স্বাজাত্যাভিমানের প্রথম পুরোহিত ও প্রচারক রূপেই রাজনারায়ণ বসু বাংলার নবযুগের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দেশবরেণ্য মনীষী বিপিন চন্দ্র পাল যার সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছিলেন সেই ঋষি রাজনারায়ন বসুর দ্বিশত জন্ম দিবস আসতে চলেছে আর ক’টা দিন বাদেই আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। কে এই রাজনারায়ন বসু? বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না ঋষি রাজনারায়ন বসুর উদ্দীপনাময় স্বদেশেপ্রেম, জাতীয় চেতনা সম্প্রসারণে নিরলস জন-জাগরণের প্রচেষ্টা ছাড়াও নির্মল জ্ঞান গরিমা ও ধর্মপ্রাণতা তাঁকে ‘ঋষি’ ও ‘জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ ও ‘ঋষি’ আখ্যায় ভূষিত করেছিল। কর্মসূত্রে তিনি মেদিনীপুরে এসে পনেরো বছরের কর্মজীবনে যে সব নানান জন হিতকর কাজ করে গেছেন তাতে শুধু মেদিনীপুর জেলা নয়, অবিভক্ত গোটা বাংলা তার সুফল ভোগ করেছিল।
মেদিনীপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনে মেদিনীপুর শহরে বেলী হল লাইব্রেরি বর্তমান যা ঋষি রাজনারায়ন বসু স্মৃতি পাঠাগার, অলিগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয় যা বর্তমান অলিগঞ্জ ঋষি রাজনারায়ন বসু বালিকা বিদ্যালয় ছাড়াও শ্রমজীবী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিতর্ক সভা, সাহিত্য উৎসাহিনী সভা, সুরাপান নিবারণী সভা, জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা সহ আরও অনেক সভা সমিতি স্থাপন করে জাতীয় চেতনা সম্প্রসারণে নব জোয়ার আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সেজন্যই রাজনারায়ন বসুকে ‘জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়।

রাজনারায়ন বসু ১৮২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চব্বিশ পরগনার বোড়াল গ্রামের বসু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা নন্দকিশোর ছিলেন রাজা রামমোহনের একান্ত অনুগামী। নন্দকিশোর বসু কিছুদিন রাজা রামমোহন রায়ের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজও করেছিলেন। বোড়ালের বসু পরিবারে রাজা রামমোহনের যাতায়াত ও রামমোহন রায়ের স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করার জন্য রাজনারায়ন বসু কিশোর অবস্থাতেই রামমোহনের আধুনিক চিন্তায় প্রভাবিত হন। কলকাতায় এসে প্রথমে হেয়ার স্কুল ও হিন্দু কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে পড়ার সময় হিন্দু কলেজের মেধাবী ছাত্র হিসেবে উচ্চতর বৃত্তি লাভ করেছিলেন।
রাজনারায়ন বসুর বাবা নন্দকিশোর বসু ১৮৪৫ সালে পরলোক গমন করার পরের বছরে ১৮৪৬ সালে রাজনারায়ন বসু মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সময় রাজনারায়ন বসুকে উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে ব্রাহ্ম সমাজের কাজে নিযুক্ত করেন। উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদের কাজ দু-বছর করার পর ১৮৪৯ সালে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে সংস্কৃত কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে মেদিনীপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। মেদিনীপুর জিলা স্কুলে ১৫ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন মেদিনীপুরে বেলীহল পাঠাগার, অলিগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়, শ্রমজীবী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, উন্নতি বিধায়ক সভা, সুরাপান নিবারণী সভা, বিতর্ক সভা গঠন করা ছাড়াও দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আগাগোড়া নিমজ্জিত রাজনারায়ন বসু ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’ গড়ে তোলেন।

স্বাজাত্যবোধ ও জাতীয়তাবোধ উদ্রেক করার জন্য নবগোপাল মিত্র কর্তৃক স্থাপিত হিন্দুমেলাতেও তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-সহ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের অন্য ছেলেরাও তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুবক্তা হিসেবে শ্রোতাদের অনেককেই জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন রাজনারায়ন বসু। মেদিনীপুর জেলার আর এক গৌরব পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্বাজাত্যাভিমান ও বিধবা বিবাহের উৎসাহী সমর্থক ছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে রাজনারায়ন বসু প্রধান শিক্ষক পদ থেকে ১৮৬৬ সালে অবসর নিতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁর প্রচুর ছাত্র ও সাধারণ জনগণের মধ্যে যে সুশিক্ষা ও স্বাদেশিকতার বীজ বপন করেছিলেন মেদিনীপুর জেলা-সহ সমগ্র বাংলায় তার প্রভাব ছিল অমোঘ। তাঁর জ্ঞান গরিমা, ধর্মপ্রাণতা, উদ্দীপনাময় স্বদেশেপ্রেম আর জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করার নিরলস প্রচেষ্টা তাঁকে ‘ঋষি’ ও “জাতীয়তাবাদের পিতামহ” আখ্যায় আখ্যায়িত করেছিল। শেষ জীবনে তিনি দেওঘরে বাড়ি বানিয়ে সেখানেই বসবাস করাকালীন ১৮৯৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়।
উনবিংশ শতকে ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের যে উন্মেষ ঘটেছিল তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মেদিনীপুরের মাটিতেই। ‘জাতীয়তাবাদের পিতামহ’ ও ‘মেদিনীপুরের রাজনারায়ন’ হিসেবে চিহ্নিত ঋষি রাজনারায়ন বসু ছিলেন তার অগ্রদূত।

রাজনারায়ন বসুর দ্বিশত জন্মবর্ষে জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত হিসেবে রাজনারায়ন বসুর স্মরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে করে মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থা ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের ৬ সেন্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষব্যাপী ঋষি রাজনারায়ন বসু দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থার ঋষি রাজনারায়ন বসু দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক হৃষিকেশ পড়্যা জানান, “মূলত মেদিনীপুর এবং অন্যান্য জেলায় ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সামিল করে ঋষি রাজনারায়ন বসু দ্বিশত জন্ম জয়ন্তী উদযাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কলকাতা মহানগরীর বুকে তাঁর মূর্তি স্থাপন, রাস্তার নামকরণ, মেদিনীপুরে তাঁর স্মৃতিবিজরিত বাসভবন সংস্কার ও সংরক্ষণ, ঋষি রাজনারায়ন বসুর নামাঙ্কিত মুদ্রা প্রচলন ও ডাক টিকিট প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে।”
জাতীয়তাবাদের সঠিক ধারনাই মানুষের মনে দেশপ্রেমের অন্তঃসারশূন্য উচ্ছ্বাসের পরিবর্তে স্বদেশবাসীর হিতার্থের কর্মকান্ডে প্রকৃতভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাই জাতীয়তাবাদের পিতামহ ঋষি রাজনারায়ন বসুর দ্বিশত জন্মবর্ষে তাঁর স্মরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ঋষি রাজনারায়ণ বসুর দ্বিশত জন্মবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে মেদিনীপুর সমন্বয় সমিতি আয়োজিত উদ্যোগের জন্য কর্মকর্তাদের হার্দিক অভিনন্দন জানাই।