হঠাৎই কিছু কাজের প্রয়োজনে অক্টোবরের শুরুতেই দিল্লী যেতে হলো। গেলাম আমার ছোটবেলার পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে স্মৃতির রোমন্থন করতে করতে। সম্ভবত প্রথম রাজধানীতে চড়েছিলাম ১৯৮৩ সালে, চেয়ার কারে। ছোট ছিলাম বলে, আমি আর বোন একটা চেয়ারেই বসেছিলাম। সেই সময় রাজধানীতে সফর করা ছিলো মধ্যবিত্তের কাছে স্ট্যাটাস সিম্বল। চেয়ার কারের ভাড়া ছিল ৯০টাকা। এরপর বহুবার যাওয়া হয়েছে এই ট্রেনে, তবু আজও আমার কাছে রাজধানী এক্সপ্রেসে যাওয়ার এক অন্য আকর্ষণ রয়ে গেছে।
শতভাগ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রথম দিল্লি থেকে কলকাতা রাজধানী এক্সপ্রেস চালু হলো ১৯৬৯ সালের পয়লা মার্চ, বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে দিল্লি থেকে ছেড়ে পরের দিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে হাওড়ায় পৌঁছায়। এই ১৪৫১ কিলোমিটারের যাত্রা ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিটে সম্পন্ন হয় যা ভারতীয় রেলের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড গড়ে তোলে।।আর হাওড়া থেকে দিল্লি যাবার প্রথম ট্রেন ছাড়লো ৩রা মার্চ।

সপ্তাহে দুদিন চলত — হাওড়া থেকে বিকালে পাঁচটায় প্রতি বুধবার আর শনিবার আর দিল্লি থেকে প্রতি সোমবার ও শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায়। অচিরেই রাজধানী এক্সপ্রেস গোটা দেশের ট্রেন সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়ে উঠলো তার দুর্নিবার গতির জন্য। ১৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা স্পিড রাখা হলো গড়ে। যা অবিশ্বাস্য ছিল ১৯৬৯ সালের তরুণ গণতন্ত্রে। ধীরে ধীরে রাজধানী এক্সপ্রেস নামটি গতির সমার্থক শব্দ হয়ে উঠলো। স্টেশন কাঁপিয়ে, অপেক্ষারত যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাজকীয় চালে ছুটে চলল।
শুরুতে ট্রেনে ছিল এসি ফার্স্ট ক্লাস, এসি চেয়ার কার আর দুটি লাউঞ্জ কার। এসি ফাস্ট ক্লাসের ভাড়া ছিল ২৮০ টাকা। ভাবুন সেই আমলের ২৮০ টাকা আজ প্রায় দশ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিটি ট্রেনে থাকা লাউঞ্জ কোচে এসে বসতেন যাত্রীরা। থাকতো উইন্ডোসাইট গদিমোড়া চেয়ার, যেখানে সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন রাখা আর প্যান্ট্রি কার্ডের ওয়াটার এসে জানতে চাইতো চা কফি কোকাকোলা কি খাবেন?

এটি দেখেই হয়তো অনেকেই বলেন সত্যজিৎ রায় পরিচালিত, উত্তম কুমার শর্মিলা ঠাকুর অভিনীত “নায়ক” ছবিতে যে ট্রেনটিকে দেখানো হয়েছিল সেটি নাকি রাজধানী এক্সপ্রেস। আমার তো বরাবরই মনে হয়েছিল ওটা রাজধানী এক্সপ্রেস হওয়ার কথা নয়। কারণ নায়ক ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৬ সালে, তখন রাজধানী এক্সপ্রেসের অস্তিত্ব ছিল না।
দিল্লি এবং কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীদের উচ্চ চাহিদার কারণে এবং হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেসে বুকিংয়ের বিদ্যমান চাপ কমাতে ২০০০ সালের ১লা জুলাই প্রথম শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেস, শিয়ালদহ থেকে নতুন দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বিকেল ৪.৫০ মিনিটে শিয়ালদহ ছাড়ার পর ডিজিআর দুর্গাপুর, আসানসোল জংশন, ধানবাদ জংশন, গয়া জংশন, পণ্ডিত ডিডি উপাধ্যায় জংশন, কানপুর সেন্ট্রাল হয়ে পরের দিন সকালে ১০.১০-এ নতুন দিল্লি পৌঁছায় এই কু ঝিকঝিক রেলগাড়ি।
সময়ের সাথে সাথে রাজধানীর সজ্জা বিন্যাসেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ‘চেয়ার কার’ শারীরিক স্বাচ্ছন্দের পরিপন্থী– এই যুক্তিতে উঠে যায়।

