নভেম্বরের হাল্কা শীতে দিগন্ত বিস্তৃত ডুয়ার্সের সবুজ জঙ্গল, নীল পাহাড়, পাখির কলরবে মুখরিত আকাশ বাতাস… প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় ডুব দিতে চাইলে ঘুরে আসুন আলিপুরদুয়ার জেলার রাজাভাতখাওয়ায়। নামটা শুনেই যেন মনে হয় কোথাও এক গল্প লুকিয়ে আছে এই স্থানে। ভ্রমণের সঙ্গে যেনে নেওয়া যাক এই পর্যটন কেন্দ্রের ইতিহাস।

কোচবিহারের রাজার সঙ্গে ভূটান রাজার সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। পাহাড় ছিল ভুটানের সীমানা আর পাহাড়ের পাদদেশ থেকে কোচবিহারের রাজত্ব। সমস্যা শুরু হলো ১৭১৪ সালে যখন মহারাজ উপেন্দ্র নারায়ণ সিংহাসনে বসেন। তিনি লালবাই নামে এক নর্তকীর প্রেমে এমনই আসক্ত ছিলেন যে রাজ্যপাটে তার বিশেষ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হতো না। রাজার সেনাধ্যক্ষ নাজিরদেব তিনিও রাজধানী ছেড়ে বেরতেন না, ফলে যা হবার তাই হল। বক্সাদুয়ারের কাছে চেকাখাতাতে প্রত্যেক বছর ভুটানের থেকে বাৎসরিক উপহারের বিনিময়ে কোচবিহারকে দিতে হতো দ্বিগুণ মূল্যের উপঢৌকন। অথচ কোন এক সময়ে ভুটানের রাজা কোচবিহারের রাজাকে কর দিত।

১৭৬৫ সালে ত্রয়োদশতম রাজা হিসাবে কোচবিহারের সিংহাসনে বসেন ধৈর্যেন্দ্রনারায়ণ। রাজা হওয়ার পর তিনি ভুটানের আধিপত্য অস্বীকার করতে থাকেন। চেকাখাতাতে বার্ষিক উপঢৌকনের বিনিময়ে ভুটানের রাজা দেবরাজ তাঁর সেনাপতি পানসুতমা কে পাঠান। ধৈর্যেন্দ্রনারায়ণ এবং তাঁর দেওয়ানকে বন্দী করার জন্য। পানসুতমা তাদের বন্দী করে প্রথমে বক্সায় তারপর ভুটানের রাজধানী পুনাখাতে নিয়ে আসেন। এমত অবস্থায় কোচবিহারের রাজপরিবার রাজাকে উদ্ধার ও রাজ্যরক্ষার জন্য তৎকালীন নাজিরদেব ও অন্যান্য রাজকর্মচারীগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দারস্ত হলেন। কোম্পানির সৈন্যবাহিনী গেল রাজা কে উদ্ধার করার জন্য। ফলে ধৈর্যনারায়ণ মুক্ত হলেন এবং তার সঙ্গে কোচবিহার ভুটিয়া মুক্ত হলো।

রাজা মুক্তি পেয়ে তার অনুচর বর্গকে সঙ্গে নিয়ে বক্সা হয়ে কোচবিহারের পথে অগ্রসর হন। দীর্ঘ বন্দিদশার পর রাজার মুক্তির আনন্দে কোচবিহারের রাজপুরুষগণ রাজাকে অভ্যর্থনার জন্য বক্সার দিকে চেকখাতার সন্নিকটে এক মহাভোজের আয়োজন করেন। এই ভোজসমারোহে আয়োজন করা হয় বাঙালি ট্রেডিশনাল খাবার ভাতের সঙ্গে নানান রকমের পদ। রাজার অন্ন গ্রহণের সেই জায়গার নাম রাখা হয় রাজাভাতখাওয়া। এই কথাটি স্মরণীয় করার জন্য বনদপ্তরের তৈরি মিউজিয়ামের গায়ে রাজার সপার্ষদ ফিরে আসার একটি দৃশ্য চিত্রিত আছে।

