যুগস্রষ্টা রামমোহনকে নিয়ে আমাদের কৌতূহলের অন্ত নেই। তাঁর এক পা পুবে আর এক পা পশ্চিমে।আমাদের জাতির জীবনের এক সংকটময় মুহূর্তে বিচিত্র আলো আঁধারির পটভূমিকায় রামমোহনের আর্বিভাব।কেবল আর্থ – রাজনৈতিক সংকটই নয়, সেই সময়কালের সামাজিক জীবন তখন নানা দিক দিয়ে বিপর্যস্ত, অবক্ষয়ের ক্লেদ সমাজভূমিতে সঞ্চিত করেছে বিষাক্ত অন্ধকারের বীজ। আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতি সেই অন্ধকারে বিষবৃক্ষের ছায়ায় লালিত হতে হতে ক্রমশকালের গড্ডলিকা প্রবাহে হারিয়ে যাচ্ছ। আর এক অদ্ভূত চোরাস্রোতে ভেঙে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যের সৌধ। আমাদের বহু বছরের সঞ্চয়ের ধন, বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, মূল্য বোধ আর বিশ্বাসের ভিত। সেইরকমই এক হতভাগ্য সময়ে আমাদের বিস্মরণের প্রত্নগুহায় হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো রামমোহনের আবির্ভাব সচকিত করেছিল এই যুবককে।ঠিক আজ থেকে ২৫০ বছর আগে।
২২ মে। আর একটা শুভ জন্মদিন এসে গেল। বুদ্ধিজীবীরা জড়ো হবেন।নেতা – মন্ত্রীরা আসবেন।কচিকাঁচাদের নিয়ে প্রভাতফেরি হবে। এরপর রামমোহনের আবক্ষমূর্তিতে মাল্যদান করে স্মৃতিচারণ করবেন। রামমোহনকে নিয়ে কিছু করা দরকার — এই ভাবনাও নেতা-মন্ত্রীদের উঠে আসবে। তারপর মিষ্টিমুখ করে যে যার বাড়ির পথে হাঁটবেন। এ চিত্র দেখতেই অভ্যস্থ রাধানগরের মানুষ। এবারে কানাঘুষা শুরু হয়েছে রামমোহনের ২৫০ বছর জন্মদিন পালন হবে। তাও নাকি এবারে ধূমধাম করে হবে। স্থানীয় নেতারা গ্রামের মানুষের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফেলেছেন। এমনকী স্থানীয় প্রশাসন ও জেলাপরিষদের উদ্যোগে রামোহনকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতে এক বিশেষ কার্যকরী কমিটিও গঠন হয়েছে। শ্রদ্ধাঞ্জলিতে যাতে খামতি না থাকে এজন্য সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এদিকে আবার রাধানগর পল্লীসমিতির দাবি তারা আলাদাভাবে রামমোহনের জন্মস্থানেই তাঁকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাবে। আবার এখানে বেঁকে বসেছে বিধায়করা। যেহেতু জন্মদিন নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হয়নি, এজন্য তাঁরাও পিছিয়ে নেই। একই জায়গায় এঁরাও জন্মদিন পালন করবেন। ২৫০ বছর জন্মদিন পালন নিয়ে খানাকুলের রাধানগরে হৈচৈ ব্যাপার। কিন্তু জনগণের এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
মানুষের বক্তব্য, আধুনিক নবজাগরণের যিনি পথিকৃৎ। কিম্বা প্রাচীন অন্ধ বিশ্বাস আর কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করে আধুনিক ভারতে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন রামমোহন রায়। তিনিই প্রথম ভারতের সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক নবজাগরণের ক্ষেত্রে যুক্তিবাদের বৈপ্লবিক পতাকাটি তুলে ধরেছিলেন প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ভারত পথিক’ নামে। তাইতো তিনিই লিখতে পারেন রামমোহন সম্পর্কে ‘বর্তমান সমাজের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন রামমোহন রায়। আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি’। আবার জহরলাল নেহেরু তাঁকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ হিসাবে। অথচ রামমোহনের জন্মস্থান আজও অনাদরে, অবহেলায় পড়ে আছে। পর্যটক বিমুখ। হতাশ। এ চিত্র আজও দেখা যাবে।
