আমার পাঠকেরা দুঃখ করে বলেছিলেন ইদানীং আমি কেবল গানই লিখছি। বলেছিলেন—আমার কাব্যকলায় কৃষ্ণপক্ষের আবির্ভাব, রচনা তাই ক্ষয়ে ক্ষয়ে বচনের দিকে ছোটো হয়েই আসছে।’ অন্যদিকে নানাভাবে তাঁর গানের বিপুল বিস্তারই বাংলা গানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। দেশ-বিদেশের সুরে কথা বসিয়ে রচনা করেছেন অজস্র গান যার প্রকৃত সংখ্যা নিয়েই বির্তক বর্তমান। তাঁর ‘গীতবিতান’-এ প্রায় দুই হাজার (সুরারোপিত গান ১৯১৫) গানের গীতিকার স্বয়ং তিনি। বর্তমানে তাঁর গানের স্বরলিপি ৬৬টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে ৩২ জন স্বরলিপিকারের উপস্থিতি বর্তমান। সেক্ষেত্রে বাংলা গানের বিপুল ভাণ্ডারী হিসাবে রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী সত্তায় তাঁর সংগীতের ভূমিকা যে অনস্বীকার্য, তা সহজেই অনুমেয়। শুধু তাই নয়, প্রকাশের আভিজাত্যে গানের প্রতি তাঁর দুর্বলতাবোধ যেভাবে ব্যক্ত হয়েছে, অন্যকোনো মাধ্যমে তা হয়নি। এবিষয়ে তাঁর প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অসাধারণ হয়ে উঠেছে।
৩
জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের বিষয়ে গভীর আস্থা ব্যক্ত করেছেন এবং তা যে ফলপ্রসূ হয়েছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করেছেন রবীন্দ্রস্নেহধন্য রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী শান্তিদেব ঘোষ। ‘দেশ’-এর সাহিত্য সংখ্যা ১৩৯৮ তথা রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরে তাঁকে ফিরে দেখার আয়োজনে শান্তিদেব ঘোষ ‘বাঙ্গালী জীবনে রবীন্দ্রসংগীত’ শীর্ষক প্রবন্ধে সেই প্রত্যাশার অবতারণা করেছেন এবং তার প্রাপ্তিতে স্বীকৃতিও জানিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে। রবীন্দ্রনাথের কথায় : ‘….জীবনের আশি বছর অবধি চাষ করেছি অনেক। সব ফসলই যে মরাইতে জমা হবে তা বলতে পারি নে। কিছু ইঁদুরে খাবে, তবু বাকি থাকবে কিছু। জোর করে বলা যায় না। যুগ বদলায়, কাল বদলায়; তার সঙ্গে সবকিছুই তো বদলায়। তবে সবচেয়ে স্থায়ী আমার গান এটা জোর করে বলতে পারি। বিশেষ করে বাঙালীরা, শোকে দুঃখে, সুখে আনন্দে, আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে।’ গুরুদেবের বলিষ্ঠ প্রত্যাশা দীর্ঘদিন পরে ‘সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে’ বলে শান্তিদেব ঘোষের মনে হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলায় সবচেয়ে বেশি গানের রচয়িতা হিসাবে নন্দিত কাজি নজরুল ইসলামও তাঁর গানের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। সরাসরি গানের ভাষাতেই তাঁকে নয়, তাঁর গানকে ভালোবাসার কথা বলেছেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তা নিবিড় করে তুলেছেন, তা তাঁর অন্যকোনো সৃষ্টিকর্মের জন্য প্রয়োজনবোধ করেননি। আর এখানেই তাঁর গানের প্রতি নিবিড় আত্মিকযোগের বিষয়টি প্রত্যাশার নেপথ্যে প্রত্যয়ের সোপানে আমাদের সামিল করে। আসলে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানেও তাঁর স্বকীয় মনীষার প্রতিফলনে সক্রিয় হয়ে তার পালাবদলে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে চেয়েছিলেন। সেদিক থেকে বাংলা গানের বদ্ধভূমিকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা যেমন অভিনব, তেমনই বৈপ্লবিক। অথচ সেই অভিনবত্ব যেমন সাধারণ্যে সমাদর লাভ করেনি, তাঁর বৈপ্লবিক প্রয়াসও বিতর্ককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সেই বিতর্কের জবারের আধারেই রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনার পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। তাঁর ‘সংগীতচিন্তা ’র সিংহভাগ রচনাই সেই বিতর্কের ফসল। অন্যদিকে জনমানসে সমাদর লাভ না করলেও তাঁর গান সম্পর্কে উচ্চধারণার প্রত্যয় ছিল বলে রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে গান না শেখার ব্যর্থতার কথায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। যেন গান না শেখার জন্যই তাঁর গানের উৎকর্ষমুখর স্বকীয়তা লাভ করেছে। আদতে তা কিন্তু নয়। (চলবে)
লেখক : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।