চেকাখাতাকে মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না কিন্তু আলিপুরদুয়ার জংশনের কাছে চেচাখাতা বলে একটি জায়গা আছে। রাজভাতখাওয়া বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের প্রবেশদ্বার কালচিনি ব্লকের অন্তর্গত বাংলার কুড়ি-তম জেলা আলিপুরদুয়ারের অধীন। আলিপুরদুয়ারের আগের স্টেশন রাজভাতখাওয়া। এখানে ঘুরতে আসার সেরা সময় হলো হালকা শীতের মরশুম। বর্ষাকালে যেহেতু প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় তাই প্রতিবছর ১৫ জুন থেকে ১৫ ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বনগুলি পর্যটকদের জন্য বন্ধ করা থাকে। বন দপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাজাভাতখাওয়ায় জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা আছে। যার ধার্যমূল্য ১,৮০০ টাকা, এছাড়া জঙ্গল প্রবেশের জন্য জনপ্রতি ১২০ টাকা অনুমতি কর লাগে। জঙ্গলের মাঝখানে সেগুন গাছ পাহারা দেওয়ার জন্য একটি উঁচু কাঠের টাওয়ার দেখা যায়।

কিছুটা এগিয়ে গেলে জলহীন শুষ্ক বালি ও নুড়ি ভর্তি বক্সাঝোড়া নদীর ওপারে ২৬ মাইল ওয়াচ টাওয়ার। ফেরার সময় উল্টোদিকে ২৫ মাইল জঙ্গল। এই মাইল দিয়ে নামকরণের কারণ হিসেবে জানা যায়, কোচবিহারকে শূন্য মাইল ধরে রাজার আমলে তৈরি রাস্তাগুলির উপর কোন অবস্থানকে এইভাবে নির্দেশিত করা হতো।
অতীতের ব্রিটিশ সরকার গাছ লাগানো, গাছ কাটা এসব কারণে গারদের নিয়ে গারো পরিবারদের নিয়ে একটি বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু ম্যালেরিয়ার দাপটে গারোরা উজাড় হয়ে যেতে বসে। সরকার তার বদলে রাভা, নেপালি, ওঁরাও, মুন্ডা, মালপাহাড়িদের নিয়ে প্রায় চারশোটি পরিবারের বাসস্থান বর্তমানে। গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সবুজ জলের বামনিঝোড়া।

পরিবেশে শকুনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র। এখান থেকেই প্রায় ২০টি হোয়াইট ব্যাক শকুন (White Backed Vulture) পরিবেশে ছাড়া হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ট্রান্সমিটার টার্মিনাল (PTT) দ্বারা এগুলোর উপর নজরদারি চালানো হয়ে থাকে। বিপন্ন শকুন প্রজাতিকে সংরক্ষনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র।
আগে ফরেস্ট ডিভিশনাল অফিস ছিল রাজভাতখাওয়ায়, এখন সেটি আলিপুরদুয়ারে চলে গিয়েছে। তার বদলে ফরেস্ট গেস্ট হাউস আছে যা বনদপ্তরের উন্নয়ন পর্ষদের পর্যটন আবাস। চাইলে আপনি অনলাইনেও বুকিং করতে পারবেন।

সুন্দর ছিমছম একটি স্টেশন রাজভাতখাওয়া। স্টেশনের বিল্ডিং ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। রেললাইন ধরে শিলিগুড়ির অভিমুখে দুপাশে চোখ ফেললে দেখা যায় নীল পাহাড়ে ঘেরা অর্কিড, জঙ্গল, নদী, পশুপাখি চেনা-অচেনা গাছপালার অপূর্ব সমাহার। তরাইয়ের বাতাসে ভেসে আসে হেমন্তের প্রথম শিশির স্নাত চা পাতার সুবাস। সবুজ প্রকৃতির কোলে অসংখ্য পাখির কলরবে সেই স্বর্গীয় চায়ের স্বাদ পেতে আসতে হবে আপনাকে এই ঐতিহাসিক স্থানে।
Source: Various sources have been referred to for information.
অপূর্ব ছবি আকর্ষণ করে ভ্রমনের ইচ্ছা দ্বিগুণ করবে,চমৎকার “রাজাভাতখাওয়া”
ইতিহাস কথা বলে উঠলো পেজ ফোরের পাতায়।আকর্ষক প্রতিবেদনে মুগ্ধতা।
আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত হলাম। ধন্যবাদ ????
খুব সুন্দর লিখেছেন,, যাবার ইচ্ছে রইলো
থ্যাংক ইউ ????
রাজভাতখাওয়া সম্পর্কে পড়লাম, জানলাম কোচবিহারের রাজা ও ভুটানের রাজার অতীত দ্বন্দ্ব। সুন্দর একটি প্রতিবেদন।
খুব খুশি হলাম প্রিয় কবি।
খুব সুন্দর তথ্যবহুল লেখা ও জানা অজানা ইতিহাস।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????
Khub bhalo lagllo…ami besh koyekbar gaychhi…Alipurduar junction e Amar bhai thake…khub bhalo lage…aapnar lekha mane natun kichhu jante pari…porte besh bhalo lage…
বাহ! খুব ভালো লাগল।