ভালো ওষুধ তেঁতো হয়। যা রোগীকে খাওয়াতে হয় জোর করে। যে রোগী জোর করলেও খেতে চায় না, মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে সেই রোগীই চেয়ে খেতে চায় সেই ওষুধই।
রাজা রামমোহন রায় ভারতবর্ষের পক্ষে সেই তেঁতো ওষুধ। আজ থেকে ২৩০ বছরেরও আগে যিনি হিন্দু সমাজে বলেছেন মূর্তিপুজো মিথ্যে। বেদ থেকে উপলব্ধি করে যিনি কুসংস্কারে ডুবে থাকা, জাতপাতে মাখামাখি হয়ে থাকা দেহাতিদের শোনাচ্ছেন ‘ওঁ তৎ সৎ’। তুমিই সে; সে-ই তুমি। ঈশ্বরে তোমাতে ভেদ নাই। অভেদ।
এতে ঈশ্বরের তথাকথিত এজেন্ট ব্রাহ্মণদের চটে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাদের সেই টিকিনাড়া রাগের আগুনে ঘি ছিটিয়ে বললেন আরও মারাত্মক কথা। কি বললেন? নারীদের শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। বিবাহের নামে কন্যা বিক্রি ও পণপ্রথা বন্ধ করতে হবে। স্বামী ও পিতার সম্পত্তিতে তাদের অধিকার আইনসিদ্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে বহুবিবাহের মত অশ্লীল প্রথা। দাহ করে দিতে হবে সতীদাহ প্রথা টিকে।

শক্তিশালী ব্রাহ্মণ সমাজ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ব্রিটিশ শাসকের দরবারে আবেদন করলেন সতীদাহ প্রথাটিকে চালু রাখার জন্য। এই অমানবিক নিষ্ঠুর নক্কারজনক প্রথাটি আর যাতে ফিরে না আসে সেজন্য ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলে নিজে উপস্থিত থেকে ওকালতি করার জন্য ‘কালাপানি’ পার হলেন রামমোহন। এবং সতীদাহ প্রথাটিকে ভারতবর্ষের মাটি থেকে চিরতরে মুছে দিতে সক্ষম হলেন। ভারতীয় হিন্দু মহিলারা এজন্য তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার প্রকাশ কোথায়? লেখকের মূল আক্ষেপ এখানেই। এত মহিলা কমিশন গঠিত হয়েছে। এখন আইনসভার এক তৃতীয়াংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। তবু বৃহত্তর ক্ষেত্রে মহিলা সমাজ রামমোহনকে স্মরণ করছেন কোথায়? একটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আজও কি তাঁর নামে নামাংকিত করা যায় না?
কুশিক্ষার সে ঘন অন্ধকার সময়ে কত বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের গঙ্গার জলে বিসর্জন দিতেন, বৃদ্ধ মরনাপন্ন মানুষদের রেখে আসা হত গঙ্গার ধারে, তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শেয়াল কুকুরের পেটে চলে যেতেন। যে প্রথার গালভরা নাম ছিল ‘অন্তর্জলী যাত্রা’। রামমোহন এই দুই ‘ঘাট মার্ডার’ প্রথাকে সমূলে উচ্ছেদের ব্যবস্থা করেছিলেন। অথচ তাকে কতই না নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল। তাকে নিয়ে তির্যক গান বাঁধা হয়েছিল—’বেটা সুরাইমেলের মূল/বেটার বাড়ি খানাকুল।
রামমোহন রায় তাঁর সমগ্র জীবনটা ভারতের কল্যানের জন্য সঁপে দিয়েছিলেন।
ভারতবর্ষের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় উন্নতি, অর্থনৈতিক প্রগতি, ভারতীয় মূল শিক্ষাব্যবস্থার সংগে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষা ও শিল্প (ইনডাস্ট্রি) শিক্ষার প্রসার, বিচার বিভাগীয় সংস্কার প্রভৃতি কাজ তিনি অদম্য জেদ ও পরিকল্পনার সংগে নিরলস প্রচেষ্টায় কেবল মাত্র ভারতীয়দের উতকর্ষতা সাধনের জন্য করে গেছেন। আজ থেকে ২৩০ বছর পূর্বে তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিলেন। আাজ যে বিশ্বব্যাপী মুক্ত বানিজ্যের প্রসার ঘটেছে এর প্রবক্তা তিনিই। তিনিই সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের কথা প্রথম বলেছেন। এমন একজন মহান দার্শনিক, মহামানব এখন খানাকূলে জীর্ণ স্মৃতি মাত্র।
ভারতীয় হিসাবে তিনিই প্রথম রেল যাত্রী। তিনি ইংলন্ডে লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টারে যাওয়ার জন্য রেলে চড়ে ছিলেন। লেখক আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পরিসেবা হওয়া সত্বেও ভারতীয় রেল রামমোহন রায়ের জন্ম স্থানে আজও পৌঁছতে পারলো না! এ ঘটনা ভারতবাসীর লজ্জা! তৈরী হল না একটি লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম।

অভিরাম গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথজী এবং সংলগ্ন রাধাগোবিন্দের অনন্য ভাস্কর্যের দুটি মন্দির, আমবাগান, ভাঙা বাড়ি, রবীন্দ্রনাথ নির্দেশিত সর্ব ধর্ম সমন্বয় নকশার মেমোরিয়াল হল, অনতিদূরেই জনপ্রিয় ঘন্টেশ্বরের শিব মন্দির আার অপূর্ব নদী মাতৃক পরিবেশে সুবিশাল রামমোহনের মূর্তি, আন্তর্জাতিক মানের মিউজিয়াম ও লাইব্রেরি এবং ভারতীয় রেল যুক্ত হলেই একটি জনপ্রিয় পর্যটন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে খানাকূল। রামমোহন রায়ের প্রতি যে দীর্ঘ উদাসীনতা ও উপেক্ষা তাও দূর হয়ে যাবে তাহলে।
একবিংশ শতাব্দীর আকাশজয়ী সমাজে দাঁড়িয়ে আমরা কি রামমোহনী তেঁতো ওষুধকে আপন করে নেবো না? কেবল তাঁকে রাজা বলেই ডাকবো, হৃদয়ের রাজা করে নেবো না? ভারতপথিক, নবজাগরনের পথিকৃৎ বলেই শুধু আখ্যায়িত আর প্রদীপের তলায় ঘন অন্ধকারে তাঁকে রেখে দেবো— এ দ্বিচারিতা মানা যায় না!
সুলেখক নভেন্দু সামন্তও খানাকুলের ভূমিপুত্র। তাই হয়তো অত্যন্ত দরদ দিয়ে, আবেগ মিশিয়ে, প্রমাণিত তথ্যের আভরণে সাজিয়ে মরমী পাঠকদের উপহার দিয়েছেন তাঁর এই বইটি— “RAJA RAMMOHUN ROY STILL NEGLECTED BY HIS NATION” সুললিত ইংরাজিতে এ পাঠ সুখদায়ক ও সংরক্ষনযোগ্য। অনুযোগ একটিই, বইটির পাতায় পাতায় কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি থাকলে চোখকে আরও আারাম ও মুগ্ধতা দিতে পারত। আশা করা যায় লেখক বইটির পরবর্তী সংস্করনেই এ বিষয়ে উদ্যোগী হবেন।
রামমোহন এখনও এ দেশে উপেক্ষিত। এ দেশের লজ্জা। খুব দ্রুত এর নিবারণ প্রয়োজন। নভেন্দুবাবুর এ উদ্যোগ ফলপ্রসু হোক এই প্রার্থনা করি।
????????