জনমানসে ক্ষোভ, রামমোহনের মৃত্যুর পর বহু বছর কেটে গেছে। রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। কিন্তু রামমোহনের ভাব-ভাবনা, কর্মাদর্শকে তুলে ধরার বিন্দুমাত্র কাজ হয়নি। এমনকী রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় নকশা করা মন্দির, মসজিদ ও গির্জার আদলে রামমোহন স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়েছিল তাও জীর্ণ অবস্থা। ভেতরে রামমোহনের ভাবনায় যে তৈল চিত্র রাখা ছিল তার অধিকাংশ নষ্ট হয়েছে।
এদিকে রঘুনাথপুর গ্রামে রামমোহন যে ৩৩ বিঘার উপর বসতবাটি ও আমের বাগান তৈরি করেছিলেন তা আজও আছে। তবে অক্ষত নেই। বসতবাটির শেষ অংশটুকু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে। তবে উন্নতমানের আমগাছগুলি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। এখানে বসতবাটির সামনেই দাদা জগমোহনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী অলকমঞ্জরীদেবীকে এখানে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। সেটি আছে। বাগানের মধ্যেই গড়ে উঠেছে রামমোহনের সংগ্রহশালা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখানে কিছুই নেই। বিনোদনের জন্য পার্ক আছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, অপকর্ম বেশি হয়। সন্ধ্যা নামলেই দুষ্কৃতিদের দখলে চলে যায়। এতে হুঁশ নেই প্রশাসন ও নেতাদের।
মানুষের আরও অভিযোগ, জন্মস্থানে রামমোহন নামাঙ্কিত লাইব্রেরি আছে কিন্তু তা বন্ধ। কংগ্রেস আমলে ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন। কথা দিয়েছিলেন এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে। আজও তা হয়নি। এমনকী এই মহামানবের নামে দেশের কোথাও এখনো পযর্ন্ত একটিও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেনি। তাছাড়া দেশের প্রথম রেলযাত্রী হয়েও তাঁরই জন্মস্থানে এখনও রেলের ছোঁয়া লাগেনি। বাম আমলে একটি বি পি এড কলেজ তৈরি হবে বলে শিলান্যাস হয়। সবই এখন বিশবাঁও জলে। বর্তমান সরকার রামমোহনের উন্নতিকল্পে এক নতুন বার্তা দিয়েছে। সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে হেরিটেজ বলে। এবার দেখার পালা মানুষের। মানুষের বক্তব্য হেরিটেজের তকমা খুশি করেছে ঠিকই। কিন্তু যতক্ষণ এখানে কিছু উন্নয়ন না হচ্ছে মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। প্রতিবছর মেলা হবে, জন্মদিন পালন হবে। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হবে। অথচ উন্নয়ন হবে না, এটা মানুষ মানতে পারছে না। মানুষ উন্নয়ন দেখতে চায়।
প্রসঙ্গত রেনেসাঁস থেকে উদ্ভূত মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ, বৈজ্ঞানিক অন্বেষা, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, উদারনৈতিক গণতান্ত্রিকতা ইত্যাদি আধুনিকতার লক্ষণগুলো রামমোহনের মধ্যে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, এছাড়া সমাজ সংস্কারক হিসেবে সতীদাহ প্রথা রদে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই তিনি যুগস্রষ্টা। আবার প্রথম আধুনিক ভারতীয়। রামমোহন মনে করতেন ভারতের নবজাগরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান ভিত্তিক বহুমুখী আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই বিশিষ্ট রামমোহন অনুরাগী মিস কালেটের কথায় বলতে হয় ‘সভ্যতার ইতিহাসে এটি একটি স্মরণীয় দিন। এতদিন পশ্চিম গেছে পূর্বদেশে। এবার রামমোহনের সঙ্গে পূর্ব এল পশ্চিমের দেশে। এত কিছুর পরেও রামমোহনকে নিয়ে ভাবার উদ্যোগ সারা দেশ তো বটেই পশ্চিমবঙ্গেও তেমনভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। স্বভাবতই মানুষের মনে ক্ষোভ জমছে। ২৫০ বছর পরেও রামমোহনকে নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এলাকার মানুষ এটাই মেনে নিতে পারছে না। তাই এদের শেষ বক্তব্য রামমোহন আমাদের ঘরের ছেলে। চিরকাল থেকে যাবে আমাদের হৃদয়ে নীরবে শ্রদ্ধার সঙ্গে।
ধন্যবাদ