সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা নদীমাতৃক বাংলায় বৃষ্টির নিরঙ্কুশ আধিপত্য হৃদয়ে আনে বৈচিত্র্যময়তা।
কালো মেঘের বুক চিরে আগুন জ্বালানো দামিনী, দুয়ার কাঁপানো বজ্রনিনাদ, নদীর উপচে পড়া জলরাশি বর্ষার প্রকৃত আগমনী বার্তা বহন করে।
জন্মকাল থেকেই বৃষ্টির সঙ্গে আমার সখ্যতা অগাধ। তাই, বৃষ্টির গল্প হবে অথচ ছোটবেলার প্রসঙ্গ উঠে আসবে না, তা কখনো হয়। তখন যে ঘটনাগুলো ঘটে তার সঠিক প্রকাশ হবার সুযোগ হয়না। তবে মধ্যবয়সে এসে স্মৃতির জাবর কাটতে মন্দ লাগে না।
স্কুলে ঠিক যাওয়ার সময় যদি ‘ঘন গৌরবে আসে উন্মাদ বরষা।’ তখন সঙ্গী হতো ‘দামে কম, মানে ভালো’ কালো কাপড়ের লোহার শিকওয়ালা ঢাউস ছাতা। রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে এপাশ, ওপাশ করে যাওয়ার সময় ঝপাশ করে পা পড়তো গর্তে। ব্যস, জুতো মোজা জামা ভিজে ঢোল। প্রচুর ভিজে ক্লাসরুমে এলে দিদিমনির সহানুভূতি চোখে পড়লে পাওনা হতো ছুটি। সহপাঠিনীদের চোখে টলমল ‘ঈর্ষাবাসা’ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসার গৌরবই ছিলো আলাদা।
আর যেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হতো, তখন মা বলতো “ওগো, আজ তোপা যাস নে ঘরের বাহিরে।”
সেদিন হতো ‘রেনি ডে:’

অদ্যপি, বৃষ্টি নিয়ে আমার কোনও আদিখ্যেতা নেই, উল্টে আছে বিরক্তিকতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৃষ্টির ব্যবহার কিছুটা অভদ্র, গায়ে পড়া গোছের। স্যাঁতস্যাঁতে জামাকাপড়, ভেজা দেশলাই, কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তা, ট্রেন-বাস-অটোতে সাইড সিটে ছাতা খুলে গা শুকনো পা ভিজে অবস্থা, অন্যের ছাতার জলে হাত ভেজা, নালা হাইড্রেনের মোহনায় হাঁটু ডুবিয়ে চলতে হলে কালো মেঘের অপরূপ শোভা এড়িয়ে রাস্তার শেডরূপী শোভা তখন কাঙ্খিত হয়ে পড়ে।
বৃষ্টির দামিনী রূপ ভেঙে ফেলে নদীর দুকূল, ইট কংক্রিটের শহরের ড্রেনেজ সিস্টেমকে করে ব্যাহত।
অতিরিক্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার ও অসাবধানতাবশত সেগুলো যত্রতত্ৰ ফেলে দেওয়ার প্রবণতা ড্রেনেজ সিস্টেমে জ্যাম লাগিয়ে দেয়।
ইচ্ছা করে মেঘপিওনের হাতে চারটি হেটস্পিচ লিখে পাঠাই। আরো ইচ্ছা করে, সেই কালো ছাতার বাঁটটা দিয়ে মেঘের পিঠে দু-চার ঘা দেওয়ার। যখন তখন বৃষ্টি পড়ার ব্যাপারটা একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।
কিন্তু করিনা, কারণ বৃষ্টি না হলে গাছপালা সব শুকিয়ে যাবে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। অন্নের জন্য গোটা দেশটা ভরসা করে কৃষির বা কৃষক ভাইয়ের কাঁধের উপর। আর আউস-আমন-ইরি ধান এই সময় রোয়া হয়।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় কচি চারাগুলো রূপ নেয় গাঢ় সবুজে। সতেজতা জানান দেয় নব যৌবনের। নদী পুকুর ভরে ওঠে টলটলে জলে। মাইলের পর মাইল হেঁটে যাদের জল বয়ে আনতে হয় যাদের, দীর্ঘদিন যারা বৃষ্টি থেকে ব্রাত্য, বৃষ্টি তাদের কাছে আশীর্বাদ।
শ্রাবণ মাস যে শ্রবণের। তাই বৃষ্টির উদযাপনের অংশ হিসাবে কিছু কর্তব্য-অকর্তব্য পালন করতে হয়। এখন বৃষ্টি পড়লে ‘রিম-ঝিম গিরে সাওন, সুলগ সুলগ জা-এ মন’— শুনতে শুনতে জানালা বন্ধ করি বৃষ্টির ঝাপটা থেকে ঘরের জিনিস শুকনো রাখতে।
সুন্দর লেখা, সহজ ভঙ্গীতে, আন্তরিক।
Dhonyobad ????