২০১৯-এর লোকসভা ভোটের ফল বেরনোর পর থেকে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট পর্যন্ত সময়কাল ছিল বিজেপিতে যোগ দেওয়ার মরশুম। অন্যদিকে একুশের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর মনে হচ্ছে শুরু হতে চলেছে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার মরশুম। ভোটের ফলাফল বেরনোর ঠিক এক মাসের মাথায় শুরু হয়ে গিয়েছে সেই প্রক্রিয়া। ইতিমধ্যে একাধিক জেলাতে গেরুয়া শিবিরের আভ্যন্তরীণ কলহ আর তার থেকে শুরু হয়েছে দলের ভাঙন। দলে দলে লোক যোগ দিচ্ছে তৃণমূলে। তার মধ্যে প্রভাবশালী নেতারাও যখন রয়েছেন তখন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তা অবশ্যই চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।
বিধানসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই বিজেপি নেতাদের বেসুরো হওয়া শুরু হয়েছে। এটা ঘটনা যে বিজেপি এই বিরাট বিপর্যয়কে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাদের বাংলা জয়ের স্বপ্নে কারও আপত্তি না থাকলেও, তারা ধরেই নিয়েছিল যে বাংলা অর্ধেক দখল হয়েই গিয়েছে। তাদের ভাবনায় কতটা খাদ ছিল সেটা যেমন তারা বুঝছে পাশাপাশি ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী সময়ে বিজেপি দলের অবস্থা কতটা ভঙ্গুর সেটাও প্রমাণিত হচ্ছে। মনে হয় বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা বৃথা হবে। কারণ যতই তারা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি গড়ুন আর যাই করুন দলবদলু নেতাদের বেসুরো হওয়া আটকানো যাবে না। তারা আর রাজ্য সরকারের সমালোচনা চাইছেন না, বরং কেন বিজেপির এই হাল হল, মানুষ কেন নিল না তাঁদের তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করছে।
বিধানসভা ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর মুকুল-পুত্র শুভ্রাংশু ফেসবুকে লেখেন, ‘জনগনের সমর্থন নিয়ে আসা সরকারের সমালোচনা করার আগে, আত্মসমালোচনা করা বেশি প্রয়োজন’। এর পরেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরে। নাম না করে তিনি কি নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী-কে কটাক্ষ করলেন? নাকি সার্বিকভাবে গোটা বিজেপি শিবিরকেই বিঁধলেন শুভ্রাংশু? হতে পারে এই পোষ্টের মাধ্যমে শুভ্রাংশু তাঁর পুরনো দল তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসার বার্তা দিতে চাইছেন।
সম্প্রতি শুভ্রাংশুর পথে হেঁটেই রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা অনেক হল— এই শিরোনামে যা লিখেছেন তাতে একদিকে যেমন তিনি মমতার সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন, তেমনই বিজেপিকে সমালোচনা বা দিল্লির ভয় দেখানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শও দিয়েছেন। তিনি একথা লিখেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কুৎসা করে, তীব্র হিন্দুত্ববাদী প্রচার করে যে বিজেপি ভালো ফল পায়নি, তা তো দেখা গিয়েছে, তাই এবার জুজু দেখানো বন্ধ করা জরুরি। নিজের গড় ডোমজুড়ে হেরে গিয়ে নিজেকে অন্তরালে রেখেছিলেন। মাঝে শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সারা জীবন শ্রদ্ধার বার্তা দিয়েছিলেন। রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বিজেপির পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছিলেন। সেই বৈঠকে মুকুল রায়ের পাশাপাশি রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ও গরহাজির ছিলেন। বৈঠকে শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি গঠনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির কাছে ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে দরবারের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে রাজীব ফেসবুকে তাঁর আর্জি জানান নেতৃত্বকে।
রাজীবের পর দলের নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন বিজেপি নেতা সব্যসাচী দত্ত। বিধানসভা ভোটে বিজেপির বিপুল পরাজয়ের কারণ নিয়ে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন মেয়র সব্যসাচী দত্ত অভিযোগ করেছেন, মমতার যোগ্য প্রতিপক্ষ তৈরি করতে পারেনি বিজেপি। যার জেরেই এই শোচনীয় হার। যে বিজেপি তৃণমূলকে সাফ করার টার্গেট নিয়েছিল, সেই বিজেপি নেতারা আজ একের পর এক প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন। নেতাদের প্রকাশ্যে মুখ খোলা নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে দিলীপ ঘোষদের। সোমবার রাজ্য সভাপতির জরুরি বৈঠকে ছিলেন না রাজীব, মুকুল, সব্যসাচী, শুভেন্দু এমনকী শমীক ভট্টাচার্যও। যদিও শমীক ভট্টাচার্যের বাবা মারা যান বলে দিলীপ ঘোষ সাংবাদিক বৈঠকে জানান। এই বৈঠকেই শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি গড়ে দেন দিলীপ ঘোষ। তিনি দলের নেতাদের কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় দলের বিরুদ্ধে কোনও কথা লেখা যাবে না। তারপরই রাজীব আর সব্যসাচীর বিস্ফোরক মন্তব্য ভেসে ওঠে ফেসবুকের পাতায়।
মুকুল রায়কে নিয়ে জল্পনা শুরু হয় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের শুরুর দিন থেকে। তারপর কিছুদিন আগেই মুকুল পত্নীকে দেখতে ও শুভ্রাংশুর সঙ্গে অভিষেকের আলাপচারিতা জল্পনাকে আরও উসকে দেয়। তার উপর অভিষেকের ইস্যু নিয়ে বিজেপির সঙ্গে মুকুল-শুভ্রাংশুর তরজা জল্পনার মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তার উপর সোমবার রাজ্য সভাপতির জরুরি বৈঠকে হাজির না থাকা কার্যত বিজেপির সঙ্গে মুকুলের দূরত্বের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
দিলিপ ঘোষের বৈঠক নিয়ে মুকুল জানিয়েছেন, এদিন কোনও বৈঠক বা আলোচনা আছে বলে তিনি জানেনই না। তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। মুকুল রায় আরও জানিয়েছেন, ‘আমি এখন এ সবের মধ্যে নেই। নিজের যন্ত্রণায় জ্বলছি।’ প্রসঙ্গত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন মুকুল পত্নী। বেসরকারি হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে রয়েছেন তিনি।
তবে তৃণমূল ছেড়ে যে নেতারা বিজেপিতে গিয়েছিলেন এখনও তাঁরা সেই দলেই কিন্তু একুশের ভোটযুদ্ধের ফলাফল প্রকাশিত হতেই তাদের মানসিকতা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। যতই সময় গড়াচ্ছে ততই তাদের আক্রমণের অভিমুখে পড়ছেন গেরুয়া শিবিরের মাথারা। সেই মাথাদের লক্ষ্য করেই একের পর এক আক্রমণ শানাচ্ছেন শুভ্রাংশু, রাজীব, সব্যসাচীরা। সেই আক্রমণের জেরেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে তাদের ‘ঘর ওয়াপ্সি’ নিয়ে।
‘ঘর ওয়াপ্সি’ রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া রোগ। অবশ্য ওই রোগেই মরবে বিজেপি। উলঙ্গ মোদি-শাহ
দাঁড়িয়ে থাকবে আর বিজেপির অন্যন্যরা ওদের মুখে থুতু দেবে। ধর্মতলায় দিলীপ-শুভেন্দুরও একই দশা দেখবে মানুষ।