১৯৮৩ সালে রাজধানী এক্সপ্রেসে এসি টু টায়ার আসার পর, ১৯৯৩ সালে চলে এলো এসি থ্রি টায়ার যা ভারতের সবথেকে শক্তিশালী জনগোষ্ঠীকে কাছে টানার একটি উত্তম প্রক্রিয়া। এই জনগোষ্ঠীর নাম “মিডিল ক্লাস” এবং ঠিক এই কারণেই বাঁধের লকগেট খুলে গেল তার পরবর্তী বছরগুলোতে। অন্তত বারোটা এসি থ্রি টায়ার কোচ যোগ করা হলো রাজধানীর সঙ্গে।
রাজধানী করে যাওয়ার পথে জানলা থেকে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেতাম রেল লাইনের পাশে কত গ্রামবাসীকে। কাউকে দেখতাম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ট্রেনের দিকে, দল বেঁধে বাচ্চারা হাত নাড়ছে, হয়তো বা কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বলছে, ওই দেখো সবথেকে দামি ট্রেনটা যাচ্ছে। এইসব দেখে বা ভেবে বেশ আত্মতৃপ্ত হতাম বৈকি।

রাজধানী এক্সপ্রেসে উঠলে সর্বদা একটি আক্ষেপ প্রায় সময় শোনা যায়। সে আজ হোক কিংবা ১০ বছর আগে, একই দীর্ঘ নিঃশ্বাস — খাবার দাবার আর আগের মত ভালো নেই। নিয়ম হলো ট্রেনে উঠলেই একটি করে জলের বোতল দেওয়া হয়। তারপর ইভিনিং স্নাক্সস। এরপর সন্ধ্যার পর একটি স্যুপ যেটা আজকাল টু টায়ার এবং ৩ টায়ারে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে ডিনার, দই এবং আইসক্রিম। আগে থেকেই জেনে নেওয়া হয় ভেজ বা ননভেজ কোনটি আপনি খাবেন, সেই অনুযায়ী খাবার সাপ্লাই হয়। পরের দিন সকালে মর্নিং টি ও বিস্কিট এবং এরপর ব্রেকফাস্ট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ফিশ ফ্রাই, মাছের ঝোলের মত বাঙালি মেনু চালু করা হয়েছিল, পরবর্তীকালে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আগে টিকিটের দামের সঙ্গে খাবারের পয়সা ধরে নেওয়া হতো। এখন টিকিট বুকিং-এর সময় আপনি খাবার নেবার অপশন দিতেও পারেন, নাও দিতে পারেন। আপনি ট্রেনে থেকে অনলাইনেও খাবার বুকিং করে, খাবার নিতে পারেন।
সে যাই হোক, খাওয়ার শেষে ধবধবে দুটি সাদা বিছনার চাদর, মাথার বালিশ এবং কম্বল চাপা দিয়ে ঠান্ডায় দুলতে দুলতে ঘুমাতে কার না ভালো লাগে! এই বেডরোলটি সাপ্লাই করে রাজধানী এক্সপ্রেস। রেলের কোচে যাত্রীদের জন্য ওয়াই ফাই-এর সুবিধাও রয়েছে।

রাজধানী শব্দটি উচ্চারণের মধ্যে কোথাও যেন একটি আত্মতৃপ্তি আছে, তাই বন্দে ভারতের যুগেও রাজধানী এক্সপ্রেস নামটি একটি ব্র্যান্ড। এই জন্যই কিশোর উপন্যাসের নাম হয় “রাজধানী এক্সপ্রেসের হত্যারহস্য”, সিনেমার নাম হয় ‘রাজধানী এক্সপ্রেস।’ দেখতে দেখতে ৫৪ বছর কেটে গেল ভারতীয় রেলের চিরকালীন সম্রাটের। এইভাবে এগিয়ে চলো দুর্নিবার গতিতে ভারতের সামাজিক গরিমার স্টেটমেন্ট — রাজধানী এক্সপ্রেস।।
পরিবেশন বেশ ভালো হয়েছে। সত্যিই সম্রাট গতির নিরিখে।
থ্যাঙ্ক ইউ।